Read today's news --> ⚡️Click here 

মণিপুর হেলিকপ্টার পরিষেবা পুনরায় চালু: অশান্তির মাঝে পাহাড়ি জেলায় ফিরল আকাশপথের যোগাযোগ

দীর্ঘ অস্থিরতা ও সড়ক অবরোধের কারণে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়া মণিপুরের পাহাড়ি জেলাগুলোতে আবার চালু হয়েছে হেলিকপ্টার পরিষেবা। মণিপুর হেলিকপ্টার পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়ায় ইম্ফল থেকে চুরাচাঁদপুর, উখরুল ও জিরিবামের মতো দুর্গম এলাকায় যাতায়াতে স্থানীয় বাসিন্দারা নতুন করে স্বস্তি পেয়েছেন। রাজ্য সরকার Central Armed Police Forces (CAPF)-এর নিরাপত্তা-সহ এই পরিষেবা পুনরুদ্ধার করেছে — যা বিচ্ছিন্ন অঞ্চলগুলোতে চিকিৎসা সামগ্রী, নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্য ও যাত্রী পরিবহনের ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ বিকল্প হয়ে উঠেছে।

কোন কোন রুটে চলছে হেলিকপ্টার: সময়সূচি ভাড়া

মণিপুর হেলিকপ্টার পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়ার পর বর্তমানে দুটি পৃথক পরিচালনা কাঠামোয় উড়ান চলছে। পবন হংস লিমিটেড (Pawan Hans Ltd.) কেন্দ্রীয় সরকারের Regional Connectivity Scheme (RCS)-UDAN কার্যক্রমের আওতায় ইম্ফল–জিরিবাম ও ইম্ফল–তামেংলং রুটে পরিষেবা দিচ্ছে। Pawan Hans-এর ওয়েবসাইট অনুযায়ী, এই পরিষেবা ১৩ মার্চ ২০২৪ থেকে চালু হয়েছিল। ভাড়া নির্ধারিত হয়েছে: ইম্ফল–তামেংলং রুটে ₹৩,৫৯০, জিরিবাম–তামেংলং রুটে ₹৩,৫৯০ এবং ইম্ফল–জিরিবাম রুটে ₹৩,০৪৫।

অন্যদিকে, Global Vectra Helicorp Ltd. কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের (MHA) ৭৫ শতাংশ ভর্তুকি প্রকল্পের আওতায় উখরুল, চুরাচাঁদপুর, সেনাপতি, কাংপোকপি ও তেঙনৌপাল জেলায় পরিষেবা পরিচালনা করছে। এই প্রকল্পে কেন্দ্র ও রাজ্যের মধ্যে ৭৫:২৫ অনুপাতে ব্যয় ভাগ করা হয়। Hindustan Times-এর মার্চ ২০২৫-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, ইম্ফল–চুরাচাঁদপুর রুটে সপ্তাহে দুই দিন (বুধবার ও শনিবার) এবং ইম্ফল–উখরুল রুটে সপ্তাহে একদিন (শনিবার) উড়ান নির্ধারিত রয়েছে। ফেব্রুয়ারি ২০২৬ সালে ইম্ফল–উখরুল রুটে বিশেষ হেলিকপ্টার পরিষেবার ঘোষণাও করা হয়েছে l

বিচ্ছিন্ন পাহাড়ে লাইফলাইন: কেন এই পরিষেবা এত গুরুত্বপূর্ণ

মণিপুরের মোট এলাকার প্রায় ৯০ শতাংশ পাহাড়ি ভূখণ্ড এবং অসংখ্য গ্রাম সড়কপথে সরাসরি যুক্ত নয়। Business Standard-এর একটি পুরনো প্রতিবেদনে তৎকালীন CM এন বীরেন সিং বলেছিলেন: “রাজ্যের ৯০ শতাংশ এলাকা পাহাড়ি এবং অনেক অভ্যন্তরীণ অঞ্চল দুর্গম। তাই হেলিকপ্টার পরিষেবা সেখানকার মানুষের জন্য অপরিহার্য।” এই পরিপ্রেক্ষিতে, ২০২৩ সাল থেকে শুরু হওয়া জাতিগত সংঘর্ষ মেইতেই-অধ্যুষিত উপত্যকা ও কুকি-জো সম্প্রদায়ের পাহাড়ি জেলাগুলোর মধ্যে সড়ক যোগাযোগকে যেভাবে বিপন্ন করেছে, সেখানে হেলিকপ্টার হয়ে উঠেছে কার্যত একমাত্র নিরাপদ বিকল্প।

চুরাচাঁদপুর থেকে ইম্ফলের দূরত্ব সড়কপথে প্রায় ৬৪ কিলোমিটার হলেও নিরাপত্তা পরিস্থিতির কারণে সেই পথে যাত্রা এখন কঠিন। অ্যাম্বুলেন্স পৌঁছানো মুশকিল এমন এলাকায় চিকিৎসা জরুরি রোগীদের ইম্ফলে নিয়ে আসতে হেলিকপ্টার পরিষেবা অপরিহার্য হয়ে পড়েছে। Eastern Mirror Nagaland-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, Indigenous Tribal Leaders’ Forum (ITLF)-এর মুখপাত্র গিনজা ভুয়ালজং পূর্বেই দাবি জানিয়েছিলেন যে লামকা থেকে কাংপোকপি ও মোরেহ পর্যন্ত হেলিকপ্টার সংযোগ প্রয়োজন, কারণ এসব এলাকার মানুষ দীর্ঘদিন ধরে বিচ্ছিন্ন।

MHA ভর্তুকি ও UDAN: কেন্দ্রের নীতি কীভাবে কাজ করছে

মণিপুরের হেলিকপ্টার পরিষেবা পুনরায় চালু করার পেছনে কেন্দ্রের দুটি নীতি মূল ভূমিকা পালন করছে। প্রথমত, MHA-র ৭৫ শতাংশ ভর্তুকি প্রকল্প — যার অধীনে Global Vectra Helicorp পরিষেবা দিচ্ছে। এই প্রকল্পে প্রতি ফ্লাইটের ব্যয়ের বড় অংশ কেন্দ্রীয় সরকার বহন করে এবং যাত্রীদের টিকিটের দাম তুলনামূলক সাশ্রয়ী রাখা সম্ভব হয়। দ্বিতীয়ত, Ministry of Civil Aviation-এর RCS-UDAN প্রকল্পের আওতায় পবন হংস ইম্ফল–জিরিবাম ও ইম্ফল–তামেংলং রুটে নির্ধারিত ভাড়ায় যাত্রীসেবা দিচ্ছে।

Manipur Transport Department-এর ওয়েবসাইটে প্রকাশিত তথ্য অনুযায়ী, MHA-অনুমোদিত রুটগুলোর মধ্যে রয়েছে চুরাচাঁদপুর থেকে আইজল (মিজোরাম) এবং কাংপোকপি ও সেনাপতি থেকে দিমাপুর (নাগাল্যান্ড) — যা মণিপুরকে পার্শ্ববর্তী রাজ্যগুলোর সঙ্গেও যুক্ত করার সুযোগ দিচ্ছে। এই সংযোগ শুধু যাত্রীবাহী নয়; ভবিষ্যতে জরুরি ওষুধ, ত্রাণ সামগ্রী ও বাণিজ্যিক পণ্য পরিবহনেও এই রুটগুলো কাজে লাগতে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

আসাম–মণিপুর সীমান্ত জিরিবাম রুটের প্রাসঙ্গিকতা

মণিপুর হেলিকপ্টার পরিষেবা পুনরায় চালু হওয়ার প্রভাব শুধু মণিপুরেই সীমাবদ্ধ নয় — আসামের সঙ্গেও এর গভীর সম্পর্ক রয়েছে। ইম্ফল–জিরিবাম রুটটি বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ কারণ জিরিবাম হলো মণিপুর ও আসামের সীমান্তবর্তী শহর। সড়কপথে ইম্ফল থেকে জিরিবামের দূরত্ব প্রায় ২২২ কিলোমিটার, কিন্তু হেলিকপ্টারে এই পথ মাত্র ৩০ মিনিটেরও কম সময়ে পাড়ি দেওয়া সম্ভব — যা ২০১৯ সালে প্রথমবার উদ্বোধনের সময় তৎকালীন CM বীরেন সিং নিজেই জানিয়েছিলেন।

হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বাসিন্দারা মণিপুরের পরিস্থিতির সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত, কারণ বরাক উপত্যকা দিয়ে যাওয়া সড়কই এই অঞ্চলের প্রধান সরবরাহ পথ। মণিপুরে যখন সড়ক অবরোধ চলে, তখন জিরিবাম হয়ে আসামের ভেতর দিয়ে পণ্য পরিবহন কঠিন হয়ে যায় এবং এর প্রভাব হাইলাকান্দি ও কাছাড়ের বাজারেও পড়ে। এই প্রেক্ষাপটে জিরিবাম রুটে হেলিকপ্টার পরিষেবা চালু থাকলে অন্তত জরুরি পণ্য ও ব্যক্তি পরিবহনে বিকল্প একটি পথ খোলা থাকে।

সার্বিকভাবে, মণিপুরে হেলিকপ্টার পরিষেবার পুনরুদ্ধার একটি আশাব্যঞ্জক পদক্ষেপ, তবে একে স্থায়ী সমাধান হিসেবে দেখার সুযোগ নেই। রাজ্যের ৯০ শতাংশ পাহাড়ি ভূখণ্ডে পরিষেবা পৌঁছে দিতে আরও বেশি হেলিপ্যাড নির্মাণ ও উড়ান সংখ্যা বৃদ্ধির প্রয়োজন — যার কাজ বর্তমানে চলমান বলে Manipur Transport Department জানিয়েছে। জাতিগত সংঘর্ষে ছিন্ন সড়ক যোগাযোগ যতদিন পুনরুদ্ধার না হচ্ছে, ততদিন আকাশপথের এই পরিষেবাই লাখো পাহাড়বাসীর কাছে জীবনরেখার ভূমিকা পালন করে যাবে।

মণিপুর হেলিকপ্টার পরিষেবা পুনরায় চালু: অশান্তির মাঝে পাহাড়ি জেলায় ফিরল আকাশপথের যোগাযোগ
Scroll to top