হাইলাকান্দি জেলার সালগাঙ্গায় মর্লি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুলের ছাদ ক্ষতি হওয়ার ঘটনায় এলাকায় উদ্বেগ তৈরি হয়েছে। এপ্রিল মাসের তীব্র শিলাবৃষ্টি ও ঝড়ে বিদ্যালয়টির ছাদের একটি বড় অংশ উড়ে যায় এবং ভেতরের কয়েকটি কক্ষ ব্যাপকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। সালগাঙ্গা মর্লি হাই স্কুলের এই ক্ষয়ক্ষতি এতটাই তীব্র যে কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার কথা ভেবে অনির্দিষ্টকালের জন্য পাঠদান কার্যক্রম স্থগিত রাখার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। বরাক উপত্যকায় কালবৈশাখী মৌসুমের শুরুতেই এই ঘটনা জেলার বিদ্যালয় পরিকাঠামোর ভঙ্গুর অবস্থা নিয়ে প্রশ্ন তুলে দিয়েছে।
শিলাবৃষ্টির তাণ্ডব: কীভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হল বিদ্যালয়
সালগাঙ্গা মর্লি হায়ার সেকেন্ডারি স্কুল হাইলাকান্দি জেলার অন্যতম পরিচিত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান। Barak Bulletin-এর প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে, প্রবল শিলাবৃষ্টি ও ঝোড়ো হাওয়ায় বিদ্যালয়ের ছাদের টিন ও কাঠামো ব্যাপক মাত্রায় ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। ঝড়ের বেগে ছাদের একাংশ উড়ে গেছে এবং বৃষ্টির জল ঢুকে পড়ে শ্রেণিকক্ষে থাকা আসবাব, বই ও শিক্ষা-উপকরণও নষ্ট হয়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। ঘটনার পরপরই বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পরিস্থিতি মূল্যায়ন করে এবং শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তার স্বার্থে পাঠদান স্থগিতের ঘোষণা দেয়।
এই ধরনের দ্রুত সিদ্ধান্ত নিঃসন্দেহে সঠিক ছিল। ক্ষতিগ্রস্ত ছাদের নিচে শিক্ষার্থীদের বসিয়ে ক্লাস পরিচালনা করা যে কতটা বিপজ্জনক হতে পারে, তা বলার অপেক্ষা রাখে না। তবে প্রশ্ন উঠছে, বিদ্যালয়ের এই ক্ষয়ক্ষতি কত দ্রুত মেরামত করা সম্ভব হবে এবং শিক্ষার্থীরা কবে আবার স্বাভাবিক পরিবেশে পাঠ গ্রহণ করতে পারবে।
হাইলাকান্দি জেলায় কালবৈশাখীর প্রকোপ: একটি পরিচিত সমস্যা
বরাক উপত্যকায় প্রতি বছর এপ্রিল–মে মাসে কালবৈশাখী ঋতু শুরু হয়। এই সময়ে হঠাৎ ঝড় ও শিলাবৃষ্টি স্বাভাবিক প্রাকৃতিক ঘটনা হলেও এর মাত্রা বছরভেদে বদলায়। হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জ — বরাক উপত্যকার তিন জেলাতেই প্রতি বছর ঝড়ে বাড়িঘর ও বিদ্যালয়ের ক্ষতির খবর পাওয়া যায়। সালগাঙ্গার এই ঘটনাটি সেই বৃহত্তর সমস্যার একটি প্রকাশ মাত্র।
স্থানীয় সচেতন মহলের মতে, সমস্যার মূলে রয়েছে বিদ্যালয়গুলোর পুরনো ও জরাজীর্ণ ভবন। সরকারি অনুদানে পরিচালিত অনেক বিদ্যালয়ে দশকের পর দশক ধরে পরিকাঠামো উন্নয়ন হয়নি। টিনের ছাদ ও কাঠের কাঠামো যেগুলো আরও সুদৃঢ় হওয়া উচিত ছিল, সেগুলো সামান্য ঝড়েও ভেঙে পড়ে। সালগাঙ্গা মর্লি হাই স্কুলের ক্ষেত্রেও এই প্রশ্নটি এড়ানো যাচ্ছে না — বিদ্যালয়ের ছাদ কি পর্যাপ্ত মজবুত ছিল, নাকি এটি দীর্ঘদিনের অবহেলার ফলেই এত দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে?
বিদ্যালয় পরিকাঠামো ও সরকারি দায়িত্ব: স্থানীয় দাবি কী
সালগাঙ্গা মর্লি হাই স্কুলের ছাদ ক্ষতির পর এলাকার অভিভাবক ও শিক্ষানুরাগীদের মধ্যে দ্রুত মেরামতের দাবি উঠেছে। প্রতিটি দিনের ক্লাস বন্ধ থাকা মানে শিক্ষার্থীদের মূল্যবান সময় নষ্ট হওয়া — বিশেষত যারা উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার প্রস্তুতিতে ব্যস্ত তাদের জন্য এটি বিশেষভাবে ক্ষতিকর। স্থানীয় পরিস্থিতিতে অনেক পরিবার বেসরকারি কোচিং বা বিকল্প শিক্ষার ব্যবস্থা করার সামর্থ্য রাখেন না, ফলে সরকারি বিদ্যালয়ই তাদের একমাত্র ভরসা।
হাইলাকান্দি জেলার শিক্ষা বিভাগের তরফ থেকে এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিক কোনো বিবৃতি এখনও পর্যন্ত পাওয়া যায়নি। তবে প্রত্যাশা থাকছে যে জেলা প্রশাসন ও রাজ্য শিক্ষা দফতর দ্রুততার সঙ্গে বিদ্যালয় পরিদর্শন করবে এবং মেরামতের জন্য প্রয়োজনীয় তহবিল বরাদ্দ করবে। আসাম সরকারের Samagra Shiksha Abhiyan প্রকল্পের আওতায় স্কুল পরিকাঠামো মেরামতের বিধান রয়েছে — এই প্রকল্পের সুবিধা দ্রুত কাজে লাগানো জরুরি।
লালা টাউন ও হাইলাকান্দির পাঠক: এই ঘটনা কেন গুরুত্বপূর্ণ
সালগাঙ্গা হাইলাকান্দি জেলারই অংশ — আর সেই কারণে এই ঘটনা লালা টাউন ও তার আশপাশের বাসিন্দাদের কাছে সরাসরি প্রাসঙ্গিক। লালা টাউনেও একাধিক সরকারি বিদ্যালয় রয়েছে যেগুলোর পরিকাঠামো একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। প্রতি বছর ঝড়ের মৌসুমে কোনো না কোনো বিদ্যালয়ে ক্ষতির খবর আসে, কিন্তু দীর্ঘমেয়াদি সমাধান নিয়ে কাজ হয় কম।
আসাম সরকারের পক্ষ থেকে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে বিদ্যালয় ভবন সংস্কার ও নতুন ভবন নির্মাণে বিভিন্ন প্রকল্প ঘোষণা করা হয়েছে। কিন্তু জেলার প্রত্যন্ত এলাকায় সেই সুবিধা কতটা পৌঁছাচ্ছে, সেটি নিয়ে প্রশ্ন থাকছে। সালগাঙ্গার এই ঘটনা জেলা শিক্ষা দফতর, স্থানীয় পঞ্চায়েত ও MLA-দের কাছে একটি স্পষ্ট বার্তা পাঠাচ্ছে — শুধু ঘোষণায় নয়, মাঠে কাজ দেখাতে হবে।
যে বিদ্যালয়গুলোতে পুরনো ও ঝুঁকিপূর্ণ ভবন রয়েছে, সেগুলো চিহ্নিত করে মৌসুমি ঝড়ের আগেই প্রয়োজনীয় মেরামত করা উচিত। প্রতিবার ঘটনা ঘটার পরে ব্যবস্থা নেওয়ার চেয়ে আগাম প্রস্তুতি অনেক বেশি কার্যকর ও নিরাপদ। সালগাঙ্গার শিক্ষার্থীরা যাতে দ্রুত তাদের স্বাভাবিক পাঠদান পরিবেশ ফিরে পায়, সেটাই এখন এলাকার মানুষের প্রধান প্রত্যাশা। জেলা প্রশাসন ও শিক্ষা বিভাগ কত দ্রুত পদক্ষেপ নেয়, তার উপরই নির্ভর করছে বিদ্যালয়টির পুনরায় চালু হওয়ার সম্ভাবনা।