Read today's news --> ⚡️Click here 

মেঘালয়ে খাসি ও গারো এখন সরকারি ভাষা: ২০০৫-এর আইন বাতিল করে ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ জারি

মেঘালয় সরকার এক ঐতিহাসিক সিদ্ধান্তে খাসি ও গারো ভাষাকে রাজ্যের সরকারি ভাষার মর্যাদা দিয়েছে। ১৬ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মেঘালয় ক্যাবিনেট Meghalaya Official Languages Ordinance, 2026 অনুমোদন করে, যার ফলে ইংরেজির পাশাপাশি খাসি ও গারো — এই দুটি আদিবাসী ভাষাও রাজ্যের আনুষ্ঠানিক ভাষার তালিকায় অন্তর্ভুক্ত হল। একই সঙ্গে Meghalaya State Language Act, 2005 বাতিল করা হয়েছে, যে আইনে ইংরেজিই ছিল একমাত্র সরকারি ভাষা এবং খাসি ও গারো কেবল সহযোগী ভাষা হিসেবে গণ্য হত। মেঘালয়ে খাসি ও গারো ভাষার এই সরকারি স্বীকৃতি উত্তর-পূর্ব ভারতের ভাষা সংরক্ষণ আন্দোলনে একটি নতুন মাইলফলক।

অধ্যাদেশে কী পরিবর্তন এল

নতুন অধ্যাদেশটি রাজ্যের প্রশাসনিক ব্যবস্থায় বেশ কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ পরিবর্তন আনবে। এখন থেকে সরকারি যোগাযোগ, প্রশাসনিক নথিপত্র এবং বিধানসভায় বিতর্কে খাসি ও গারো ভাষা ব্যবহার করা যাবে। বিধানসভায় ভাষাব্যবহার সংক্রান্ত পুরনো আইন — Meghalaya State Legislature (Continuance of English Language) Act, 1980 — সংশোধন করা হবে, যাতে বিধায়করা ইংরেজির পাশাপাশি খাসি ও গারোতেও বক্তব্য রাখতে পারেন।

পরীক্ষা ও নিয়োগ ক্ষেত্রেও এই ভাষা দুটি ধীরে ধীরে প্রবেশ করবে। তবে কর্তৃপক্ষ স্পষ্ট করেছে যে এই পরিবর্তন অবিলম্বে কার্যকর হবে না — প্রয়োজনীয় অবকাঠামো, জনবল এবং বিধিমালা তৈরির পর পর্যায়ক্রমে বাস্তবায়ন হবে। CM কনরাড কে. সাংমা বলেছেন, “এই বাস্তবায়ন সময় নেবে, কিন্তু ব্যবস্থাটি আজ থেকেই স্থাপিত হল।”

সাংমার বক্তব্য: জাতীয় স্বীকৃতির দিকে কৌশলী পদক্ষেপ

মেঘালয়ের মুখ্যমন্ত্রী কনরাড কে. সাংমা এই সিদ্ধান্তকে ‘ঐতিহাসিক’ বলে বর্ণনা করেছেন। Meghalaya Official Languages Ordinance, 2026 ঘোষণার সময় তিনি Khasi Authors Society-র সদস্যদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বলেন, “ইংরেজির পাশাপাশি খাসি ও গারো ভাষাও এখন থেকে রাজ্যের সরকারি ভাষা হবে।”

CM সাংমা আরও বলেন, “আমরা যদি জাতীয় স্তরে স্বীকৃতির দাবি জানাচ্ছি, তাহলে আগে নিজের রাজ্যে এই ভাষাগুলোকে শক্তিশালী করা জরুরি।” তিনি Khasi Authors Society এবং Achik Literature Society-র দীর্ঘদিনের প্রচেষ্টাকে কৃতজ্ঞতার সঙ্গে স্মরণ করেন এবং বলেন, “এই দুটি সংস্থা ছাড়া এই সিদ্ধান্ত সম্ভব হত না।”

অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্তির দাবি: কেন এটি গুরুত্বপূর্ণ

এই অধ্যাদেশের পেছনে একটি বড় কৌশলগত উদ্দেশ্য আছে। মেঘালয় বিধানসভা ইতিমধ্যে একটি প্রস্তাব পাস করেছে যাতে খাসি ও গারো ভাষাকে ভারতীয় সংবিধানের অষ্টম তফসিলে অন্তর্ভুক্ত করার দাবি জানানো হয়েছে। CM সাংমা সংবিধানের ৩৪৫ নং অনুচ্ছেদের ক্ষমতা ব্যবহার করে রাজ্য পর্যায়ে সরকারি মর্যাদা দিয়েছেন, যা কেন্দ্র সরকারের কাছে অষ্টম তফসিলের দাবি আরও জোরালো করবে।

অষ্টম তফসিলে যে ভাষাগুলো রয়েছে, সেগুলো জাতীয় স্তরে স্বীকৃত ও সুরক্ষিত। বর্তমানে তালিকায় ২২টি ভাষা আছে। খাসি ও গারো এই তালিকায় না থাকায় সরকারি সুযোগ-সুবিধা, কেন্দ্রীয় পরীক্ষায় ব্যবহার এবং সাংবিধানিক সুরক্ষা থেকে এই ভাষাভাষীরা বঞ্চিত। রাজ্য সরকারের এই পদক্ষেপ সেই বঞ্চনা দূর করার প্রথম ধাপ।

ডিসেম্বর ২০২৫-এ NPP-নেতৃত্বাধীন মেঘালয় সরকার প্রথম শ্রেণি পর্যন্ত শিক্ষার পাঠ্যক্রমে খাসি ও গারো ভাষা শেখা বাধ্যতামূলক করেছিল। সেই পদক্ষেপের ধারাবাহিকতায় এই অধ্যাদেশ এসেছে।

বরাক উপত্যকা আসামের জন্য প্রাসঙ্গিক বার্তা

মেঘালয়ের এই সিদ্ধান্ত উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যান্য ভাষাগত সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা বহন করছে। আসামের বরাক উপত্যকায়, বিশেষত হাইলাকান্দি ও লালা টাউনে বাংলা ভাষাভাষী মানুষ দীর্ঘকাল ধরে তাঁদের মাতৃভাষার প্রাতিষ্ঠানিক স্বীকৃতি ও সুরক্ষার জন্য লড়াই করে আসছেন। মেঘালয় যেভাবে নিজের আদিবাসী ভাষাগুলোকে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারল, সেটি বরাক উপত্যকার ভাষা আন্দোলনকর্মীদের কাছে অনুপ্রেরণার উৎস হতে পারে।

বরাক উপত্যকায় বাংলা ভাষার সাংবিধানিক মর্যাদার প্রশ্নটি বারবার রাজনৈতিক আলোচনায় উঠে আসে। আসামের সরকারি ভাষার তালিকায় অসমিয়ার পাশাপাশি বাংলা ও বোড়ো রয়েছে — তবে ব্যবহারিক স্তরে প্রশাসনিক কাজকর্মে বাংলার ব্যবহার এখনও সীমিত। মেঘালয়ের নতুন অধ্যাদেশ উত্তর-পূর্বের প্রতিটি ভাষিক সম্প্রদায়কে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে যে রাজনৈতিক সদিচ্ছা থাকলে আইনি পরিবর্তন সম্ভব।

ভবিষ্যতের পথ: বাস্তবায়নই আসল পরীক্ষা

মেঘালয়ে খাসি ও গারো ভাষার সরকারি স্বীকৃতি একটি সূচনামাত্র। CM সাংমা স্বীকার করেছেন, সরকারি নথিপত্র, পরীক্ষা ও বিধানসভায় এই ভাষাগুলো সম্পূর্ণভাবে চালু করতে সময় লাগবে। প্রয়োজনীয় অনুবাদক, পরীক্ষার প্রশ্নপত্র প্রস্তুতি, এবং প্রশাসনিক প্রশিক্ষণ — এই সব ক্ষেত্রে পদক্ষেপ না নিলে অধ্যাদেশটি কেবল কাগজেই থেকে যাবে।

তবু এই সিদ্ধান্তের প্রতীকী গুরুত্ব অপরিসীম। দেশের যে রাজ্যগুলো আদিবাসী ও আঞ্চলিক ভাষাকে প্রশাসনের কেন্দ্রে নিয়ে আসতে চাইছে, মেঘালয় তাদের সামনে একটি বাস্তব উদাহরণ তৈরি করল। কেন্দ্র সরকার অষ্টম তফসিলে এই ভাষাগুলো অন্তর্ভুক্ত করবে কি না — সেটাই এখন সবার নজরের কেন্দ্রে।

মেঘালয়ে খাসি ও গারো এখন সরকারি ভাষা: ২০০৫-এর আইন বাতিল করে ঐতিহাসিক অধ্যাদেশ জারি
Scroll to top