কংগ্রেসের জাতীয় মুখপাত্র পবন খেড়ার অগ্রিম জামিন (anticipatory bail) আবেদনে আগামীকাল ২৪ এপ্রিল রায় ঘোষণা করবে গৌহাটি হাইকোর্ট। পবন খেড়ার গৌহাটি হাইকোর্ট জামিন আবেদনে রায়ের এই তারিখ Bar and Bench নিশ্চিত করেছে। মঙ্গলবার (২২ এপ্রিল) বিচারপতি পার্থিবজ্যোতি শইকিয়ার এজলাসে উভয় পক্ষের দীর্ঘ তিন ঘণ্টার যুক্তিতর্ক শুনে আদালত রায় সংরক্ষণ করেছেন। এই মামলার কেন্দ্রে রয়েছে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনিকি ভূঁইয়া শর্মার বিরুদ্ধে পবন খেড়ার করা একটি প্রকাশ্য অভিযোগ, যেখানে তিনি দাবি করেছিলেন রিনিকি একাধিক বিদেশি পাসপোর্ট ও বিদেশে সম্পদের মালিক।
মামলার সূত্রপাত: পবন খেড়ার অভিযোগ থেকে FIR
৫ এপ্রিল ২০২৬-এ এক সাংবাদিক সম্মেলনে কংগ্রেস নেতা পবন খেড়া দাবি করেন, আসামের CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মার স্ত্রী রিনিকি ভূঁইয়া শর্মার কাছে UAE, মিশর (Egypt) ও অ্যান্টিগুয়া-বার্বুডার তিনটি পাসপোর্ট রয়েছে এবং তাঁর দুবাইতে দুটি সম্পত্তি ও শেল কোম্পানিতে সম্পদ আছে। এই বক্তব্যের পরপরই ৬ এপ্রিল মধ্যরাতে গৌহাটি পুলিশ কমিশনারেটের ক্রাইম ব্র্যাঞ্চ থানায় রিনিকি ভূঁইয়া শর্মার FIR-এর ভিত্তিতে পবন খেড়ার বিরুদ্ধে মামলা রুজু করা হয়। এই FIR-এ ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS) ২০২৩-এর আওতায় মানহানি, জালিয়াতি (forgery), প্রতারণা ও ফৌজদারি ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আনা হয়েছে।
৭ এপ্রিল আসাম পুলিশ পবন খেড়ার দিল্লির বাড়িতে হানা দেয়, কিন্তু তাঁকে সেখানে পাওয়া যায়নি। এরপর ১০ এপ্রিল তেলেঙ্গানা হাইকোর্ট খেড়াকে এক সপ্তাহের ট্রানজিট অ্যান্টিসিপেটরি বেইল দেয় এবং আসামের উপযুক্ত আদালতে আবেদন করতে বলে। কিন্তু আসাম সরকার সুপ্রিম কোর্টে সেই আদেশকে চ্যালেঞ্জ করে এবং ১৫ এপ্রিল সুপ্রিম কোর্ট তেলেঙ্গানা হাইকোর্টের ওই আদেশ স্থগিত করে দেয়।
সুপ্রিম কোর্ট থেকে গৌহাটি হাইকোর্ট: আইনি যাত্রার বিশদ বিবরণ
সুপ্রিম কোর্টের এপ্রিল ১৫-র স্থগিতাদেশের পর পবন খেড়া সুপ্রিম কোর্টেই সেই স্থগিতাদেশ প্রত্যাহারের আবেদন করেন। কিন্তু ১৭ এপ্রিল বিচারপতি জেকে মহেশ্বরী ও অতুল এস চান্দুরকরের বেঞ্চ সেই আবেদন প্রত্যাখ্যান করে এবং খেড়াকে সরাসরি গৌহাটি হাইকোর্টে যাওয়ার নির্দেশ দেয়। আদালত স্পষ্ট জানিয়ে দেয়, গৌহাটি হাইকোর্ট সম্পূর্ণ স্বাধীনভাবে এই আবেদনের গুণাগুণের ভিত্তিতে সিদ্ধান্ত নেবে।
এরপর ২১ এপ্রিল গৌহাটি হাইকোর্টে পবন খেড়ার পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী অভিষেক মনু সিঙ্ঘভি ও আইনজীবী কমল নারায়ণ চৌধুরী যুক্তি উপস্থাপন করেন। সিঙ্ঘভি আদালতে বলেন, এই মামলাটি রাজনৈতিক উদ্দেশ্যে এবং প্রতিহিংসামূলক — এটি একজন বিরোধী রাজনীতিকের কণ্ঠ রোধ করার জন্য দায়ের করা হয়েছে। তিনি আরও যুক্তি দেন, পবন খেড়া এই অভিযোগ প্রশ্ন আকারে উপস্থাপন করেছিলেন এবং কোনো জাল নথি তৈরিতে তাঁর প্রত্যক্ষ ভূমিকার কোনো প্রমাণ নেই।
অন্যদিকে, আসাম সরকারের আইনজীবী সাইকিয়া আদালতে যুক্তি দেন যে খেড়া “জাল ও বানোয়াট নথি, সিল ও স্ট্যাম্প” ব্যবহার করে CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা ও তাঁর স্ত্রীকে রাজনৈতিক সুবিধার জন্য কুৎসিতভাবে হেয় করেছেন।
আসাম নির্বাচনের প্রেক্ষাপটে এই মামলার রাজনৈতিক তাৎপর্য
পবন খেড়ার গৌহাটি হাইকোর্ট জামিন আবেদনের রায় এমন একটি সময়ে আসছে যখন আসামে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার তুঙ্গে। এই মামলাটি আসাম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর মধ্যেই দায়ের হওয়ায় কংগ্রেস এটিকে “রাজনৈতিক হেনস্থা” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। কংগ্রেস দলের অভিযোগ, তৃণমূলের নির্বাচনী চাপের মুখে কংগ্রেস নেতাদের চুপ করিয়ে দিতে আসামের শাসক দল রাষ্ট্রীয় পুলিশ যন্ত্রের অপব্যবহার করছে। রিনিকি ভূঁইয়া শর্মা ৫ এপ্রিলেই FIR দায়ের করেন এই বলে যে পবন খেড়ার দাবি সম্পূর্ণ মিথ্যা ও মানহানিকর।
বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন, এই মামলার রায় হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জে কংগ্রেসের নির্বাচনী প্রচারকে নতুন গতি বা বাধা দুটোই দিতে পারে। এই অঞ্চলে কংগ্রেসের ঐতিহ্যগতভাবে শক্তিশালী ভিত্তি রয়েছে এবং জামিন পেলে পবন খেড়ার সক্রিয় উপস্থিতি দলীয় নির্বাচনী প্রচারে নতুন মাত্রা যোগ করতে পারে।
রায়ের অপেক্ষায়: ২৪ এপ্রিলের ফলাফল কী হতে পারে
গৌহাটি হাইকোর্টের বিচারপতি পার্থিবজ্যোতি শইকিয়া ২৪ এপ্রিল পবন খেড়ার গৌহাটি হাইকোর্ট জামিন আবেদনে যে রায় দেবেন, তা ভারতের বিচার ও রাজনীতি উভয় ক্ষেত্রেই গুরুত্বপূর্ণ নজির তৈরি করতে পারে। যদি আদালত জামিন মঞ্জুর করে, তাহলে কংগ্রেস এটিকে “সত্যের জয়” হিসেবে উপস্থাপন করবে। আর যদি জামিন নাকচ হয়, তাহলে আসাম পুলিশের পক্ষে গ্রেফতারের পথ খুলে যাবে এবং বিষয়টি সুপ্রিম কোর্টে পুনরায় যাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে। নির্বাচনী প্রচারের মাঝে এই বিচারিক রায় আসামের রাজনৈতিক পরিবেশে তাৎক্ষণিক প্রতিক্রিয়া তৈরি করবে বলেই মনে করা হচ্ছে।