Read today's news --> ⚡️Click here 

শিলচর অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণায় কাছাড় পুলিশের হাতে গ্রেফতার শ্রীকোণার যুবক জয়দীপ দত্ত

শিলচর অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণায় কাছাড় পুলিশ বুধবার শিলচরের শ্রীকোণা এলাকার এক যুবককে গ্রেফতার করেছে। ধৃত ব্যক্তির নাম জয়দীপ দত্ত। তিনি গত দুই থেকে তিন বছর ধরে বরাক উপত্যকার বিভিন্ন প্রান্তের মানুষের কাছ থেকে একটি অনলাইন ট্রেডিং কোম্পানির নাম ব্যবহার করে বড় অঙ্কের অর্থ সংগ্রহ করে আসছিলেন বলে অভিযোগ। পুলিশের প্রাথমিক তদন্তে এখন পর্যন্ত ৩৫ থেকে ৪০ লক্ষ টাকার জমার হদিশ মিলেছে — তবে মোট প্রতারণার পরিমাণ কয়েক কোটি টাকা পর্যন্ত পৌঁছাতে পারে বলে তদন্তকারীরা সন্দেহ করছেন।

গ্রেফতার ও অভিযোগের বিশদ চিত্র

কাছাড় জেলার অতিরিক্ত পুলিশ সুপার রাজত কুমার পল সাংবাদিক সম্মেলনে জানান, জয়দীপ দত্তের বিরুদ্ধে এখন পর্যন্ত অন্তত ২৪ জন বিনিয়োগকারী আনুষ্ঠানিক অভিযোগ দায়ের করেছেন। তাঁর ভাষায়, “অভিযুক্ত ব্যক্তি সাধারণ মানুষের কাছে মিথ্যা প্রতিশ্রুতি দিয়ে অবৈধভাবে অর্থ সংগ্রহ করেছেন।” পুলিশ জানিয়েছে, জয়দীপ বিনিয়োগকারীদের অনলাইন ট্রেডিংয়ের মাধ্যমে উচ্চ মুনাফার প্রলোভন দেখাতেন এবং ক্রমাগত নতুন বিনিয়োগকারী যুক্ত করে পুরনো বিনিয়োগকারীদের ধরে রাখার চেষ্টা করতেন। ধৃত যুবককে ইতোমধ্যে আদালতে হাজির করা হয়েছে এবং তদন্ত চলমান রয়েছে।

তদন্তকারীরা এখন দুটি মূল প্রশ্নের উত্তর খুঁজছেন — প্রথমত, সংগৃহীত অর্থ ঠিক কোথায় বিনিয়োগ করা হয়েছিল বা কোথায় হস্তান্তর হয়েছে; দ্বিতীয়ত, এই শিলচর অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণা চক্রে জয়দীপ ছাড়া আর কোনো ব্যক্তি বা সংগঠন জড়িত আছে কি না। পুলিশের প্রাথমিক ধারণা, শুধু ২৪ জন অভিযোগকারীর বাইরেও আরও অনেক ভুক্তভোগী থাকতে পারেন যাঁরা এখনও সামাজিক লজ্জা বা আইনি প্রক্রিয়ার ভয়ে এগিয়ে আসেননি।

বরাক উপত্যকায় অনলাইন বিনিয়োগ প্রতারণার ধারাবাহিক ইতিহাস

শিলচর অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণার এই ঘটনা বরাক উপত্যকায় সম্পূর্ণ নতুন নয় — বরং এটি একটি দীর্ঘ ও উদ্বেগজনক ধারার সাম্প্রতিক সংযোজন। ২০২৫ সালের মার্চে শ্রীভূমি জেলার বাখরশাল এলাকার মহম্মদ শাকির প্রায় ১৫০ কোটি টাকার অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণা ঘটিয়ে দীর্ঘদিন পলাতক ছিলেন। তাঁকে কলকাতা থেকে গ্রেফতার করে শ্রীভূমিতে জেরার জন্য আনা হয়। ওই মামলায় অনেক বিনিয়োগকারী ব্যাংকঋণ নিয়ে টাকা দিয়েছিলেন এবং সর্বস্বান্ত হয়ে চরম আর্থিক সংকটে পড়েছিলেন।

২০২৪ সালের সেপ্টেম্বরে  অসম পুলিশ একটি ২,২০০ কোটি টাকার অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণা ফাঁস করে বিশ্বাল ফুকন ও স্বপ্নিল দাসকে গ্রেফতার করেছিল। সেই মামলায় অভিযুক্তরা মাত্র ৬০ দিনে ৩০ শতাংশ রিটার্নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে হাজার হাজার বিনিয়োগকারীকে প্রলোভিত করেছিল। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা তখন সতর্ক করে বলেছিলেন, “অল্প পরিশ্রমে অর্থ দ্বিগুণ করার দাবি সাধারণত প্রতারণামূলক।”

কীভাবে কাজ করে এই প্রতারণার ফাঁদ

PhonePe-র ভোক্তা সতর্কতা গাইড ও অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণার মডেলটি সাধারণত একটি নির্দিষ্ট কৌশলে পরিচালিত হয়। প্রথমে প্রতারক একটি বিশ্বাসযোগ্য নাম ও লোগোসম্পন্ন নকল ট্রেডিং প্ল্যাটফর্ম তৈরি করেন। তারপর WhatsApp বা Telegram-এ উচ্চ রিটার্নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিয়োগকারীদের আকৃষ্ট করা হয়। শুরুতে ছোট পরিমাণে মুনাফা দেওয়া হয় — যাতে আরও বড় বিনিয়োগ আসে। তারপর পুরনো বিনিয়োগকারীদের মুনাফা নতুনদের টাকা দিয়ে মেটানো হয় — যা মূলত একটি পঞ্জি স্কিম বা পিরামিড পদ্ধতি। একবার বড় পরিমাণ জমা হলে প্রতারক নম্বর ব্লক করে অদৃশ্য হয়ে যান।

বরাক উপত্যকায় এই প্রতারণার প্রসার বিশেষভাবে উদ্বেগজনক কারণ এই অঞ্চলে শেয়ার বাজার ও বিনিয়োগ সম্পর্কে সচেতনতা এখনও সীমিত, অথচ ডিজিটাল ব্যাংকিং ও স্মার্টফোনের ব্যবহার দ্রুত বেড়েছে। ফলে মানুষ সহজেই অনলাইন প্ল্যাটফর্মে অর্থ হস্তান্তর করতে পারছেন — কিন্তু কোম্পানি বা স্কিমের বৈধতা যাচাই করার পদ্ধতি অনেকেই জানেন না।

হাইলাকান্দি ও লালার জন্য সতর্কবার্তা

শিলচর অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণার এই ঘটনা হাইলাকান্দি জেলা ও লালা শহরের মানুষের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ সতর্কবার্তা। কাছাড় সদরের মতো হাইলাকান্দি জেলার মানুষও একইরকম প্রলোভনের শিকার হওয়ার ঝুঁকিতে থাকেন। লালা বাজার এলাকায় অনেক ছোট ব্যবসায়ী ও কর্মজীবী মানুষ রয়েছেন যাঁরা সঞ্চয় বাড়ানোর উদ্দেশ্যে বিকল্প বিনিয়োগ খোঁজেন। এই স্বাভাবিক আকাঙ্ক্ষাকেই প্রতারকরা লক্ষ্য করেন।

SEBI (Securities and Exchange Board of India)-র নির্দেশিকা অনুযায়ী, কোনো কোম্পানি বা ব্যক্তি নিশ্চিত রিটার্নের প্রতিশ্রুতি দিয়ে বিনিয়োগ সংগ্রহ করতে পারেন না — এটি বেআইনি। কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, সাইবার অপরাধের বিরুদ্ধে লড়তে গুয়াহাটিসহ সাতটি শহরে যৌথ সাইবার সমন্বয় দল (Joint Cyber Coordination Teams) গঠন করা হয়েছে। যেকোনো বিনিয়োগ প্রস্তাব গ্রহণের আগে SEBI বা RBI-র ওয়েবসাইটে সেই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন যাচাই করা জরুরি। হাইলাকান্দির যেকোনো বাসিন্দা যদি এই ধরনের প্রতারণার শিকার হন, তাহলে জাতীয় সাইবার ক্রাইম হেল্পলাইন নম্বর ১৯৩০-এ অবিলম্বে যোগাযোগ করার পরামর্শ দেওয়া হচ্ছে।

কাছাড় পুলিশের এই গ্রেফতার বরাক উপত্যকায় অনলাইন বিনিয়োগ জালিয়াতির বিরুদ্ধে একটি ইতিবাচক পদক্ষেপ — কিন্তু এটিই যথেষ্ট নয়। প্রতারণার শিকড় উপড়ে ফেলতে পুলিশের কঠোর তদন্তের পাশাপাশি জনসচেতনতা প্রচারও সমানভাবে জরুরি। সংগৃহীত কোটি কোটি টাকার গন্তব্য এবং চক্রের অন্য সদস্যরা চিহ্নিত হলে এই মামলার প্রকৃত বিস্তার বোঝা যাবে — এবং সেটাই হবে ভুক্তভোগী বিনিয়োগকারীদের ন্যায়বিচারের পথে প্রথম ধাপ।

শিলচর অনলাইন ট্রেডিং প্রতারণায় কাছাড় পুলিশের হাতে গ্রেফতার শ্রীকোণার যুবক জয়দীপ দত্ত
Scroll to top