আসামের শ্রীভূমি জেলায় ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি দুর্ঘটনায় মারা গেলেন ২৮ বছরের তরুণ অজিত ধর। ঘটনাটি ঘটেছে ২৩ এপ্রিল ২০২৬, বৃহস্পতিবার সকালে — শ্রীভূমি শহরের ব্যস্ততম প্রধান সড়কে। পরদিন ২৪ এপ্রিল অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ত্রিনয়ন ভূঁইয়ার নেতৃত্বে একটি পুলিশ দল অজিতের পরিবারের বাড়ি বিদ্যাসাগর সরণিতে গিয়ে শোক প্রকাশ করেছে এবং আইনি ব্যবস্থার আশ্বাস দিয়েছে। শ্রীভূমি ম্যাজিস্ট্রেটের গাড়ি দুর্ঘটনায় যুবক নিহতের এই মর্মান্তিক ঘটনা গোটা এলাকায় চাঞ্চল্য ও ক্ষোভের সৃষ্টি করেছে।
ঘটনার বিবরণ: একটি ব্যস্ত সকালে থামল তরুণের জীবন
ঘটনার দিন সকালে শ্রীভূমি আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট শান্তনু কুমার শর্মা কর্মস্থলে যাওয়ার পথে তাঁর গাড়িটি (রেজিস্ট্রেশন নম্বর AS/01/DN/7594) হঠাৎ নিয়ন্ত্রণ হারায়। গাড়িটি প্রথমে একটি মোটরসাইকেলে ধাক্কা মারে, তারপর একটি অটোরিকশায়, তারপর একটি স্কুটারে — এবং শেষমেশ রাস্তার পাশ দিয়ে হেঁটে যাওয়া দুজন পথচারীকে সজোরে ধাক্কা দেয়। গাড়িতে ‘JUDGE’ লেখা মার্কিং থাকায় প্রত্যক্ষদর্শীরা তাৎক্ষণিকভাবে বিষয়টি বুঝতে পারেন এবং স্থানীয় মানুষ দ্রুত আহতদের হাসপাতালে নিয়ে যান।
দুই আহত পথচারী ছিলেন অজিত ধর (২৮) এবং অনুপম চক্রবর্তী (৭০)। তাদের আঘাতের মাত্রা এতটাই গুরুতর ছিল যে শ্রীভূমি সিভিল হাসপাতাল থেকে তাদের শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে রেফার করতে হয়। অজিত ধর হাসপাতালে পৌঁছানোর আগেই মারা যান। বয়স্ক অনুপম চক্রবর্তী এখনও শিলচরের একটি বেসরকারি নার্সিং হোমে সংকটজনক অবস্থায় চিকিৎসাধীন।
পুলিশের প্রতিশ্রুতি: পদমর্যাদা দিয়ে আইন থামবে না
ঘটনার পরদিন শ্রীভূমি পুলিশের অতিরিক্ত সুপার ত্রিনয়ন ভূঁইয়া নিহত অজিত ধরের পরিবারের কাছে সরাসরি গিয়ে সান্ত্বনা জানান। তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “গাড়িটি যদি কোনো বিচারিক কর্মকর্তারও হয়ে থাকে, আইন তার নিজস্ব গতিতে চলবে।” তিনি আরও জানান, পরিবারকে ক্ষতিপূরণ পেতে সহায়তা করা হবে কারণ অজিত ধর ছিলেন পরিবারের একমাত্র উপার্জনক্ষম মানুষ।
ঘটনাস্থলে উপস্থিত ছিলেন সদর থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা বিমল ছেত্রী এবং ট্রাফিক ইন-চার্জ শংকর সাহাও। পুলিশের এই দ্রুত পদক্ষেপকে স্থানীয় মানুষ ইতিবাচকভাবে দেখছেন, যদিও প্রশ্ন উঠছে — প্রকৃত তদন্ত কতটা নিরপেক্ষ হবে, যখন অভিযুক্ত নিজেই বিচার বিভাগের একজন কর্মকর্তা।
সড়ক নিরাপত্তা ও জবাবদিহিতার প্রশ্ন: আসাম জুড়ে আলোচনা
এই ঘটনা আসামে সরকারি গাড়ি ও উচ্চপদস্থ ব্যক্তিদের যানবাহন পরিচালনায় জবাবদিহিতার প্রশ্নটিকে সামনে এনেছে। স্থানীয় বাসিন্দারা জানিয়েছেন, দুর্ঘটনার পরে গাড়িটি ঘটনাস্থলে থেমে না থেকে সামান্য এগিয়ে যায় — যা তাদের কাছে হিট-অ্যান্ড-রান-এর মতো মনে হয়েছিল। ট্রাফিক পুলিশ পরে গাড়িটি জব্দ করে থানায় নিয়ে যায় এবং তদন্ত শুরু করে।
ভারতের Motor Vehicles Act, 1988-এর অধীনে হিট-অ্যান্ড-রান বা অবহেলাজনিত দুর্ঘটনায় চালকের বিরুদ্ধে কঠোর শাস্তির বিধান রয়েছে। যদি প্রমাণ হয় যে যানবাহনটি বেপরোয়াভাবে চালানো হয়েছিল, তাহলে ভারতীয় ন্যায় সংহিতার (BNS) ধারায় মামলা রুজু করা সম্ভব। কিন্তু অভিযুক্ত নিজে বিচারিক কর্মকর্তা হওয়ায় তদন্তের স্বচ্ছতা নিশ্চিত করার দাবিতে ইতিমধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় সরব হয়েছেন আসামের বিভিন্ন শ্রেণির মানুষ।
বরাক উপত্যকার প্রাসঙ্গিকতা: একই সড়ক বিপদ, একই উদ্বেগ
শ্রীভূমি (করিমগঞ্জ) জেলা বরাক উপত্যকার অংশ — এবং হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মানুষের কাছে এই ঘটনা অত্যন্ত কাছের মনে হওয়া স্বাভাবিক। বরাক উপত্যকার জাতীয় সড়ক ও শহরের ভেতরের রাস্তায় দুর্ঘটনার ঘটনা নতুন নয়। হাইলাকান্দি জেলার লালা, আলগাপুর, কাটিগড়া সড়কেও দ্রুতগামী যানবাহনের কারণে প্রায়ই দুর্ঘটনা হয়।
এই মামলায় বিশেষভাবে উদ্বেগজনক হলো — অভিযুক্ত গাড়ির মালিক নিজেই বিচার বিভাগের একজন কর্মকর্তা। সাধারণ নাগরিকের মনে প্রশ্ন ওঠা স্বাভাবিক: প্রভাবশালীদের বিরুদ্ধে কি সত্যিই আইন সমান হারে প্রযোজ্য হয়? লালা টাউনসহ গোটা বরাক উপত্যকায় মানুষ মনে করে, এই মামলার তদন্ত ও বিচার প্রক্রিয়া একটি দৃষ্টান্ত তৈরি করবে — ভবিষ্যতে যেকোনো রাষ্ট্রীয় কর্মকর্তার বিরুদ্ধে অনুরূপ ঘটনায় জবাবদিহিতার নজির হিসেবে।
অজিত ধরের পরিবার: একমাত্র উপার্জনকারীর অকালমৃত্যুর বোঝা
অতিরিক্ত পুলিশ সুপার ত্রিনয়ন ভূঁইয়া জানিয়েছেন, অজিত ধর ছিলেন তাঁর পরিবারের একমাত্র আয়ের উৎস। মাত্র ২৮ বছর বয়সে এই তরুণের মৃত্যু পরিবারের জন্য শুধু শোকের নয়, অর্থনৈতিক সংকটেরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। পুলিশ আশ্বস্ত করেছে যে পরিবার যাতে ন্যায়সঙ্গত ক্ষতিপূরণ পায়, সেজন্য সক্রিয় সহায়তা করা হবে। Motor Vehicles Act-এর অধীনে সড়ক দুর্ঘটনায় নিহত ব্যক্তির পরিবার MACT (Motor Accident Claims Tribunal)-এ ক্ষতিপূরণের দাবি জানাতে পারে — তদন্তের গতিপ্রকৃতির উপর নির্ভর করবে সেই প্রক্রিয়া কতটা সুচারু হবে।
এই মামলার পরবর্তী ধাপে নজর রাখতে হবে — পুলিশ কোন ধারায় মামলা রুজু করে, ম্যাজিস্ট্রেট শান্তনু কুমার শর্মার বিরুদ্ধে আনুষ্ঠানিক অভিযোগ গঠন হয় কিনা, এবং অনুপম চক্রবর্তীর চিকিৎসায় কোনো পরিবর্তন আসে কিনা। ন্যায়বিচার কতটা দ্রুত ও নিরপেক্ষ হয় — সেটাই এখন শ্রীভূমি তথা গোটা বরাক উপত্যকার মানুষের প্রত্যাশা।