ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের এক অবিচ্ছেদ্য কণ্ঠ চিরকালের মতো নীরব হয়ে গেল। আশা ভোঁসলে প্রয়াণ হলেন ১২ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার, মুম্বইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে, ৯২ বছর বয়সে। NDTV-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, বুকের সংক্রমণ ও শ্বাসকষ্টের কারণে শনিবার রাতে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল এবং রবিবার সন্ধ্যায় একাধিক অঙ্গ বিকল হয়ে তাঁর মৃত্যু হয়। পুত্র আনন্দ ভোঁসলে হাসপাতালের বাইরে সাংবাদিকদের জানান, “আমার মা শ্রীমতী আশা ভোঁসলে আজ আমাদের ছেড়ে চলে গেছেন।” ১৩ এপ্রিল সোমবার বিকেল ৪টায় মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় তাঁর অন্তিম সংস্কার সম্পন্ন হয়।hindustantimes+2
শেষ বিদায়ের আয়োজন: রাষ্ট্রীয় সম্মান ও জনসাধারণের শ্রদ্ধার্ঘ্য
মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক বিষয়ক মন্ত্রী আশিষ শেলার রবিবারই ঘোষণা করেন, আশা ভোঁসলেকে পূর্ণ রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষকৃত্য প্রদান করা হবে। মহারাষ্ট্রের মুখ্যমন্ত্রী দেবেন্দ্র ফড়নবীশ রবিবার সন্ধ্যায় তাঁর লোয়ার প্যারেলের কাসা গ্র্যান্ডে বাসভবনে গিয়ে শেষ শ্রদ্ধা জানান। সোমবার সকাল ১১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত সাধারণ মানুষ সেই বাসভবনে গিয়ে তাঁকে শেষ দেখা দেওয়ার সুযোগ পান। Times of India জানিয়েছে, হাজার হাজার মানুষ সেখানে ভিড় জমান — চলচ্চিত্র জগতের তারকা থেকে শুরু করে সাধারণ অনুরাগী, সকলেই চোখে জল নিয়ে এসেছেন তাঁদের প্রিয় ‘আশাতাই’কে বিদায় জানাতে।
উল্লেখযোগ্যভাবে, শিবাজি পার্কের এই স্থানটি আশা ভোঁসলের পরিবারের কাছে আলাদা আবেগের। তাঁর দিদি, ভারতীয় সংগীতের আরেক কিংবদন্তি, লতা মঙ্গেশকর ২০২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে প্রয়াত হলে তাঁকেও এই একই শিবাজি পার্কে রাষ্ট্রীয় মর্যাদায় শেষ বিদায় জানানো হয়েছিল। এখন দুই বোনের অন্তিম যাত্রা একই পথে। লতা মঙ্গেশকর ১৯২৯ সালে এবং আশা ভোঁসলে ১৯৩৩ সালে জন্মগ্রহণ করেছিলেন।
আশা ভোঁসলের সংগীত-জীবন: আট দশকের অতুলনীয় যাত্রা
আশা ভোঁসলের কণ্ঠের পরিসর ছিল অসামান্য। তিনি কেবল হিন্দি চলচ্চিত্রের গান গাননি — বাংলা, মারাঠি, তামিল, তেলুগু, মালয়ালম, পাঞ্জাবি, গুজরাটি, ভোজপুরি, উর্দু, ফারসি, ইংরেজি, রুশ, আরবিসহ ২০টিরও বেশি ভাষায় মোট ১২ হাজারেরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন — যার স্বীকৃতিস্বরূপ তাঁকে গিনেস বুক অব ওয়ার্ল্ড রেকর্ডস সর্বাধিক গান রেকর্ডকারী শিল্পীর স্বীকৃতি দিয়েছে। ABP Live জানাচ্ছে, ২০১৬ সালে তাঁর নামে এই গিনেস রেকর্ড আনুষ্ঠানিকভাবে নথিভুক্ত হয়।
Newsonair-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, আশাতাই তাঁর ক্যারিয়ারের প্রথম দশকেই অন্য যেকোনো সমসাময়িক শিল্পীর চেয়ে বেশি গান গেয়েছেন। তবে বড় পরিচিতি আসে ১৯৫৭ সালে, যখন সুরকার ও. পি. নায়ার তাঁকে ‘তুমসা নেহি দেখা’ ও ‘নয়া দৌর’-এর জন্য বেছে নেন। এরপর থেকে শুরু হয় তাঁর বহুমাত্রিক সংগীত-যাত্রা — রবি, এস. ডি. বর্মন, জয়দেব, শংকর-জয়কিষণ, ইলাইয়ারাজা ও বাপ্পি লাহিড়ি সহ একের পর এক কালজয়ী সুরকারের সঙ্গে কাজ করেছেন।
১৯৭০-এর দশকে সুরকার আর. ডি. বর্মন অর্থাৎ পঞ্চমদার সঙ্গে তাঁর জুটি ভারতীয় পপ ও ডিস্কো সংগীতে একটি সম্পূর্ণ নতুন যুগের সূচনা করে। সেই জুটির ভালোবাসা সুরের বাইরেও বিস্তৃত হয়েছিল — আশা ভোঁসলে পরে আর. ডি. বর্মনকে বিয়ে করেছিলেন। সুরকার খাইয়াম তাঁর কণ্ঠে এক ভিন্ন লিরিক্যাল সৌন্দর্য আবিষ্কার করেন — ‘উমরাও জান’ চলচ্চিত্রে তাঁদের যৌথ কাজ আশা ভোঁসলেকে তাঁর প্রথম জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এনে দেয়।
CNN-এর তথ্য অনুযায়ী, তাঁকে সংগীতের সর্বোচ্চ পুরস্কার দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কার এবং ভারত সরকারের পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করা হয়েছিল। পদ্মবিভূষণ পেয়েছেন ২০০৮ সালে বলে NDTV জানাচ্ছে। এছাড়া দুটি গ্র্যামি মনোনয়নও ছিল তাঁর ঝুলিতে। মহারাষ্ট্রের সর্বোচ্চ নাগরিক সম্মান মহারাষ্ট্র ভূষণও তাঁকে প্রদান করা হয়েছিল। পরবর্তী প্রজন্মের সুরকারদের মধ্যে এ. আর. রহমানের সঙ্গেও তাঁর কাজ ছিল — ‘রঙ্গিলা’ ও ‘লগান’-এ তাঁদের জুটি দেশজুড়ে সাড়া ফেলেছিল।
রাষ্ট্রনেতা থেকে সাধারণ মানুষ: শোকের ঢেউ সারা দেশে
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে গভীর শোক প্রকাশ করেন। Times of India-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি বলেন, “তাঁর অসাধারণ সংগীত-যাত্রা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং অগণিত হৃদয়কে স্পর্শ করেছে। তাঁর সঙ্গে আমার যে সাক্ষাতের স্মৃতি আছে, তা আমি চিরকাল লালন করে রাখব।” CNN-এর বরাতে প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, “তাঁর কণ্ঠ এক প্রজন্ম থেকে আরেক প্রজন্মে ভারতীয় সংস্কৃতির সেতু হিসেবে কাজ করেছে।” বলিউড ও সংগীত জগতের অগণিত শিল্পী সামাজিক মাধ্যমে শোকবার্তা প্রকাশ করেছেন। উত্তরপ্রদেশে লতা মঙ্গেশকর চকে বাসিন্দারা আশা ভোঁসলেকে শ্রদ্ধা জানাতে জমায়েত হন।
BBC-র বিশ্লেষণে বলা হয়েছে, আশা ভোঁসলের মৃত্যুতে ভারতীয় চলচ্চিত্র সংগীতের একটি যুগের সমাপ্তি ঘটল। আট দশকেরও বেশি সময় ধরে ভারতীয় পর্দার প্রতিটি মুডের সঙ্গে যে কণ্ঠ অবিচ্ছেদ্যভাবে জুড়ে ছিল — চপল শৃঙ্গার থেকে গভীর বিরহ, ডিস্কো থেকে ক্লাসিক্যাল — সেই বহুমাত্রিক কণ্ঠ আর শোনা যাবে না। Economic Times লিখেছে, “যে কণ্ঠ কয়েক দশক ধরে ভারতীয় সংগীতকে সংজ্ঞায়িত করেছে।”
বরাক উপত্যকার বাংলাভাষীদের কাছে আশাতাই
বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী মানুষের কাছে আশা ভোঁসলে কেবল হিন্দি চলচ্চিত্রের শিল্পী ছিলেন না। তিনি বাংলা গানেও তাঁর চিরপরিচিত কণ্ঠ ঢেলে দিয়েছিলেন — বাংলা লোকগীত থেকে আধুনিক বাংলা সংগীতে তাঁর কণ্ঠস্বর হাইলাকান্দি, লালা টাউন ও করিমগঞ্জের পরিবারের ড্রয়িংরুম থেকে রেডিওর পর্দায় বারবার ভেসে এসেছে। বরাক উপত্যকায় বাংলা ও হিন্দি উভয় ভাষার সংগীতই সমানভাবে উপভোগ করা হয়, এবং প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে আশাতাইয়ের গান এই অঞ্চলের সাংস্কৃতিক জীবনের একটি অংশ হয়ে আছে।
ভারতীয় সংগীতের এই মহীরুহের প্রয়াণে যে শূন্যতা তৈরি হয়েছে, তা কোনো একটি রাজ্য বা সম্প্রদায়ের নয় — এ শোক সমগ্র ভারতের। আশা ভোঁসলে তাঁর ১২ হাজারেরও বেশি গানের মধ্য দিয়ে এমন একটি সাংস্কৃতিক ঐতিহ্য রেখে গেছেন, যা আগামী প্রজন্মের কাছে চিরকাল অনুপ্রেরণার উৎস হয়ে থাকবে। শিবাজি পার্কের সেই চিতা নিভে যাবে — কিন্তু তাঁর কণ্ঠ ভারতীয় সংগীতের ইতিহাসে অমর হয়ে থাকবে।