AI বন্যা পূর্বাভাস প্রযুক্তি এখন উত্তর-পূর্ব ভারতের ছয়টি রাজ্যে কৃষকদের জন্য চালু হতে চলেছে। আসাম, মেঘালয়, মণিপুর, মিজোরাম, ত্রিপুরা ও অরুণাচল প্রদেশ — এই ছয় রাজ্যের লক্ষ লক্ষ কৃষক প্রতি বর্ষায় বন্যার প্রকোপে ফসল হারান। এই ক্ষতি কমাতে কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (Artificial Intelligence) ও স্যাটেলাইট প্রযুক্তি ব্যবহার করে একটি সমন্বিত বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। বরাক ও ব্রহ্মপুত্র — উভয় নদী অববাহিকায় বন্যার ক্রমবর্ধমান ঝুঁকির কথা মাথায় রেখে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন, এই প্রযুক্তি আসামের কৃষিনির্ভর মানুষের জীবনে বৈপ্লবিক পরিবর্তন আনতে পারে।
কীভাবে কাজ করে এই AI পদ্ধতি?
AI বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার মূলে রয়েছে একটি বহুস্তরীয় প্রযুক্তিগত কাঠামো। সেন্ট্রাল ওয়াটার কমিশন (CWC) বর্তমানে সারা দেশে ৩৫০টি স্টেশনে বন্যার পূর্বাভাস দেয় — যার মধ্যে ১৫০টি জলাধার প্রবাহ পূর্বাভাস কেন্দ্র এবং ২০০টি জলস্তর পূর্বাভাস কেন্দ্র। কিন্তু এই ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে সর্বোচ্চ ২৪ ঘণ্টার আগাম সতর্কতা দেওয়া সম্ভব হয়। নতুন AI পদ্ধতিতে সেই সীমা অনেকটাই ছাড়িয়ে যাওয়া সম্ভব।
IIT ভুবনেশ্বরের গবেষকরা আসামের জন্য একটি হাইব্রিড AI মডেল তৈরি করেছেন যেখানে Deep Learning প্রযুক্তি এবং প্রচলিত WRF আবহাওয়া মডেল একত্রিত করা হয়েছে। এই মডেল জেলাভিত্তিক ভারী বৃষ্টিপাতের পূর্বাভাস দিতে পারে ৯৬ ঘণ্টা — অর্থাৎ চার দিন — আগে থেকেই। এবং তার নির্ভুলতার হার ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতির প্রায় দ্বিগুণ। ভারতের জার্নাল অব ইন্টারন্যাশনাল কমিউনিটি রিসার্চ অ্যান্ড টেকনোলজির গবেষণায় দেখা গেছে, AI-ভিত্তিক বন্যা ব্যবস্থাপনা পদ্ধতি ৮৮-৯৩ শতাংশ নির্ভুলতায় বন্যার পূর্বাভাস দিতে পারে এবং ১৫-১৮ ঘণ্টার আগাম সতর্কতা নিশ্চিত করতে পারে। ISPRS-এর গবেষণায় ব্রহ্মপুত্র ও বরাক অববাহিকার জন্য বিশেষভাবে তৈরি মডেল ৮০-৯০ শতাংশ সাফল্যের হারে ৩৬-৪৮ ঘণ্টার সতর্কতা দিতে পারছে।
কৃষকরা কীভাবে সুবিধা পাবেন?
AI বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিক হল — এটি শুধু প্রযুক্তিবিদদের জন্য নয়, মাঠের কৃষকদের কাছে সরাসরি পৌঁছানোর ব্যবস্থা। কেন্দ্রীয় সরকারের PIB-এর তথ্য অনুযায়ী, IMD ও Development Innovation Lab-India-র সহযোগিতায় ২০২৫ সালের খারিফ মৌসুমে একটি AI পাইলট প্রকল্প চালানো হয়েছিল — যেখানে NeuralGCM, ECMWF-AIFS এবং ১২৫ বছরের বৃষ্টিপাত ডেটা একত্রিত করে স্থানীয় মৌসুমি বৃষ্টির পূর্বাভাস তৈরি করা হয়েছিল। সেই পূর্বাভাস M-Kisan পোর্টালের মাধ্যমে সরাসরি কৃষকদের মোবাইলে পৌঁছে দেওয়া হয়েছিল — হিন্দি, ওড়িয়া, মরাঠি, বাংলা ও পাঞ্জাবি ভাষায়। অর্থাৎ বাংলাভাষী কৃষকরাও বাংলায় সরাসরি সতর্কবার্তা পাবেন।
UC Berkeley-র অধ্যাপক উইলিয়াম বুস-এর নেতৃত্বে পরিচালিত Human-Centered Weather Forecasts Initiative-এর গবেষণা জানাচ্ছে, ১৩টি রাজ্যে ৩ কোটি ৮৮ লক্ষ কৃষককে এই পূর্বাভাস দেওয়া হয়েছিল — চার সপ্তাহ পর্যন্ত আগাম মৌসুমি বৃষ্টির পূর্বাভাস, যা আগে কখনো ১৫০ বছরে সম্ভব হয়নি। গবেষণায় দেখা গেছে, এই পূর্বাভাস পেয়ে ৩১-৫২ শতাংশ কৃষক তাদের বীজ বপনের সময়সূচি পরিবর্তন করেছেন — যা ফসলের ক্ষতি কমাতে সরাসরি সাহায্য করেছে।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার জন্য কতটা গুরুত্বপূর্ণ?
AI বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থা হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার কৃষকদের জন্য বিশেষভাবে আশার আলো। হাইলাকান্দি জেলা — যেখানে লালা টাউন অবস্থিত — বরাক নদী ও তার শাখানদীগুলোর কারণে প্রতি বর্ষায় তীব্র বন্যার মুখোমুখি হয়। ধান চাষ, সুপারি বাগান এবং সবজি চাষ — বরাক উপত্যকার তিনটি প্রধান কৃষি কার্যক্রমই বন্যার কারণে প্রতি বছর বিপুল ক্ষতির মুখে পড়ে।
NESAC (North Eastern Space Application Centre) ইতিমধ্যে আসামের সকল জেলায় স্যাটেলাইট ও হাইড্রো-মেটেওরোলজিক্যাল বিশ্লেষণ ব্যবহার করে Flood Early Warning System (FLEWS) চালু করেছে। এই ব্যবস্থায় জেলা ও রাজ্য প্রশাসনকে কার্যকর সতর্কবার্তা ও পরামর্শ পাঠানো হয়। নতুন AI সংযোজনে এই ব্যবস্থা আরও নির্ভুল ও আগাম হবে বলে বিশেষজ্ঞরা আশাবাদী। Ministry of Earth Sciences-এর ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এর প্রতিবেদনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, আসামের মতো বন্যাপ্রবণ কৃষি অঞ্চলে জলবায়ু স্থিতিস্থাপকতা বাড়াতে Mission Mausam প্রকল্পের অধীনে বিনিয়োগ বাড়ানো হচ্ছে।
উত্তর-পূর্ব ভারতে AI বন্যা পূর্বাভাস ব্যবস্থার সফল বাস্তবায়ন শুধু প্রযুক্তির অগ্রগতির গল্প নয় — এটি লালা ও হাইলাকান্দির মতো প্রত্যন্ত এলাকার লক্ষ লক্ষ কৃষকের জীবন-জীবিকার প্রশ্নের সাথে সরাসরি যুক্ত। আগামী বর্ষায় এই প্রযুক্তি কতটা কার্যকরভাবে মাঠপর্যায়ে পৌঁছাতে পারবে — বিশেষত বাংলাভাষী কৃষকদের কাছে মাতৃভাষায় সতর্কবার্তা পৌঁছে দেওয়ার ক্ষেত্রে — সেটিই হবে এই উদ্যোগের আসল পরীক্ষা। প্রযুক্তি ও মানবিক সংযোগের এই মেলবন্ধনই বরাক উপত্যকার ভবিষ্যৎ কৃষিকে আরও সুরক্ষিত করার চাবিকাঠি।