শিলচরের তৌসিফ আহমেদ লস্কর AIIMS নাগপুর থেকে B.Sc Allied Health Sciences-এ প্রথম স্থান অর্জন করে বরাক উপত্যকার মুখ উজ্জ্বল করেছেন। শুধু প্রথম হওয়াই নয় — এই অসামান্য কৃতিত্বের স্বীকৃতিস্বরূপ তিনি স্বয়ং ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মুর হাত থেকে বিশেষ সম্মাননা গ্রহণ করেছেন। আসামের কাছাড় জেলার শিলচর শহর থেকে উঠে আসা এই তরুণের সাফল্য হাইলাকান্দি, করিমগঞ্জ ও কাছাড় — সমগ্র বরাক উপত্যকায় উৎসাহ ও অনুপ্রেরণার ঢেউ তুলেছে। উত্তর-পূর্ব ভারতের প্রত্যন্ত অঞ্চল থেকে একজন পড়ুয়া দেশের সবচেয়ে মর্যাদাপূর্ণ চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে শীর্ষে উঠতে পারেন — তৌসিফের গল্প সেই সম্ভাবনার জীবন্ত প্রমাণ।
কে এই তৌসিফ আহমেদ লস্কর?
তৌসিফ আহমেদ লস্করের বাড়ি আসামের কাছাড় জেলার শিলচর শহরে। স্থানীয় শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রাথমিক ও মাধ্যমিক পড়াশোনা শেষ করে তিনি AIIMS নাগপুরে B.Sc Allied Health Sciences কোর্সে ভর্তি হন। Allied Health Sciences হল চিকিৎসা বিজ্ঞানের একটি গুরুত্বপূর্ণ শাখা — যেখানে Physiotherapy, Medical Imaging, Clinical Laboratory Technology, Radiography ও অন্যান্য প্যারামেডিকাল বিষয় পড়ানো হয়। দেশের সরকারি স্বাস্থ্য পরিকাঠামোয় এই দক্ষ পেশাদারদের ভূমিকা অত্যন্ত জরুরি — বিশেষত গ্রামীণ ও আধা-শহুরে এলাকায় যেখানে বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকের তুলনায় প্যারামেডিকেল কর্মীদের উপর নির্ভরশীলতা অনেক বেশি। AIIMS-এর মতো প্রতিষ্ঠানে এই কোর্সে ভর্তি হওয়াই অত্যন্ত প্রতিযোগিতামূলক — আর সেখানে ব্যাচে প্রথম স্থান অর্জন করা নিঃসন্দেহে অসাধারণ কৃতিত্ব।
রাষ্ট্রপতির হাতে সম্মান — অনুষ্ঠানের বিবরণ
AIIMS নাগপুরের দীক্ষান্ত সমারোহে (Convocation Ceremony) তৌসিফ আহমেদ লস্করকে B.Sc Allied Health Sciences-এ সর্বোচ্চ নম্বরপ্রাপ্ত শিক্ষার্থী হিসেবে বিশেষ পুরস্কার প্রদান করা হয়। এই অনুষ্ঠানে ভারতের রাষ্ট্রপতি দ্রৌপদী মুর্মু স্বয়ং উপস্থিত ছিলেন এবং তিনিই তৌসিফের হাতে সম্মাননা তুলে দেন। AIIMS-এর দীক্ষান্ত অনুষ্ঠান ভারতের চিকিৎসা শিক্ষার সর্বোচ্চ মঞ্চগুলির একটি — রাষ্ট্রপতির উপস্থিতিতে এই পুরস্কার পাওয়া মানে জাতীয় স্তরে স্বীকৃতি। তৌসিফ সেই বিরল সম্মান অর্জন করেছেন। শিলচর থেকে নাগপুর — হাজার কিলোমিটারের এই যাত্রায় তিনি কেবল ব্যক্তিগত সাফল্যই অর্জন করেননি, বরাক উপত্যকার শিক্ষার মানচিত্রেও একটি নতুন মাইলফলক স্থাপন করেছেন।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপটে তৌসিফের সাফল্য
শিলচরের তৌসিফ AIIMS নাগপুরে প্রথম হওয়ার এই খবর হাইলাকান্দি ও লালা অঞ্চলের পরিবারগুলোতে বিশেষ আলোড়ন তুলেছে — কারণ এই অঞ্চলের অনেক শিক্ষার্থী চিকিৎসা বিজ্ঞান ও প্যারামেডিকেল কোর্সের দিকে এগোতে চান কিন্তু পথের দিশা পান না। বরাক উপত্যকায় উচ্চমানের কোচিং বা গাইডেন্সের সুযোগ সীমিত হওয়া সত্ত্বেও তৌসিফ যে শুধু AIIMS-এ ভর্তি হননি — প্রথম স্থানও অধিকার করেছেন — এটি প্রমাণ করে যে সঠিক পরিশ্রম ও মনোযোগ থাকলে এই অঞ্চলের সন্তানরাও জাতীয় মঞ্চে উজ্জ্বল হতে পারেন।
হাইলাকান্দি জেলার স্বাস্থ্য পরিকাঠামোতে প্রশিক্ষিত Allied Health Sciences পেশাদারদের প্রয়োজনীয়তা দিন দিন বাড়ছে। জেলার একমাত্র সরকারি হাসপাতাল ও PHC-গুলোতে দক্ষ টেকনিশিয়ান ও প্যারামেডিকেলের অভাব রয়েছে। তৌসিফের মতো স্থানীয় সন্তানরা এই ক্ষেত্রে উচ্চশিক্ষা নিয়ে ফিরে এলে — অথবা তাঁদের সাফল্য দেখে নতুন প্রজন্ম অনুপ্রাণিত হলে — সেটি দীর্ঘমেয়াদে এই অঞ্চলের স্বাস্থ্যসেবার মানোন্নয়নেও ভূমিকা রাখবে। তৌসিফ আহমেদ লস্করের এই সাফল্য শুধু তাঁর নিজের বা তাঁর পরিবারের গৌরব নয় — এটি পুরো বরাক উপত্যকার মেধা ও সম্ভাবনার প্রতীক। সীমিত সুযোগ-সুবিধা সত্ত্বেও যে তরুণরা নিজেদের স্বপ্নকে বাস্তবে রূপ দিতে পারেন, তৌসিফ তাদের সবার জন্য একটি আলোকবর্তিকা। লালা বাজার থেকে শিলচর, শিলচর থেকে নাগপুর — এই পথ সহজ নয়, কিন্তু অসম্ভবও নয়। রাষ্ট্রপতির হাত থেকে পুরস্কার নেওয়া এই তরুণের গল্প আগামী দিনের পড়ুয়াদের বুকে সাহস জোগাবে।