হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার ও বিকল্প সড়ক প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলেন অসমের ডিমা হাসাও জেলার গার্ডিয়ান মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল। ২০২২ সালের ভূমিধস ও বন্যার পর ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতের বিপর্যয়ে বরাক উপত্যকার সংযোগ যাতে ছিন্ন না হয়, সেই লক্ষ্যেই এই পর্যালোচনাকে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে। জুন ১২-এ হাফলং থেকে গুয়াহাটি ফিরে আসার সময় গেরেম এলাকার নির্মিঙ্গলার কাছে মন্ত্রী ৩.৪ কিলোমিটার ক্ষতিগ্রস্ত হাফলং-লামডিং জাতীয় সড়কের সংস্কার কাজের বর্তমান অবস্থা নিরীক্ষণ করেন।
হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার কেন জরুরি
ডিমা হাসাওয়ের ভূপ্রকৃতি এমনিতেই দুর্গম। পাহাড়ি ঢাল, ঘন বৃষ্টিপাত আর ভূমিধসপ্রবণ মাটি এই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগকে প্রতি বর্ষায় ঝুঁকির মুখে ফেলে। হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার তাই শুধু একটি অবকাঠামোগত কাজ নয়, বরং পাহাড়ি জেলার জীবনরেখা পুনর্গঠনের প্রশ্ন। ২০২২ সালে ব্যাপক ভূমিধস ও বন্যার পর এই রুটের একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, ফলে রেল ও সড়কপথে যাতায়াতে বড়সড় বিঘ্ন ঘটে। তখনই বোঝা যায়, বিকল্প সংযোগ না থাকলে ডিমা হাসাও কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল Additional Deputy Commissioner Shaurya Sharma-এর সহকারে ক্ষতিগ্রস্ত অংশের বর্তমান অবস্থা এবং চলমান পুনর্গঠন কাজের পরিস্থিতি পর্যালোচনা করেন। প্রশাসনের দৃষ্টিতে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের পাশাপাশি এমন একটি বিকল্প পথ তৈরি করা, যা জরুরি অবস্থায় বিকল্প লাইফলাইন হিসেবে কাজ করতে পারে। পাহাড়ি জেলায় এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ নয়; ভূমির স্থায়িত্ব, কাটিং, রিটেইনিং ওয়াল, জলনিষ্কাশন এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বারবার কাজ করতে হয়।
বিকল্প সড়ক প্রকল্পে অগ্রাধিকার
বৈঠকে বিকল্প সড়ক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি জোর পায়। দুর্গম পাহাড়ি পথে একটি নতুন রুট শুধু যান চলাচলের সুবিধা দেয় না, বরং জরুরি পরিষেবা, খাদ্য সরবরাহ, ওষুধ পরিবহন এবং পণ্যবাজারের ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে পারে। একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে এমন বিকল্প পথ তৈরির প্রয়োজন, যা ভূমিধসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম এমন এলাকা দিয়ে যাবে।
অফিসাররা মন্ত্রীকে জানান যে, বিকল্প রুটের ১.৩ কিলোমিটার অংশের জন্য স্ট্যাটাস রিপোর্ট তৈরি হয়ে গেছে এবং টেন্ডারিং প্রক্রিয়া শুরু হয়েছে। টেন্ডার জারি ও খোলা ১৮ জুন নির্ধারণ করা হয়েছে। প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক প্রক্রিয়াগুলো দ্রুত চলছে, যাতে প্রকল্প কাজ সবচেয়ে দ্রুত শুরু হতে পারে। জনস্বার্থে স্থায়ী সমাধানের প্রয়োজনীয়তা উল্লেখ করে পাল সংশ্লিষ্ট দপ্তরগুলোকে কাজের গতি বাড়ানোর নির্দেশ দেন।
বরাক উপত্যকার জন্য সরাসরি প্রভাব
হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার ও বিকল্প রুটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বরাক উপত্যকায়। ডিমা হাসাওয়ের মধ্য দিয়ে আসা সড়ক ও রেলপথ বন্ধ হয়ে গেলে হাইলাকান্দি, কাছাড়, করিমগঞ্জ—এই তিন জেলাতেই পণ্য সরবরাহ, যাত্রী চলাচল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম পর্যন্ত প্রভাবিত হয়। লালা টাউনের মানুষের জন্যও এই সংযোগ কাগজে আঁকা কোনও দূরের পথ নয়; বরং বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জরুরি পরিষেবার বাস্তব সংযোগ।
বর্ষার সময় একটি ভূমিধস পুরো অঞ্চলের সরবরাহ শৃঙ্খল নাড়িয়ে দিতে পারে। ফল, সবজি, জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী কিংবা চিকিৎসা-সরঞ্জাম—সবকিছুরই পরিবহন ব্যাহত হয়। তাই হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার দ্রুত না হলে তার অভিঘাত পাহাড়ের গা ছুঁয়ে সমতলেও এসে পড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও সাধারণ যাত্রীরাই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী।
জুন ১৭-এ শিলচরে পর্যালোচনা বৈঠক
মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পাল হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার এবং বিকল্প রুটের বিস্তারিত আলোচনার জন্য ১৭ জুন শিলচরিতে একটি গুরুত্বপূর্ণ পর্যালোচনা বৈঠক আয়োজন করেছেন। ডিমা হাসাও জেলা প্রশাসনের প্রতিনিধিরা বৈঠকে অংশ নেবেন।
সূত্র অনুযায়ী, জেলা প্রশাসন, নর্থ কাছার হিলস অটোনোমাস কাউন্সিল (NCHAC) এবং জাতীয় হাইওয়ে অথরিটি of India (NHAI)-এর অফিসাররাও বৈঠকে উপস্থিত হবেন। সংস্কার ও যোগাযোগ প্রকল্পের বিভিন্ন দিক নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হবে।
হাফলং-লামডিং হাইওয়ে ডিমা হাসাও জেলা, বরাক উপত্যকা এবং অসমের অন্যান্য অংশের মধ্যে যোগাযোগকারী গুরুত্বপূর্ণ পরিবহন করিডোর। ২০২২ সালের প্রাকৃতিক বিপর্যয়ে এই হাইওয়ের একাধিক অংশ ব্যাপক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, যা অঞ্চলের যোগাযোগকে significantly প্রভাবিত করেছিল। এর প্রতিক্রিয়ায় রাজ্য সরকার ক্ষতিগ্রস্ত অংশগুলোর স্থায়ী সংস্কার এবং নিরাপদ বিকল্প যোগাযোগ রুটের উন্নয়নে উচ্চ অগ্রাধিকার দিয়েছে।
পাহাড়ি অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ কেবল যাতায়াতের বিষয় নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশ্নও বটে। তাই এই প্রকল্পের অগ্রগতি কতটা দ্রুত, কতটা নিরাপদ এবং কতটা টেকসই হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। ডিমা হাসাওয়ের এই সড়ক যদি সত্যিই নতুন ভরসা হয়ে ওঠে, তবে তার প্রভাব হাফলং থেকে হাইলাকান্দি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।