আসামের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা দুর্গাপুজোর পর বরাক উপত্যকায় ফের এসে চলমান উন্নয়ন প্রকল্পগুলির বিস্তারিত পর্যালোচনার কথা জানিয়েছেন। বুধবার শিলচর সফর শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে তিনি বলেন, রাজনৈতিক কর্মসূচির কারণে এবার সব প্রকল্প নিয়ে বিস্তৃত আলোচনা করা সম্ভব হয়নি। ফলে পুজোর পরে মন্ত্রী, প্রশাসনিক আধিকারিক ও বাস্তবায়নকারী সংস্থাগুলিকে নিয়ে বৈঠক করে প্রকল্পের অগ্রগতি, বিলম্বের কারণ এবং দ্রুত সমাপ্তির উপায় খতিয়ে দেখা হবে। বরাক উপত্যকা প্রকল্প পর্যালোচনার এই ঘোষণা কাছাড়, হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি—তিন জেলার বহু প্রতীক্ষিত সড়ক ও অবকাঠামো প্রকল্প নিয়ে নতুন করে প্রত্যাশা তৈরি করেছে।
মুখ্যমন্ত্রী বিশেষভাবে শিলচরের বর্তমান সড়ক পরিস্থিতির কথা উল্লেখ করেন। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, বিভিন্ন সড়কে একই সময়ে বহু নির্মাণকাজ চলায় শহর ও সংলগ্ন এলাকায় চলাচল কঠিন হয়ে পড়েছে। ন্যাশনাল হাইওয়েজ অ্যান্ড ইনফ্রাস্ট্রাকচার ডেভেলপমেন্ট কর্পোরেশন লিমিটেড বা এনএইচআইডিসিএল এবং পাবলিক ওয়ার্কস ডিপার্টমেন্ট বা পিডব্লিউডি মিলে বরাক উপত্যকায় ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি মূল্যের সড়ক প্রকল্প বাস্তবায়ন করছে বলে তিনি জানান। তাঁর আশা, চলমান অধিকাংশ রাস্তার কাজ এক বছরের মধ্যে শেষ হতে পারে; তবে এটি সরকারের প্রত্যাশিত সময়সীমা, চূড়ান্ত নির্মাণসূচি নয়।
পুজোর পরে বিস্তারিত বৈঠকের পরিকল্পনা
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, উন্নয়ন প্রকল্প দ্রুত এগিয়ে নিতে শুধু পৃথক দপ্তরের কাজ যথেষ্ট নয়; মন্ত্রী, জেলা প্রশাসন, প্রকৌশলী এবং বাস্তবায়নকারী সংস্থার মধ্যে সমন্বিত পর্যালোচনা জরুরি। তিনি ডিব্রুগড়ে অনুসৃত পর্যালোচনা পদ্ধতির উদাহরণ দিয়ে জানান, সেখানে নিয়মিত যৌথ বৈঠকে জটিলতা চিহ্নিত করে কাজের গতি বাড়ানো সম্ভব হয়েছে। বরাক উপত্যকাতেও পুজোর পর একই ধরনের কাঠামো প্রয়োগের পরিকল্পনা রয়েছে।
এই পর্যালোচনায় কোন কোন প্রকল্প অগ্রাধিকার পাবে, তার পূর্ণাঙ্গ সরকারি তালিকা এখনও প্রকাশিত হয়নি। তবে সাম্প্রতিক বিভাগীয় বৈঠকগুলিতে সিলচর-পঞ্চগ্রাম-মালুয়া সড়ক, লাওয়াইপাড়া বাইপাস, সিলচর-বারাপানি এক্সপ্রেস হাইওয়ে, ভারতমালা ও অসম মালার অধীনের সড়ক, শহরের উড়ালপুল, বিরবল বাজার-শিলচর মেডিকেল কলেজ সংযোগ সড়ক এবং বিভিন্ন জেলা-সংযোগ প্রকল্প নিয়ে আলোচনা হয়েছে। এই প্রকল্পগুলির অনেকগুলিই কাছাড়, হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমির যাত্রী, ব্যবসায়ী এবং রোগী পরিবহণের সঙ্গে সরাসরি যুক্ত।
শিলচরের রাস্তার চাপ ও ১৫ হাজার কোটি টাকার কাজ
শিলচরের রাস্তার খারাপ অবস্থা নিয়ে মুখ্যমন্ত্রী স্বীকার করেছেন যে একাধিক প্রকল্প একসঙ্গে চলার কারণে সাধারণ মানুষ ভোগান্তির মুখে পড়ছেন। তাঁর মতে, এত বড় পরিমাণ কাজ ধাপে ধাপে নেওয়া গেলে সাময়িক চাপ কিছুটা কম হতে পারত। এখন নির্মাণকাজের সঙ্গে যানবাহন চলাচল, নিকাশি, রাস্তা খোঁড়াখুঁড়ি এবং বর্ষাকাল-পরবর্তী মেরামতির সমন্বয় বড় চ্যালেঞ্জ হয়ে দাঁড়িয়েছে।
বরাক উপত্যকা উন্নয়ন মন্ত্রী কৃষ্ণেন্দু পালের সভাপতিত্বে ২৪ সেপ্টেম্বর অনুষ্ঠিত একটি উচ্চপর্যায়ের পর্যালোচনা বৈঠকেও এই সমস্যাগুলি উঠে আসে। ওই বৈঠকে সিলচর-পঞ্চগ্রাম-মালুয়া হাইওয়ের কাজ নির্ধারিত সময়ে শেষ করার নির্দেশ দেওয়া হয়। পাশাপাশি লাওয়াইপাড়া বাইপাসের বর্তমান অবস্থা পরীক্ষা করে মেরামতির সুস্পষ্ট রোডম্যাপ তৈরির কথাও বলা হয়। সড়কের সঙ্গে ড্রেন, কালভার্ট ও অন্যান্য নিকাশি কাঠামো ভবিষ্যতের চাহিদা মাথায় রেখে বিজ্ঞানসম্মতভাবে নির্মাণের উপরও জোর দেন মন্ত্রী।
বরাক উপত্যকা প্রকল্প পর্যালোচনায় কোন কাজগুলি গুরুত্বপূর্ণ
বরাক উপত্যকার যোগাযোগ ব্যবস্থার ক্ষেত্রে জাতীয় সড়ক ২৭-এর অসমাপ্ত সংযোগ অংশটি দীর্ঘদিনের একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। জুলাইয়ে বিধানসভায় দেওয়া সরকারের তথ্য অনুযায়ী, নৃমবানগলো থেকে হারাঙ্গাজাও পর্যন্ত এনএইচ-২৭-এর ‘মিসিং লিঙ্ক’ নির্মাণাধীন ছিল এবং সেপ্টেম্বর ২০২৬-এ সম্পূর্ণ হওয়ার লক্ষ্য রাখা হয়েছিল। লঙ্কা থেকে নৃমবানগলো এবং বালাচেরা থেকে শিলচর পর্যন্ত অংশ এনএইচআইডিসিএলের শিলচর প্রকল্প বাস্তবায়ন ইউনিটের অধীনে পড়ে।
এছাড়া মালিধর-বদরপুর জাতীয় সড়ক, ক্যাপিটাল পয়েন্ট-রঙ্গিরখাড়ি অংশ, পয়লাপুল-কুমাছড়া সড়ক, শিলচর-জিরিবাম সড়ক এবং সোনাবাড়িঘাট সেতুর মতো কাজগুলি পূর্ববর্তী পর্যালোচনা বৈঠকেও গুরুত্ব পেয়েছে। এই প্রকল্পগুলি শুধু শহুরে যাতায়াত নয়, হাসপাতাল, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, বাজার, রেলস্টেশন এবং আন্তঃজেলা যোগাযোগের সঙ্গে যুক্ত। পুজোর পর মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষিত পর্যালোচনা বৈঠকে প্রকল্পগুলির বাস্তব অগ্রগতি, অর্থছাড়, জমি-সংক্রান্ত সমস্যা, নকশাগত জটিলতা ও কাজের গুণমান—এসব বিষয় স্পষ্টভাবে তোলা হবে কি না, তা এখন দেখার বিষয়।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের প্রাসঙ্গিকতা
বরাক উপত্যকা প্রকল্প পর্যালোচনা হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের বাসিন্দাদের জন্যও বিশেষ গুরুত্বপূর্ণ। লালা থেকে শিলচর, বদরপুর, করিমগঞ্জ-শ্রীভূমি কিংবা অন্যান্য বাণিজ্যিক ও চিকিৎসাকেন্দ্রে যেতে সড়ক যোগাযোগের উপর ব্যাপক নির্ভরতা রয়েছে। শিলচরের চিকিৎসা পরিষেবা, উচ্চশিক্ষা প্রতিষ্ঠান, রেল ও বিমান যোগাযোগ এবং বড় বাজারগুলিতে হাইলাকান্দির বহু মানুষ নিয়মিত যাতায়াত করেন। ফলে কাছাড়ের সড়ক নির্মাণে বিলম্ব বা যানজটের প্রভাব সরাসরি লালা টাউন পর্যন্ত পৌঁছায়।
হাইলাকান্দি জেলার অভ্যন্তরীণ সড়ক, কালভার্ট, বন্যা-পরবর্তী মেরামতি এবং আন্তঃজেলা সংযোগ প্রকল্পগুলির অগ্রগতিও পুজোর পরের বৈঠকে গুরুত্ব পাওয়া উচিত বলে স্থানীয়দের প্রত্যাশা। বিশেষত বর্ষার সময় রাস্তা ক্ষতিগ্রস্ত হলে রোগী পরিবহণ, স্কুল-কলেজ যাতায়াত এবং কৃষিপণ্য বাজারে পৌঁছানোর ক্ষেত্রে সমস্যা বাড়ে। উন্নয়ন প্রকল্পের পরিকল্পনা বাস্তবে কতটা জনস্বার্থে কার্যকর হচ্ছে, তা পর্যালোচনা করার জন্য স্থানীয় পর্যায়ের সমস্যাগুলিও বৈঠকে অন্তর্ভুক্ত হওয়া জরুরি।
মানুষের কাছে প্রশাসন পৌঁছে দেওয়ার বার্তা
মুখ্যমন্ত্রী বলেন, এই সফরে তিনি প্রায় ২০০ জন মানুষের সঙ্গে দেখা করেছেন, যাঁদের অনেকে ব্যক্তিগত বা প্রশাসনিক সমস্যার কথা জানিয়েছেন কিন্তু গুয়াহাটি গিয়ে দেখা করা তাঁদের পক্ষে সহজ নয়। তাঁর বক্তব্য, প্রশাসনকে মানুষের দোরগোড়ায় পৌঁছে দিলে নাগরিকদের পক্ষে সমস্যা জানানো ও সরকারি সহায়তা পাওয়া সহজ হয়।
পুজোর পর বরাক উপত্যকায় মুখ্যমন্ত্রীর প্রস্তাবিত বিস্তারিত সফর তাই শুধু সড়ক প্রকল্পের হিসাব-নিকাশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকবে, নাকি নাগরিক পরিষেবা, চিকিৎসা, জলনিকাশি, শিক্ষা ও জেলা-ভিত্তিক উন্নয়নের প্রশ্নও আলোচনায় আসবে—সেদিকে নজর থাকবে। ১৫ হাজার কোটি টাকার বেশি সড়ককাজের দাবির মধ্যে বাস্তব অগ্রগতি, কাজের মান এবং মানুষের দৈনন্দিন ভোগান্তি কমানোই হবে এই পর্যালোচনার প্রধান পরীক্ষার বিষয়।