শিলচর পৌর নিগম নির্বাচনে বিজেপি প্রার্থীরা জয়ী হলে প্রতিটি ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য এক কোটি টাকা করে দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিলেন আসামের মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা। ৩০ সেপ্টেম্বর শিলচরের পুলিশ প্যারেড গ্রাউন্ডে বিজেপির নির্বাচনী সভায় তিনি এই ঘোষণা করেন। শিলচর পুরভোট ১ কোটি তহবিলের এই প্রতিশ্রুতিকে সামনে রেখে মুখ্যমন্ত্রী শহরের রাস্তা, জলজমা, নাগরিক পরিষেবা ও দীর্ঘমেয়াদি উন্নয়নের কথা বলেন। প্রথম শিলচর পৌর নিগম নির্বাচনের ভোট ৩ অক্টোবর; গণনা হবে ৬ অক্টোবর।
৪২ ওয়ার্ডের নতুন শিলচর পৌর নিগমের নির্বাচনে বিজেপি ও তার জোটসঙ্গী অসম গণ পরিষদ সব কটি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়েছে। বিজেপির দুই প্রার্থী—৯ নম্বর ওয়ার্ডের বিজেন্দ্র প্রসাদ সিং এবং ২০ নম্বর ওয়ার্ডের ভক্তি সেন তালুকদার—ইতিমধ্যেই বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হয়েছেন। ফলে বাকি ৪০ ওয়ার্ডে ভোট হবে। মুখ্যমন্ত্রী সভায় বলেন, বিজেপি প্রার্থীরা জয়ী হলে সংশ্লিষ্ট ওয়ার্ডের উন্নয়নের জন্য বিশেষ বরাদ্দ হিসেবে এক কোটি টাকা দেওয়া হবে।
শিলচর পুরভোট ১ কোটি প্রতিশ্রুতির শর্ত
মুখ্যমন্ত্রীর ঘোষণাটি সব নির্বাচিত কাউন্সিলরের জন্য নয়, বিজেপি প্রার্থীর জয়ের সঙ্গে যুক্ত করে করা হয়েছে। ডঃ শর্মা বলেন, নির্বাচিত কাউন্সিলররা উন্নয়ন খরচের ইউটিলাইজেশন সার্টিফিকেট বা ব্যবহার-সংক্রান্ত নথি সময়মতো জমা দিলে তাঁদের ওয়ার্ডে অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তাও দেওয়া হতে পারে।
এই বিশেষ তহবিল ডিসেম্বরের মধ্যে ছাড়ার কথা বলেছেন মুখ্যমন্ত্রী। পাশাপাশি বিজেপি পৌর নিগমের নিয়ন্ত্রণ পেলে সংস্থাটির জন্য পৃথক বার্ষিক বরাদ্দের আশ্বাসও দেন তিনি। অর্থাৎ প্রতিশ্রুত এক কোটি টাকার ওয়ার্ডভিত্তিক বরাদ্দের বাইরে শিলচর পৌর নিগমের সাধারণ কাজের জন্য আলাদা সরকারি তহবিলের কথাও সভায় উঠে এসেছে।
তবে অর্থ ছাড়ের চূড়ান্ত প্রশাসনিক প্রক্রিয়া, প্রকল্প বাছাইয়ের পদ্ধতি, নির্দিষ্ট তহবিলের উৎস এবং প্রতিটি ওয়ার্ডে কাজের অগ্রাধিকারের পূর্ণাঙ্গ সরকারি নির্দেশিকা এখনও প্রকাশ্যে আসেনি। নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়িত হলে রাস্তা মেরামত, নিকাশি, পানীয় জল, বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, স্ট্রিট লাইট এবং পাড়াভিত্তিক ছোট নাগরিক অবকাঠামোর মতো কাজে এই অর্থ ব্যয় হতে পারে—কিন্তু কোন খাতে কত ব্যয় হবে, তা সংশ্লিষ্ট কাউন্সিল ও প্রশাসনের পরবর্তী সিদ্ধান্তের উপর নির্ভর করবে।
৪২ ওয়ার্ডের প্রথম পৌর নিগম নির্বাচন
শিলচর আগে মিউনিসিপ্যাল বোর্ডের অধীনে ছিল। সেটিকে উন্নীত করে ৪২ ওয়ার্ডের পৌর নিগম গঠন করা হয়েছে এবং এবারের নির্বাচন এই নতুন কাঠামোর প্রথম ভোট। প্রতিটি ওয়ার্ড থেকে একজন করে কাউন্সিলর নির্বাচিত হবেন পাঁচ বছরের জন্য। নির্বাচনী তালিকা অনুযায়ী ৪২টি আসনের মধ্যে ২১টি মহিলাদের জন্য সংরক্ষিত।
মনোনয়ন প্রত্যাহারের পর ৪০টি ওয়ার্ডে ১৩৩ জন প্রার্থী প্রতিদ্বন্দ্বিতায় রয়েছেন বলে বিভিন্ন নির্বাচনী প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। বিজেপি ৩৮টি ওয়ার্ডে এবং তার জোটসঙ্গী এজিপি চারটি ওয়ার্ডে প্রার্থী দিয়েছে। কংগ্রেসও ৩৮টি ওয়ার্ডে লড়ছে; এর পাশাপাশি নির্দল ও অন্য দলের প্রার্থীরাও রয়েছেন। ভোটগ্রহণ ৩ অক্টোবর সকাল ৭টা ৩০ মিনিট থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত হওয়ার কথা এবং ৬ অক্টোবর সকাল ৮টা থেকে ভোটগণনা শুরু হবে।
নতুন পৌর নিগম হিসেবে শিলচরের সামনে নাগরিক পরিষেবা উন্নয়নের বড় চ্যালেঞ্জ রয়েছে। দ্রুত নগরায়ণ, যানজট, বর্ষায় জলজমা, রাস্তার অবস্থা, আবর্জনা অপসারণ এবং পানীয় জলের মতো সমস্যা শহরের বিভিন্ন এলাকায় দীর্ঘদিনের। ফলে ভোটের প্রচারে শুধু দলীয় সমীকরণ নয়, ওয়ার্ডভিত্তিক পরিষেবা এবং কাউন্সিলরদের জবাবদিহিতার প্রশ্নও গুরুত্ব পাচ্ছে।
মডেল কোড নিয়ে কংগ্রেসের অভিযোগ
নির্বাচনের আগে এক কোটি টাকা-প্রতি-ওয়ার্ড ঘোষণাকে ঘিরে রাজনৈতিক বিতর্কও তৈরি হয়েছে। ২৪ সেপ্টেম্বর কংগ্রেসের সর্বভারতীয় কংগ্রেস কমিটির সম্পাদক পৃথ্বীরাজ সাঠে অভিযোগ করেন, নির্বাচনী আচরণবিধি কার্যকর থাকাকালে শিলচরের জন্য ১০০ কোটি টাকার উন্নয়ন প্যাকেজ ঘোষণা করে মুখ্যমন্ত্রী মডেল কোড অফ কন্ডাক্ট লঙ্ঘন করেছেন। কংগ্রেসের এই অভিযোগের বিষয়ে নির্বাচন কর্তৃপক্ষের কোনও চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত ওই প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়নি।
মুখ্যমন্ত্রীর ৩০ সেপ্টেম্বরের বক্তব্যে প্রতিটি জয়ী বিজেপি প্রার্থীর ওয়ার্ডে এক কোটি টাকা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি আরও স্পষ্টভাবে সামনে আসে। নির্বাচনকালীন উন্নয়ন প্রতিশ্রুতি নিয়ে বিতর্ক নতুন নয়; কিন্তু সরকারি তহবিলের প্রতিশ্রুতি আচরণবিধির সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ কি না, সেই প্রশ্নে স্বচ্ছতা থাকা জরুরি। এ ধরনের অভিযোগের নিষ্পত্তি নির্বাচন কমিশন বা সংশ্লিষ্ট নির্বাচনী কর্তৃপক্ষের বিধি ও যাচাইয়ের ভিত্তিতেই হয়।
মুখ্যমন্ত্রী সভায় প্রতিদ্বন্দ্বী কংগ্রেসকে আক্রমণ করেন এবং বিজেপি সরকারের আমলে শিলচরে হওয়া উন্নয়নকাজের কথা তুলে ধরেন। তিনি জানান, নাগরিক পরিষেবা ও ভবিষ্যৎ নগর উন্নয়নের জন্য একাধিক পরিকল্পনা নেওয়া হবে। প্রার্থীদের নথিপত্র নিয়ে ওঠা অভিযোগের প্রসঙ্গেও তিনি বলেন, কারও শিক্ষাগত শংসাপত্র জাল প্রমাণিত হলে আইনি ব্যবস্থা নেওয়া হবে এবং সংশ্লিষ্ট ব্যক্তি কারাদণ্ডের মুখোমুখি হতে পারেন।
বরাক উপত্যকা ও লালার প্রেক্ষাপট
শিলচর পৌর নিগম নির্বাচন মূলত শহরকেন্দ্রিক হলেও এর প্রভাব বরাক উপত্যকার অন্য জেলার মানুষও অনুভব করেন। হাইলাকান্দির লালা টাউনসহ পার্শ্ববর্তী এলাকার বহু মানুষ চিকিৎসা, উচ্চশিক্ষা, ব্যবসা, রেল যোগাযোগ এবং সরকারি কাজের জন্য শিলচরে যান। শহরের রাস্তা, যানবাহন ব্যবস্থাপনা, নিকাশি ও বাজার-পরিকাঠামোর মান উন্নত হলে সেই সুবিধা শিলচরের বাসিন্দাদের পাশাপাশি বাইরের আগত মানুষও পাবেন।
লালা থেকে শিলচরগামী যাত্রীদের কাছে বিশেষভাবে গুরুত্বপূর্ণ হল শহরে প্রবেশের পর যানজট কমানো, চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানে পৌঁছানোর পথ সহজ রাখা এবং বর্ষার সময় জলজমাজনিত সমস্যা সামলানো। তাই প্রতিটি ওয়ার্ডে সম্ভাব্য উন্নয়ন তহবিলের ব্যবহার যদি স্বচ্ছ প্রকল্প পরিকল্পনা, প্রকাশ্য হিসাব এবং সময়বদ্ধ কাজের মাধ্যমে হয়, তবে তা বৃহত্তর বরাক উপত্যকার সংযোগ ও পরিষেবা ব্যবস্থাতেও ইতিবাচক প্রভাব ফেলতে পারে।
৩ অক্টোবরের ভোটে শিলচরের নাগরিকরা নতুন পৌর নিগমের প্রথম নির্বাচিত প্রতিনিধিদের বেছে নেবেন। এক কোটি টাকার প্রতিশ্রুতি ভোটারদের কাছে কতটা প্রভাব ফেলবে, তা ফলাফলের আগে বলা সম্ভব নয়। তবে নির্বাচনের পর মূল পরীক্ষা হবে প্রতিশ্রুত তহবিল সত্যিই বরাদ্দ হয় কি না, তা কীভাবে খরচ হয় এবং পাঁচ বছরের মেয়াদে নাগরিক পরিষেবায় তার দৃশ্যমান ফল মেলে কি না।