কক্রোচ জনতা পার্টি বা সিজেপি ঘোষণা করেছে, মুখ্য নির্বাচন কমিশনার জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে ১০ অক্টোবর দিল্লির জন্তর মন্তরে নতুন করে বিক্ষোভ করবে দলটি। ৩ অক্টোবর মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে অনুষ্ঠিত প্রতিবাদের পর সিজেপির প্রতিষ্ঠাতা ও আহ্বায়ক অভিজিৎ দিপকে এই ঘোষণা দেন। ভোটার তালিকার Special Intensive Revision বা SIR নিয়ে অনিয়মের অভিযোগ এবং নির্বাচন কমিশনের জবাবদিহির দাবিকে সামনে রেখে এই আন্দোলনের ডাক দেওয়া হয়েছে। সিজেপি জানিয়েছে, জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে দেশের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে দলের সদস্য ও সমর্থকেরা দিল্লিতে যাবেন।
অভিজিৎ দিপকে বলেন, “জ্ঞানেশ কুমার পদত্যাগ না করলে সারা ভারত থেকে কক্রোচরা দিল্লিতে আসবে এবং ১০ অক্টোবর জন্তর মন্তরে প্রতিবাদ করবে।” তিনি কর্মসূচিকে শান্তিপূর্ণ রাখার কথা জানিয়ে বিনামূল্যে ও সুষ্ঠু নির্বাচন সমর্থনকারী নাগরিকদের অংশ নেওয়ার আহ্বান জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, পুলিশ যদি বিক্ষোভকারীদের নির্ধারিত স্থান থেকে সরিয়ে দেয়, যে জায়গায় তাঁদের থামানো হবে, সেখানেই তাঁরা প্রতিবাদ চালিয়ে যাবেন।
মুম্বইয়ের পর দিল্লির কর্মসূচি
সিজেপির দিল্লি কর্মসূচির ঘোষণা আসে মুম্বইয়ের শিবাজি পার্কে প্রতিবাদের একদিন পর। ২ অক্টোবর গান্ধী জয়ন্তীতে সেখানে দলীয় কর্মী ও সমর্থকেরা জড়ো হন। হিন্দুস্তান টাইমস ও ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশের অনুমতি না থাকলেও বড় সংখ্যায় মানুষ কর্মসূচিতে অংশ নেন। বিক্ষোভকারীরা মুখ্য নির্বাচন কমিশনারের পদত্যাগ এবং নির্বাচন কমিশনের কাজের স্বচ্ছতার দাবি তোলেন। দলের প্রচারে ভোটার তালিকা সংশোধন ও নির্বাচনী প্রক্রিয়া নিয়ে নানা অভিযোগ সামনে আনা হয়।
সিজেপির বক্তব্য অনুযায়ী, মুম্বইয়ের কর্মসূচি ছিল তাদের দেশব্যাপী রাজনৈতিক আন্দোলনের একটি ধাপ। দিল্লির পরে কলকাতা, পাটনা, গোয়া এবং বেঙ্গালুরুর মতো শহরেও প্রতিবাদ করার পরিকল্পনা রয়েছে বলে হিন্দুস্তান টাইমস জানিয়েছে। তবে প্রতিটি শহরে কর্মসূচির তারিখ, পুলিশের অনুমতি এবং অংশগ্রহণকারীর সংখ্যা এখনও প্রকাশিত হয়নি। মুম্বইয়ের জমায়েতকে সংবাদমাধ্যমে “হাজার হাজার” মানুষের উপস্থিতি হিসেবে বর্ণনা করা হয়েছে; নির্দিষ্ট সরকারি সংখ্যা প্রকাশিত না হওয়ায় তার বেশি নির্ভুল পরিসংখ্যান উল্লেখ করা যাচ্ছে না।
জন্তর মন্তর দিল্লির একটি নির্দিষ্ট প্রতিবাদস্থল। ঐতিহাসিকভাবে এটি ১৭২৪ সালে নির্মিত জ্যোতির্বৈজ্ঞানিক মানমন্দিরের নাম হলেও, বর্তমানে দিল্লিতে জনসমাবেশ ও রাজনৈতিক প্রতিবাদের জন্য পরিচিত। তাই সিজেপির ঘোষণায় “জন্তর মন্তর বিক্ষোভ” বলতে দিল্লির ওই নির্ধারিত প্রতিবাদস্থলে কর্মসূচিকে বোঝানো হয়েছে। ১০ অক্টোবরের কর্মসূচির অনুমতি, জমায়েতের শর্ত এবং নিরাপত্তা ব্যবস্থা নিয়ে দিল্লি পুলিশের চূড়ান্ত ঘোষণা এখনও সামনে আসেনি।
এসআইআর নিয়ে সিজেপির দাবি
সিজেপির আন্দোলনের কেন্দ্রে রয়েছে ভোটার তালিকার Special Intensive Revision বা SIR। দলের অভিযোগ, এই প্রক্রিয়ায় বৈধ ভোটারদের নাম বাদ পড়ার আশঙ্কা আছে এবং নির্বাচন কমিশন যথেষ্ট স্বচ্ছভাবে কাজ করছে না। দলের দাবির মধ্যে রয়েছে জ্ঞানেশ কুমারের পদত্যাগ, SIR প্রক্রিয়া স্থগিত করা, ২০২৫ সালের জানুয়ারির ভোটার তালিকা পুনর্বহাল এবং ভোটার তালিকা সংশোধনের সিদ্ধান্তের বিষয়ে তদন্ত। সিজেপি নির্বাচন কমিশনার নিয়োগ সম্পর্কিত ২০২৩ সালের আইন প্রত্যাহারের দাবিও তুলেছে। এগুলি সিজেপির রাজনৈতিক দাবি; নির্বাচন কমিশন এই অভিযোগগুলিকে স্বীকৃত সত্য হিসেবে মেনে নিয়েছে—এমন তথ্য নেই।
নির্বাচন কমিশন SIR নিয়ে নিজেদের অবস্থানও জানিয়েছে। ২৬ সেপ্টেম্বরের বিবৃতিতে কমিশন দাবি করে, সংশ্লিষ্ট সিদ্ধান্তগুলি কমিশনের তিন সদস্যের সর্বসম্মত অনুমোদনেই নেওয়া হয়েছে। কমিশনের বক্তব্য, অযোগ্য, মৃত বা দ্বৈত ভোটারের নাম শনাক্ত করা এবং যোগ্য ভোটারদের তালিকায় রাখা—এই প্রক্রিয়ার উদ্দেশ্য। যাঁদের নাম নিয়ে আপত্তি রয়েছে, তাঁরা নির্ধারিত সময়ের মধ্যে সংশ্লিষ্ট Electoral Registration Officer বা ERO-এর কাছে দাবি ও আপত্তি জানাতে পারেন। ইন্ডিয়া টুডের প্রতিবেদনে দিল্লিতে দাবি ও আপত্তি জানানোর সময়সীমা ৩০ অক্টোবর পর্যন্ত বাড়ানোর কথা উল্লেখ করা হয়েছে।
SIR নিয়ে রাজনৈতিক বিতর্ক শুধু সিজেপির মধ্যে সীমাবদ্ধ নয়। বিভিন্ন বিরোধী দলও নির্বাচন কমিশনের ভূমিকা, ভোটার তালিকা থেকে নাম বাদ পড়া এবং কমিশনের জবাবদিহি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। অন্যদিকে কমিশন সাংবিধানিক ক্ষমতা ও নির্ধারিত প্রক্রিয়ার কথা বলেছে। ফলে বিতর্কের নিষ্পত্তি হবে দাবি-আপত্তির ফল, সরকারি নথি, আদালতের নির্দেশ এবং সংশোধিত চূড়ান্ত ভোটার তালিকার ভিত্তিতে। রাজনৈতিক সভায় ওঠা অভিযোগকে আদালত বা নির্বাচন কমিশনের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে প্রকাশ করা উচিত নয়।
শান্তিপূর্ণ আন্দোলনের আশ্বাস
অভিজিৎ দিপকে বলেছেন, ১০ অক্টোবরের কর্মসূচি মহাত্মা গান্ধীর অহিংস আন্দোলনের আদর্শ অনুসরণ করবে। তিনি সাধারণ মানুষকে অংশ নেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন এবং দাবি করেছেন, সিজেপি ভোটারদের অধিকার ও নির্বাচনী স্বচ্ছতার প্রশ্নে আন্দোলন চালিয়ে যাবে। তবে পুলিশের অনুমতি ছাড়া বড় জমায়েত হলে আইনশৃঙ্খলা নিয়ে প্রশাসনের সঙ্গে মতবিরোধ দেখা দিতে পারে। দিল্লি পুলিশ কর্মসূচির জন্য নির্দিষ্ট শর্ত আরোপ করবে কি না, তা এখনও স্পষ্ট নয়।
মুম্বইয়ে পুলিশের অনুমতি না থাকা সত্ত্বেও জমায়েত হওয়ার পর পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে বড় পুলিশ মোতায়েন করা হয়েছিল। দিল্লির কর্মসূচিতে এমন পরিস্থিতি এড়াতে আয়োজকদের অনুমতি, রুট, সময় ও নিরাপত্তা সংক্রান্ত নির্দেশ মেনে চলা গুরুত্বপূর্ণ। বিক্ষোভের অধিকার গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার অংশ হলেও জনসাধারণের চলাচল, নিরাপত্তা এবং আইনশৃঙ্খলার ভারসাম্য বজায় রাখাও প্রশাসনের দায়িত্ব। ১০ অক্টোবরের আগে দিল্লি পুলিশ ও সিজেপির মধ্যে কোনও আনুষ্ঠানিক সমঝোতা হয় কি না, সেদিকে নজর থাকবে।
অসম ও বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপট
সিজেপি সম্প্রতি অসমেও সংগঠন বাড়ানোর চেষ্টা করেছে। দলের সহ-আহ্বায়ক আশুতোষ রাঙ্কা গুয়াহাটিতে ভোটার তালিকার SIR নিয়ে পরিবারের সঙ্গে দেখা এবং সরকারি স্কুল পরিদর্শনের কর্মসূচির কথা বলেছিলেন। এনডিটিভির প্রতিবেদনে বলা হয়, সিজেপি অসমে SIR-প্রক্রিয়ায় প্রভাবিত পরিবারগুলির সঙ্গে কথা বলার পরিকল্পনা করেছিল। দলটি “স্কুল ঠিক করো” অভিযানও চালায়।
২৭ সেপ্টেম্বর গুয়াহাটিতে স্বেচ্ছাসেবক সভার আগে আশুতোষ রাঙ্কাসহ সিজেপির কেন্দ্রীয় দলের সদস্যদের পুলিশ আটক করেছিল বলে এনডিটিভি জানায়। দলটি এই ঘটনাকে অন্যায় আটক বলে অভিযোগ করে; পরে আটক ব্যক্তিদের ছেড়ে দেওয়া হয়। অসমে দলের এই কর্মসূচি নিয়ে শিক্ষা, ভোটার তালিকা ও রাজনৈতিক অধিকার—তিনটি বিষয় একসঙ্গে আলোচনায় আসে। তবে লালা টাউন বা হাইলাকান্দিতে SIR-সংক্রান্ত নির্দিষ্ট কোনও ঘটনার তথ্য এই প্রতিবেদনগুলিতে নেই।
লালা ও হাইলাকান্দির ভোটারদের জন্য বাস্তবিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ বিষয় হল নিজের নাম ও ভোটার তথ্য যাচাই করা। নাম বাদ পড়লে, ঠিকানা ভুল থাকলে বা নথি নিয়ে আপত্তি থাকলে সংশ্লিষ্ট ERO বা নির্বাচন কমিশনের নির্ধারিত প্রক্রিয়ায় দাবি ও আপত্তি জানানো উচিত। সিজেপি জন্তর মন্তর বিক্ষোভ ১০ অক্টোবর সত্যিই কত বড় আকার নেয়, পুলিশ কী সিদ্ধান্ত দেয় এবং নির্বাচন কমিশন SIR নিয়ে নতুন কোনও ব্যাখ্যা প্রকাশ করে কি না—এখন নজর থাকবে সেই দিকেই। রাজনৈতিক দাবির পাশাপাশি যাচাইযোগ্য নথি ও সাংবিধানিক প্রক্রিয়াই শেষ পর্যন্ত ভোটার তালিকা-সংক্রান্ত বিতর্কের ভিত্তি নির্ধারণ করবে।