অসমের কৃষিমন্ত্রী পীযূষ হাজারিকা বৃহস্পতিবার, ২৯ অক্টোবর কাছাড় জেলার দেওয়ান চা বাগানে তেল পামের চাষ এবং ফুলেরতালের মারকুলিনের আনারস খেত ঘুরে দেখেছেন। সরকার সম্প্রতি চা বাগানের অব্যবহৃত জমিতে তেল পাম চাষের অনুমতি দিয়েছে। তাই বরাক উপত্যকায় তেল পাম চাষ নিয়ে এই সফর গুরুত্বপূর্ণ। মন্ত্রী শিলচরে পৌঁছে প্রথমে দেওয়ান চা বাগানে যান। তাঁর সফরসূচিতে শিলচরের জেলা কমিশনারের অফিসে একটি বৈঠক এবং পরে হাইলাকান্দি যাওয়ার কথা আছে।
সফরে কী দেখলেন মন্ত্র
দেওয়ান চা বাগানে মন্ত্রী পাম চাষের অগ্রগতি দেখেন এবং উৎপাদনের পদ্ধতি বুঝে নেন। পরে সামাজিক মাধ্যমে তিনি লেখেন, “দেওয়ান চা বাগানে সমৃদ্ধ তেল পামের বাগান দেখে আনন্দিত। বরাক উপত্যকার কৃষক সমাজ এই বৈচিত্র্যের ডাকে সাড়া দিচ্ছে, যা অসমের কৃষির নতুন অধ্যায়ের ইঙ্গিত।”
এরপর তিনি লক্ষীপুর বিধানসভা কেন্দ্রের অন্তর্গত ফুলেরতাল এলাকার মারকুলিনে আনারস খেতে যান। সেখানে চাষিদের সঙ্গে কথা বলে তাঁদের চাষপদ্ধতি, উৎপাদনের মাত্রা ও সমস্যার কথা শোনেন। চাষিরা কিছু অসুবিধা ও দাবি মন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। হাজারিকা মারকুলিনের আনারসকে অসমের গর্ব বলেছেন। তাঁর কথায়, এই ফল ভারতের বিভিন্ন বাজারে পৌঁছয় এবং বিদেশেও রপ্তানি হয়। কিছু দাবি দ্রুত পূরণে পদক্ষেপ নেওয়ার আশ্বাসও তিনি দিয়েছেন।
সরকারের নতুন সিদ্ধান্ত
২৬ অক্টোবর গুয়াহাটিতে কৃষি দপ্তরের আয়োজিত এক বিশেষ অংশীদার-সম্মেলনে হাজারিকা জানান, রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী চা বাগানের অব্যবহৃত জমির ৫ শতাংশ পর্যন্ত তেল পাম চাষের আনুষ্ঠানিক অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। বাকি অব্যবহৃত জমিতে বহুফসলি চাষ ও তেল পাম উৎসাহিত করা হবে, আর এতে বরাক উপত্যকাকে বিশেষ অগ্রাধিকার দেওয়া হবে।
পরিকল্পনায় আগামী পাঁচ বছরে ১৫ হাজার হেক্টর জমিতে তেল পাম চাষ এবং ৩০ হাজার হেক্টর জমিকে সেচের আওতায় আনার লক্ষ্য রয়েছে। চা বাগানগুলিকে লিচু, ড্রাগন ফ্রুট ও সুপারির চারা দেওয়া হবে। আগামী বছর থেকে রাজ্যজুড়ে প্রতি বছর পাঁচ কোটি উদ্যানজাত চারা বিতরণের কথাও বলা হয়েছে। বাগান মালিকদের অন্ধ্রপ্রদেশ ও অরুণাচল প্রদেশে পরিদর্শনে নিয়ে গিয়ে সরাসরি অভিজ্ঞতা দেওয়ার পরিকল্পনা আছে।
উদ্বেগ ও প্রশ্ন
মন্ত্রী বলেছেন, তেল পাম নিয়ে ভুল ধারণা দূর করা দরকার। তাঁর বক্তব্য, এই চাষে ধানের মতোই জল লাগে, তাই অকারণ ভয়ের কিছু নেই। খাদ্যতেল আমদানিতে খরচ হওয়া হাজার হাজার কোটি টাকা বাঁচিয়ে সেই লাভ সরাসরি কৃষকদের কাছে পৌঁছনোর কথাও তিনি বলেছেন। এটি মন্ত্রীর নিজস্ব দাবি।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য
হাইলাকান্দির সঙ্গে এই বিষয়ের সরাসরি যোগ আছে। ২০২৩ সালে জাতীয় ভোজ্যতেল মিশন–তেল পাম প্রকল্পে হাইলাকান্দি, কাছাড় ও করিমগঞ্জ (এখনকার শ্রীভূমি) গডরেজ অ্যাগ্রোভেট লিমিটেডের জন্য বরাদ্দ করা হয়েছিল। জেলা প্রশাসনের তথ্য অনুযায়ী, হাইলাকান্দির আয়তন ১,৩২,৭০০ হেক্টর এবং এটি বরাক উপত্যকার কৃষি-জলবায়ু অঞ্চলের অংশ।
২৯ অক্টোবর হাইলাকান্দিতে মন্ত্রীর কী কর্মসূচি, সূত্রগুলিতে তা এখনও পাওয়া যায়নি। লালা টাউন ও আশপাশের কৃষক বা চা বাগানের মালিকরা জেলা কৃষি দপ্তরে যোগাযোগ করে জানতে পারেন, তাঁদের জমি তেল পাম বা অন্য ফসলের সহায়তার আওতায় পড়ে কি না। চুক্তির আগে শর্ত, ফসল কেনার ব্যবস্থা এবং জলের চাহিদা ভালোভাবে যাচাই করা প্রয়োজন।
সার বণ্টন নিয়ে সতর্কতা
একই দিনে হাজারিকা সার সরবরাহকারী সংস্থাগুলির সঙ্গেও বৈঠক করেন। তিনি বেশি দাম নেওয়া, কৃত্রিম সংকট তৈরি এবং ভর্তুকিযুক্ত সারের সঙ্গে অন্য পণ্য কিনতে বাধ্য করার বিরুদ্ধে সতর্ক করেছেন। পরিবহন বা রেক-পয়েন্ট থেকে দূরত্বের বাড়তি খরচ কৃষক বা স্থানীয় বিক্রেতার ওপর চাপানো সহ্য করা হবে না বলে তিনি জানান।
সামনে কী দেখার
এখন নজর থাকবে হাইলাকান্দিতে মন্ত্রীর ঘোষণা এবং মারকুলিনের চাষিদের দাবির সুরাহা হয় কি না, সেদিকে। চা বাগানের জমিতে তেল পামের সুযোগ কতটা কাজে লাগে এবং কৃষকরা প্রতিশ্রুত আয় পান কি না, তা আগামী মরসুমগুলিতে বোঝা যাবে। বরাক উপত্যকায় তেল পাম চাষ ও উদ্যানজাত ফসলের সম্প্রসারণ কৃষকদের আয় বাড়াতে পারে। তবে জলসম্পদের ওপর প্রভাব নিয়ে স্বচ্ছ মূল্যায়ন এবং সঠিক বাজার-ব্যবস্থাও জরুরি।