Read today's news --> ⚡️Click here 

শিলচরে অ্যাম্বুল্যান্স আটক, কনভয় ইস্যুতে চার পুলিশকর্মী সাসপেন্ড

শিলচরে মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কনভয়ের যাতায়াতের সময় একটি অ্যাম্বুল্যান্স থামিয়ে রাখার ঘটনায় চার পুলিশকর্মীকে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। ৩০ সেপ্টেম্বর রামনগর আইএসবিটি পয়েন্টে ঘটনাটি ঘটে বলে জানা গিয়েছে। মুখ্যমন্ত্রী নিজেই সামাজিক মাধ্যম এক্স-এ দুঃখপ্রকাশ করে বলেন, তাঁর কনভয় যাওয়ার জন্য অ্যাম্বুল্যান্স আটকে রাখা গ্রহণযোগ্য নয়। শিলচরে অ্যাম্বুল্যান্স আটক নিয়ে ছড়িয়ে পড়া ভিডিওর পর প্রশাসনের এই পদক্ষেপে জরুরি পরিষেবায় যানবাহন চলাচলের অধিকার এবং ভিআইপি কনভয় ব্যবস্থাপনা নিয়ে নতুন করে প্রশ্ন উঠেছে।

মুখ্যমন্ত্রী বলেন, “জরুরি চিকিৎসার প্রয়োজন থাকা কোনও মানুষের জীবনের চেয়ে মুখ্যমন্ত্রীর যাতায়াত কখনও অগ্রাধিকার পেতে পারে না।” রোগী ও তাঁর পরিবারের কাছে ক্ষমা চেয়ে তিনি জানান, সাধারণ মানুষের যাতায়াতে ভিআইপি চলাচলের কারণে যেন অযথা সমস্যা না হয়, সে বিষয়ে আগে থেকেই স্পষ্ট নির্দেশ ছিল। কিন্তু শিলচরের এই ঘটনায় সেই নির্দেশ কার্যকর না হওয়ায় তিনি উদ্বেগ প্রকাশ করেন। দায় নির্ধারণে তদন্ত এবং দায়ী ব্যক্তিদের বিরুদ্ধে কঠোর পদক্ষেপের নির্দেশও দেন মুখ্যমন্ত্রী।

কী ঘটেছিল রামনগর আইএসবিটি পয়েন্টে

পুলিশ সূত্রে জানা গিয়েছে, মুখ্যমন্ত্রীর শিলচর সফরের সময় রামনগর আইএসবিটি পয়েন্টে কনভয়ের জন্য ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণ করা হচ্ছিল। সেই সময় একটি অ্যাম্বুল্যান্সকে কনভয় পার হওয়া পর্যন্ত অপেক্ষা করতে দেখা যায়। ঘটনাস্থলের একটি ভিডিও সামাজিক মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর বিষয়টি ব্যাপক আলোচনার জন্ম দেয়। ভিডিওতে দেখা যায়, কনভয় এগিয়ে যাওয়ার সময় অ্যাম্বুল্যান্সটি রাস্তার পাশে অপেক্ষা করছে।

তবে অ্যাম্বুল্যান্সে রোগী ছিলেন কি না, তা নিয়ে প্রথম দিকে ভিন্ন তথ্য সামনে আসে। স্থানীয় সংবাদমাধ্যমকে কাছাড় পুলিশের এক কর্মকর্তা প্রথমে জানান, অ্যাম্বুল্যান্সটি খালি ছিল এবং চালক কনভয়কে আগে যেতে দিয়েছিলেন। চালক আলি আব্দুল লস্করের একটি ভিডিও বক্তব্যও পুলিশ প্রকাশ করেছিল বলে স্থানীয় প্রতিবেদনগুলিতে উল্লেখ করা হয়; সেখানে তিনি বলেন, পুলিশ তাঁকে এগিয়ে যেতে বললেও তিনি প্রায় এক মিনিট অপেক্ষা করেছিলেন।

অন্যদিকে, মুখ্যমন্ত্রী তাঁর দুঃখপ্রকাশের বার্তায় রোগী ও পরিবারের কাছে ক্ষমা চান। পরে একাধিক সংবাদমাধ্যম জানায়, অ্যাম্বুল্যান্সটি রোগী বহন করছিল বলে অভিযোগ ওঠার পরই প্রশাসন দ্রুত পদক্ষেপ করে। তদন্তের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে বলে চূড়ান্ত তথ্য নির্ধারণের দায় তদন্তকারী কর্তৃপক্ষের ওপরই থাকছে। এই পরিস্থিতিতে যাচাই না হওয়া তথ্যের ভিত্তিতে রোগীর পরিচয়, অসুস্থতার ধরন বা অ্যাম্বুল্যান্সটির গন্তব্য সম্পর্কে কোনও দাবি করা সমীচীন নয়।

চার পুলিশকর্মী সাসপেন্ড, তদন্তের নির্দেশ

কাছাড় পুলিশের পক্ষ থেকে চারজন পুলিশকর্মীকে তাৎক্ষণিকভাবে সাময়িক বরখাস্ত করা হয়েছে। তাঁরা হলেন শ্রীকোনা পুলিশ পোস্টের সাব-ইন্সপেক্টর বিজয় গোস্বামী, এনএইচ ওয়ে পুলিশ পোস্টের সাব-ইন্সপেক্টর শিবশঙ্কর দাস, কাটিগড়া থানার ল্যান্স নায়েক জহুরুল ইসলাম এবং শিলচর ট্রাফিক শাখার ল্যান্স নায়েক কাওসার আহমেদ বড়ভুঁইয়া। তাঁদের বিরুদ্ধে মুখ্যমন্ত্রীর কনভয়ের রুটে ট্রাফিক দায়িত্ব পালনে গাফিলতির অভিযোগে বিভাগীয় তদন্ত চলবে।

অতিরিক্ত জেলা কমিশনারের নেতৃত্বে পৃথক তদন্তও শুরু করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। তদন্তে দেখা হবে, ট্রাফিক নিয়ন্ত্রণের সময় জরুরি যানবাহনকে কীভাবে পথ দেওয়া হয়েছিল, দায়িত্বে থাকা পুলিশকর্মীরা প্রযোজ্য নির্দেশ মানেন কি না এবং অ্যাম্বুল্যান্সটির অপেক্ষার কারণ কী ছিল। সাসপেনশন কোনও ব্যক্তির চূড়ান্ত দোষ প্রমাণ করে না; বিভাগীয় তদন্তের ফলের ভিত্তিতেই পরবর্তী প্রশাসনিক ব্যবস্থা নির্ধারিত হবে।

জরুরি যানবাহনের অগ্রাধিকার কেন গুরুত্বপূর্ণ

ভারতের মোটর ভেহিকলস অ্যাক্ট, ১৯৮৮-এর ১৯৪ই ধারায় অ্যাম্বুল্যান্স বা দমকলের মতো জরুরি যানবাহন সামনে এলে অন্য গাড়ির চালককে রাস্তার এক পাশে সরে গিয়ে নিরবচ্ছিন্ন পথ করে দেওয়ার কথা বলা হয়েছে। আইন অমান্য করলে জরিমানা বা শাস্তির বিধানও রয়েছে। অর্থাৎ রোগী পরিবহণের সময় অ্যাম্বুল্যান্সের দ্রুত চলাচল কেবল মানবিক প্রয়োজন নয়, আইনি বাধ্যবাধকতার সঙ্গেও যুক্ত।

জরুরি রোগীর ক্ষেত্রে কয়েক মিনিটের বিলম্বও গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে। সে কারণেই ট্রাফিক পুলিশ, কনভয় ব্যবস্থাপনা দল এবং সাধারণ গাড়িচালক—সব পক্ষেরই অ্যাম্বুল্যান্সকে অগ্রাধিকার দেওয়ার নিয়ম মেনে চলা জরুরি। মুখ্যমন্ত্রীর বক্তব্যও একই নীতির ওপর জোর দিয়েছে: পদমর্যাদা, নিরাপত্তা অথবা কনভয় ব্যবস্থাপনা—কোনোটিই চিকিৎসাজনিত জরুরি পরিস্থিতির চেয়ে বেশি গুরুত্বপূর্ণ হতে পারে না।

লালা ও হাইলাকান্দির জন্য বার্তা

হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউন ও আশপাশের বহু রোগী উন্নত চিকিৎসার জন্য নিয়মিত শিলচর মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতাল, শিলচরের বেসরকারি হাসপাতাল এবং বিশেষজ্ঞ চিকিৎসাকেন্দ্রের উপর নির্ভরশীল। দূরত্ব, যানজট, বর্ষাকালে রাস্তার অবস্থা এবং সময়মতো অ্যাম্বুল্যান্স পাওয়া—এসব বিষয় রোগী ও পরিবারের জন্য বাস্তব উদ্বেগের। শিলচরে অ্যাম্বুল্যান্স আটক ঘটনাটি তাই শুধু একটি কনভয়-সংক্রান্ত বিতর্ক নয়; এটি বরাক উপত্যকার আন্তঃজেলা চিকিৎসা-যোগাযোগ ব্যবস্থার গুরুত্বও তুলে ধরেছে।

লালা থেকে শিলচর যাওয়ার সড়কপথে দুর্ঘটনা, প্রসূতি-সংক্রান্ত জরুরি অবস্থা, হৃদ্‌রোগ বা গুরুতর অসুস্থতার ক্ষেত্রে অ্যাম্বুল্যান্সের সময়মতো পৌঁছনো অপরিহার্য। প্রশাসনের কাছে মানুষের প্রত্যাশা, ভিআইপি চলাচল বা বড় অনুষ্ঠান উপলক্ষে ট্রাফিক পরিকল্পনা এমন হবে যাতে অ্যাম্বুল্যান্স, দমকল ও অন্যান্য জরুরি যানকে কোথাও থামতে না হয়। কেবল শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নয়, বাস্তবসম্মত রুট পরিকল্পনা এবং মাঠপর্যায়ে নিয়মের কঠোর প্রয়োগই এ ধরনের ঘটনার পুনরাবৃত্তি কমাতে পারে।

শিলচরের ঘটনায় মুখ্যমন্ত্রীর প্রকাশ্য ক্ষমা প্রার্থনা, চার পুলিশকর্মীর সাসপেনশন এবং তদন্তের নির্দেশ প্রশাসনের অবস্থান স্পষ্ট করেছে। এখন নজর থাকবে তদন্তে কী উঠে আসে এবং ভবিষ্যতে কনভয় চলাচলের সময় জরুরি যানবাহনের অগ্রাধিকার নিশ্চিত করতে কাছাড় পুলিশ ও জেলা প্রশাসন কী কার্যকর পরিবর্তন আনে। মানুষের জীবন রক্ষায় অ্যাম্বুল্যান্সের পথ সব পরিস্থিতিতেই খোলা থাকা উচিত—এই ঘটনায় সেই মৌলিক বার্তাটিই সামনে এসেছে।

শিলচরে অ্যাম্বুল্যান্স আটক, কনভয় ইস্যুতে চার পুলিশকর্মী সাসপেন্ড
Scroll to top