আসাম মন্ত্রিসভা বৃহস্পতিবার আসাম মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন নিয়ম, ২০২৬ অনুমোদন করেছে, যার মাধ্যমে রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের সদস্যরা একটি নতুন নিয়ন্ত্রক কাঠামোর অধীনে তাঁদের বিবাহ নিবন্ধন করতে পারবেন। মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুসারে প্রাথমিকভাবে নির্ধারিত নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমে এই সুবিধা পাওয়া যাবে, এবং পরবর্তীতে নিবন্ধন প্রক্রিয়া আরও সহজলভ্য করতে পঞ্চায়েত পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা রয়েছে । একই বৈঠকে মন্ত্রিসভা দুর্গাপুজোর আগে অরুণোদয় প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের জন্য একটি বিশেষ পুজো বোনাসও অনুমোদন করেছে।
নতুন নিবন্ধন নিয়মের প্রেক্ষাপট ও গুরুত্ব
আসাম সরকার ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ১৯৩৫ সালের ব্রিটিশ আমলের আসাম মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন আইন বাতিল করেছিল, যার ফলে রাজ্যে মুসলিম বিবাহ ও তালাক সংক্রান্ত সমস্ত বিষয় বিশেষ বিবাহ আইন, ১৯৫৪-এর আওতায় চলে আসে । তৎকালীন পর্যটন মন্ত্রী জয়ন্ত মল্লবরুয়া জানিয়েছিলেন যে পুরাতন আইনটি অপ্রাপ্তবয়স্ক ছেলে-মেয়েদের বিবাহ নিবন্ধনের জন্য ব্যবহৃত হচ্ছিল, যা বাতিলের মূল কারণ ছিল ।
সেই সময় রাজ্যে ৯৪ জন অনুমোদিত ব্যক্তি ছিলেন যাঁরা মুসলিম বিবাহ ও তালাক নিবন্ধন করতে পারতেন, এবং আইন বাতিলের ফলে তাঁদের এই ক্ষমতা বিলুপ্ত হয়ে যায়, যার জন্য তাঁদের প্রত্যেককে দুই লক্ষ টাকা এককালীন ক্ষতিপূরণ দেওয়া হয়েছিল । ২০২৬ সালের এই নতুন আসাম মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন নিয়ম মূলত সেই শূন্যতা পূরণ করে একটি সুনির্দিষ্ট প্রাতিষ্ঠানিক কাঠামোর মাধ্যমে বিবাহ নিবন্ধনের সুযোগ প্রদান করছে।
নতুন নিয়মের কার্যপ্রণালী ও ভবিষ্যৎ সম্প্রসারণ পরিকল্পনা
নতুন নিয়মের আওতায় মুসলিম বিবাহ এখন নিয়মিত রেজিস্ট্রারদের মাধ্যমে নিবন্ধিত হবে, যা পূর্বের ব্যবস্থার তুলনায় অধিক প্রাতিষ্ঠানিক ও স্বচ্ছ একটি প্রক্রিয়া তৈরি করবে । এই নিয়মকে “আসাম মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন কম্পালসরি রুল, ২০২৬” নামেও উল্লেখ করা হয়েছে, যা নিবন্ধনের বাধ্যতামূলক প্রকৃতি নির্দেশ করে ।
মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্ত অনুযায়ী, প্রাথমিক পর্যায়ে নির্ধারিত নিবন্ধন ব্যবস্থার মাধ্যমেই এই সুবিধা পাওয়া যাবে, তবে সরকারের লক্ষ্য ভবিষ্যতে এই সুবিধা পঞ্চায়েত পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করা, যাতে গ্রামীণ এলাকার মানুষও সহজে এই সুযোগ গ্রহণ করতে পারেন । ২০১১ সালের আদমশুমারি অনুযায়ী আসামের মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশ মুসলিম সম্প্রদায়ের, যার ফলে এই নিয়মের প্রভাব রাজ্যের একটি বিশাল জনগোষ্ঠীর উপর পড়বে।
অরুণোদয় প্রকল্পে পুজো বোনাস ও অন্যান্য সিদ্ধান্ত
মন্ত্রিসভা দুর্গাপুজোর আগে অরুণোদয় প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের জন্য একটি বিশেষ উৎসবকালীন সুবিধা অনুমোদন করেছে, যার আওতায় অক্টোবর মাসে সুবিধাভোগীরা নিয়মিত মাসিক ১,২৫০ টাকার পরিবর্তে ১,৫০০ টাকা পাবেন । মুখ্যমন্ত্রী ডঃ হিমন্ত বিশ্ব শর্মা জানিয়েছেন, বিহুর সময়েও সুবিধাভোগীরা অতিরিক্ত আর্থিক সহায়তা পাবেন। তিনি আরও বলেন যে কিছু সুবিধাভোগী তাঁদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্টে টাকা না পাওয়ার অভিযোগ জানিয়েছেন, এবং ভুল তথ্য জমা দেওয়া সুবিধাভোগীদের নাম তালিকা থেকে বাদ যেতে পারে বলে তিনি সতর্ক করেছেন, তবে তাঁর অনুমোদন ছাড়া কোনো সুবিধাভোগীর নাম বাদ দেওয়া সম্ভব নয় বলেও তিনি স্পষ্ট করেছেন ।
একই বৈঠকে মন্ত্রিসভা অক্টোবর মাসে ভর্তুকিযুক্ত চিনি ও ডাল ১০৫ টাকার পরিবর্তে ১০০ টাকায় সরবরাহের সিদ্ধান্তও নিয়েছে । এছাড়া মন্ত্রিসভা মৎস্য খাত ও ১০২টি জলাভূমির উন্নয়নের জন্য ৭৯৬ কোটি টাকার একটি এডিবি ঋণ, একটি মশলা পরীক্ষণ গবেষণাগার স্থাপন, কৃষি ঋণ সংশোধন এবং শিল্প উৎসাহভাতা সংক্রান্ত সিদ্ধান্তও অনুমোদন করেছে ।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের জন্য এই সিদ্ধান্তের তাৎপর্য
আসাম মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন নিয়ম হাইলাকান্দি জেলার জন্য বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক, কারণ এই জেলায় মুসলিম জনগোষ্ঠীর উপস্থিতি যথেষ্ট উল্লেখযোগ্য। লালা টাউন ও তার আশেপাশের এলাকার বহু পরিবার এই নতুন নিবন্ধন ব্যবস্থার সরাসরি সুবিধাভোগী হতে পারেন, বিশেষত যখন সরকার ভবিষ্যতে এই সুবিধা পঞ্চায়েত পর্যায় পর্যন্ত সম্প্রসারিত করার পরিকল্পনা করছে, যা গ্রামীণ হাইলাকান্দির জন্য নিবন্ধন প্রক্রিয়াকে আরও সহজ করে তুলবে।
অরুণোদয় প্রকল্পের পুজো বোনাসও হাইলাকান্দি জেলার হাজার হাজার সুবিধাভোগী পরিবারের জন্য গুরুত্বপূর্ণ, কারণ দুর্গাপুজোর মতো উৎসবের সময় এই বাড়তি ৫০০ টাকা তাঁদের উৎসব পালনে বাস্তব সহায়তা প্রদান করবে। ভর্তুকিযুক্ত চিনি ও ডালের কম মূল্যও লালা টাউনের নিম্ন আয়ের পরিবারগুলির জন্য উৎসবকালীন গৃহস্থালি ব্যয় কমাতে সহায়ক হবে।
আগামী দিনে বাস্তবায়নের দিকে নজর
আসাম মুসলিম বিবাহ নিবন্ধন নিয়ম এবং অরুণোদয় প্রকল্পের পুজো বোনাস দুটিই রাজ্য সরকারের উৎসবকালীন প্রশাসনিক ও কল্যাণমূলক সিদ্ধান্তের অংশ। আগামী দিনে নতুন বিবাহ নিবন্ধন ব্যবস্থা কীভাবে বাস্তবায়িত হয় এবং পঞ্চায়েত পর্যায়ে এই সুবিধা সম্প্রসারণের প্রক্রিয়া কতটা দ্রুত এগিয়ে যায়, তার দিকেই এখন নজর থাকবে রাজ্যের মুসলিম সম্প্রদায়ের। একই সাথে অরুণোদয় প্রকল্পের সুবিধাভোগীদের ব্যাঙ্ক অ্যাকাউন্ট সংক্রান্ত সমস্যাগুলি কীভাবে সমাধান করা হয়, তা নিয়েও হাইলাকান্দিসহ রাজ্যের বিভিন্ন জেলার সুবিধাভোগীরা আগ্রহী থাকবেন।