আবুধাবির হাসপাতালে চিকিৎসাধীন ফ্লাইদুবাইয়ের ভারতীয় পাইলট ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছরের সঙ্গে শুক্রবার ভিডিও কলে কথা বললেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি। ককপিটে সহ-পাইলটের হামলার পর আহত অবস্থাতেও বিমানযাত্রীদের নিরাপত্তার জন্য তাঁর সাহস, উপস্থিত বুদ্ধি ও সংযমের প্রশংসা করেন প্রধানমন্ত্রী। আকাশবাণী নিউজের প্রতিবেদন অনুযায়ী, দুবাই থেকে তেল আবিবগামী ফ্লাইদুবাই বিমানে ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের পদক্ষেপে প্রায় ১৮০ জনের জীবন রক্ষা পায় এবং বড় দুর্ঘটনা এড়ানো সম্ভব হয়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর দ্রুত ও সম্পূর্ণ সুস্থতা কামনা করেছেন।
ভিডিও কলে ক্যাপ্টেন মাচ্ছর প্রধানমন্ত্রীর কাছে ঘটনার বিবরণ এবং সংকটের সময় তাঁকে কীভাবে সাহস জুগিয়েছিল, তা জানান। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের বিবৃতিতে বলা হয়েছে, গুরুতর আহত হয়েও অন্যদের জীবন রক্ষায় ক্যাপ্টেনের দৃঢ়তা ও দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা বিশেষভাবে প্রশংসিত হয়েছে। প্রধানমন্ত্রী বলেন, তাঁর সাহসিকতা শুধু বহু মানুষের জীবন বাঁচায়নি, বড় বিপর্যয়ও ঠেকিয়েছে। ক্যাপ্টেন বর্তমানে সংযুক্ত আরব আমিরশাহির একটি হাসপাতালে চিকিৎসাধীন এবং ভারতীয় দূতাবাস তাঁর স্বাস্থ্যের বিষয়ে যোগাযোগ রাখছে।
ককপিটে হামলার পর কী ঘটেছিল
৩০ সেপ্টেম্বর ফ্লাইদুবাইয়ের এফজেড ১০৭৩ উড়ানটি দুবাই থেকে তেল আবিব যাচ্ছিল। উড়ান চলাকালীন ককপিটে ক্যাপ্টেন ও তাঁর সহ-পাইলটের মধ্যে হামলার ঘটনা ঘটে বলে সৌদি আরবের প্রাথমিক তদন্ত এবং আন্তর্জাতিক সংবাদমাধ্যমের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে। ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেসের তথ্য অনুযায়ী, সহ-পাইলটের হামলার সময় বিমানটি মাত্র ২৯ সেকেন্ডে প্রায় ১৪ হাজার ফুট নীচে নেমে যায়। গুরুতর আঘাতের মধ্যেও ক্যাপ্টেন মাচ্ছর ফ্লাইট ডেকের দরজা খোলার ব্যবস্থা করেন। এর ফলে যাত্রী ও ক্রু সদস্যরা ভিতরে ঢুকে পরিস্থিতি সামলানোর সুযোগ পান।
বিমানটি পরে সৌদি আরবের তাবুকের প্রিন্স সুলতান বিন আবদুল আজিজ আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে জরুরি অবতরণ করে। বিমানে ১৭৪ জন যাত্রী এবং আটজন ক্রু সদস্য ছিলেন বলে সৌদি কর্তৃপক্ষের তথ্য উদ্ধৃত করে সংবাদমাধ্যমগুলি জানিয়েছে। তাবুকে অবতরণের পর দুই পাইলটকেই হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হয়। যাত্রীদের জন্য অন্য একটি ফ্লাইদুবাই বিমানে গন্তব্যে যাওয়ার ব্যবস্থা করা হয়। প্রকাশিত এই তথ্যের ভিত্তিতে মোট ১৮২ জন যাত্রী ও ক্রু বিমানে ছিলেন; তবে প্রধানমন্ত্রী ও আকাশবাণীর প্রতিবেদনে ঘটনাটির প্রভাবকে প্রায় ১৮০ জনের জীবন রক্ষার হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে।
মোদির কথায় সাহস ও সংযমের স্বীকৃতি
প্রধানমন্ত্রী মোদি কথোপকথনে ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের স্বাস্থ্য সম্পর্কে জানতে চান এবং তাঁর দ্রুত আরোগ্য কামনা করেন। তিনি বলেন, “আপনার সাহস, বীরত্ব এবং দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়ার ক্ষমতা এত মানুষের জীবন বাঁচিয়েছে।” প্রধানমন্ত্রী আরও জানান, ভারতীয়রা অন্যের জীবন নেওয়ার পথ বেছে নেয় না; প্রয়োজনে অন্যদের বাঁচাতে নিজেদের জীবন ঝুঁকিতে ফেলতে প্রস্তুত থাকে। এই বক্তব্যে ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের ব্যক্তিগত সাহসের পাশাপাশি ঘটনাটিকে ভারতীয় পাইলটদের পেশাগত দক্ষতা ও দায়িত্ববোধের উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরা হয়।
ভারতের প্রধানমন্ত্রী আগের দিনও ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা করেছিলেন। প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরের প্রকাশিত বিবৃতিতে বলা হয়, গুরুতর বিপদের মধ্যেও ক্যাপ্টেন অন্যদের জীবন রক্ষায় দৃঢ় সংকল্প দেখিয়েছেন। বিবৃতিতে তাঁকে দেশের গর্ব হিসেবে উল্লেখ করে দ্রুত সুস্থতার জন্য প্রার্থনা করা হয়। সংযুক্ত আরব আমিরশাহিতে ভারতের রাষ্ট্রদূত দীপক মিত্তলও ক্যাপ্টেনের স্বাস্থ্যের বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন বলে দ্য ট্রিবিউনের প্রতিবেদনে জানানো হয়েছে; তাঁর মতে, ক্যাপ্টেনের অবস্থা স্থিতিশীল এবং তিনি ধীরে ধীরে সুস্থ হচ্ছেন।
ক্যাপ্টেন মাচ্ছর প্রধানমন্ত্রীর সঙ্গে কথায় সংকটের মুহূর্তে তাঁর মানসিক অবস্থার কথাও জানান। আগের একটি ভিডিও কলে তিনি বলেছিলেন, ব্যথা ও আতঙ্কের মধ্যেও হানুমান চালিসা পাঠ করছিলেন। সেই ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা ঘটনাটির মানবিক দিক সামনে আনে। তবে উড়ানটির নিরাপত্তা-সংক্রান্ত ঘটনাক্রম, হামলার উদ্দেশ্য এবং ককপিটে নিয়ন্ত্রণ ফিরে পাওয়ার প্রতিটি ধাপ এখনও তদন্তের বিষয়। কোনও ব্যক্তিগত বর্ণনা বা সংবাদ প্রতিবেদনকে তদন্তের চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হিসেবে দেখা যাবে না।
তদন্ত ও বিমান নিরাপত্তার প্রশ্ন
সৌদি আরবের কর্তৃপক্ষ ও সংযুক্ত আরব আমিরশাহির তদন্তকারী সংস্থাগুলি ঘটনাটি খতিয়ে দেখছে। সহ-পাইলটের আচরণের কারণ, ককপিটের নিরাপত্তা ব্যবস্থা, বিমানটি এত দ্রুত নীচে নেমে যাওয়ার পরিস্থিতি এবং জরুরি অবতরণের সিদ্ধান্ত—সবকিছু তদন্তের আওতায় রয়েছে। প্রাথমিক রিপোর্টে হামলাকারী সহ-পাইলট ও ক্যাপ্টেন দুজনের আহত হওয়ার কথা বলা হয়েছে। কিন্তু হামলার পূর্ণ উদ্দেশ্য বা সম্ভাব্য পরিকল্পনা সম্পর্কে চূড়ান্ত সরকারি সিদ্ধান্ত এখনও প্রকাশিত হয়নি। তাই তদন্ত শেষ হওয়ার আগে ঘটনাটিকে কোনও নির্দিষ্ট উদ্দেশ্যের সঙ্গে নিশ্চিতভাবে যুক্ত করা ঠিক হবে না।
এই ঘটনা যাত্রীবাহী বিমানে ককপিট সুরক্ষা ও জরুরি প্রশিক্ষণের গুরুত্বও সামনে এনেছে। বিমানের দরজা, ককপিটে প্রবেশ নিয়ন্ত্রণ, ক্রুদের মধ্যে সংকট মোকাবিলার সমন্বয় এবং যাত্রীদের দ্রুত সহায়তা—সবকিছু একসঙ্গে কাজ না করলে এমন পরিস্থিতি আরও বিপজ্জনক হতে পারত। ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের সাহসিকতার প্রশংসা করা হলেও, ভবিষ্যতে এ ধরনের ঝুঁকি কমাতে তদন্তের ফল অনুযায়ী আন্তর্জাতিক বিমান চলাচল সংস্থা ও এয়ারলাইনগুলির নিরাপত্তা প্রোটোকলে পরিবর্তন আনা হবে কি না, তা গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে।
লালা ও হাইলাকান্দির পাঠকদের জন্য প্রাসঙ্গিকতা
লালা টাউন ও হাইলাকান্দির বাসিন্দাদের কাছে ঘটনাটি স্থানীয় না হলেও আন্তর্জাতিক যাত্রায় ভারতীয় নাগরিকদের নিরাপত্তা এবং বিদেশে কূটনৈতিক সহায়তার গুরুত্ব বোঝায়। বিদেশে কোনও ভারতীয় নাগরিক গুরুতরভাবে আহত হলে ভারতীয় দূতাবাস ও কনস্যুলেট পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ, চিকিৎসা-সংক্রান্ত সমন্বয় এবং স্থানীয় কর্তৃপক্ষের সঙ্গে প্রয়োজনীয় সহযোগিতা করতে পারে। ক্যাপ্টেন মাচ্ছরের ক্ষেত্রেও আবুধাবিতে চিকিৎসা চলাকালে ভারতীয় মিশন যোগাযোগ রাখছে বলে সরকারি সূত্রে জানানো হয়েছে।
আপাতত ক্যাপ্টেন স্মিত মাচ্ছর চিকিৎসাধীন এবং তদন্ত চলছে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সঙ্গে তাঁর ভিডিও কথোপকথন দেশজুড়ে সাহসিকতার স্বীকৃতি পেলেও, পরবর্তী গুরুত্বপূর্ণ তথ্য হবে চিকিৎসকদের স্বাস্থ্য-আপডেট এবং সৌদি-আমিরশাহি তদন্তের সরকারি ফল। বিমানটি নিরাপদে তাবুকে অবতরণ করে এবং যাত্রীরা বেঁচে যান—এই নিশ্চিত তথ্যের পাশাপাশি ঘটনাটি ভবিষ্যৎ বিমান নিরাপত্তা ব্যবস্থাকে আরও শক্তিশালী করার জন্য কী শিক্ষা দেয়, তা নির্ধারণ করাও এখন কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব।