নয়াদিল্লিতে বুধবার, ৭ অক্টোবর অনুষ্ঠিত বিকশিত ভারত সংকল্প সভায় প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি ২০৪৭ সালের মধ্যে ভারতকে উন্নত দেশে পরিণত করার লক্ষ্য পুনর্ব্যক্ত করেছেন। বিজেপি আয়োজিত এই সভায় দলের জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীনও বক্তব্য রাখেন। অনুষ্ঠানটি প্রধানমন্ত্রী হিসেবে নয়, বরং ৭ অক্টোবর ২০০১ থেকে শুরু হওয়া তাঁর ধারাবাহিক সরকারি নেতৃত্বের ২৫ বছর পূর্তি উপলক্ষে আয়োজিত হয়। বিকশিত ভারত সংকল্প সভায় প্রধানমন্ত্রী নীতি, পরিশ্রম ও জনসমর্থনের মাধ্যমে দেশের উন্নয়নের লক্ষ্য পূরণের কথা বলেন।
অনুষ্ঠানে মোদি বলেন, একসময় ভারতকে নীতিগত স্থবিরতা বা “policy paralysis”-এর সঙ্গে যুক্ত করে দেখা হত; এখন দেশের শক্তি, স্থিতিশীলতা ও প্রতিরোধক্ষমতা নিয়ে আলোচনা হচ্ছে। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, গত ১২ বছরে দেশের অবস্থানে বড় পরিবর্তন এসেছে। আগে ভারত নিজের প্রয়োজনের মোবাইল ফোন আমদানি করত, এখন ‘মেড ইন ইন্ডিয়া’ মোবাইল আন্তর্জাতিক বাজারে উপস্থিতি তৈরি করেছে। প্রধানমন্ত্রী এই পরিবর্তনকে নীতির ধারাবাহিকতা ও উৎপাদন বৃদ্ধির উদাহরণ হিসেবে তুলে ধরেন।
২০৪৭ সালের উন্নত ভারতের লক্ষ্য
বিকশিত ভারত সংকল্প সভায় প্রধানমন্ত্রী বলেন, ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়ার স্বপ্ন পূরণ করা সম্ভব। তাঁর মতে, এর জন্য দীর্ঘমেয়াদি পরিকল্পনা, স্পষ্ট নীতি এবং নাগরিকদের সম্মিলিত পরিশ্রম দরকার। কৃষিক্ষেত্রের উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, ২০১৫ থেকে ২০২৫—এই দশকে স্বাধীনতার পর ভারতের কৃষিতে সবচেয়ে দীর্ঘস্থায়ী উচ্চ প্রবৃদ্ধি দেখা গেছে। এই দাবি প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্য হিসেবে উপস্থাপিত; অনুষ্ঠানে এর বিস্তারিত পরিসংখ্যান বা হিসাব তিনি দেননি।
প্রধানমন্ত্রী আরও বলেন, দেশের বিভিন্ন পুরনো সমস্যার স্থায়ী সমাধানের দিকে সরকার এগিয়েছে। জম্মু ও কাশ্মীরের সংবিধানের ৩৭০ অনুচ্ছেদ এবং নকশালবাদ প্রসঙ্গ তুলে তিনি সরকারের পদক্ষেপের কথা উল্লেখ করেন। সন্ত্রাসবাদ নিয়ে মোদির বক্তব্য ছিল, ভারত এখন শুধু প্রতিরক্ষামূলক অবস্থানে নেই; প্রয়োজনে সন্ত্রাসের ঘাঁটিতেও পাল্টা আঘাত করতে সক্ষম। এই অংশে তিনি সরকারের নিরাপত্তা নীতির রাজনৈতিক ব্যাখ্যা দেন।
মোদির বক্তব্যে বড় লক্ষ্য নির্ধারণের আহ্বানও ছিল। তিনি বলেন, দেশের সামনে এখন উচ্চাকাঙ্ক্ষী লক্ষ্য স্থির করার সময়। প্রধানমন্ত্রী তাঁর রাজনৈতিক জীবনের সাফল্যের কৃতিত্ব জনগণের আস্থা ও দলের কোটি কোটি কর্মীর নিষ্ঠাকে দিয়েছেন। তিনি জানান, জনসাধারণের বিশ্বাস এবং কর্মীদের পরিশ্রমই তাঁর কাজের প্রধান শক্তি।
নরেন্দ্র মোদির ২৫ বছরের নেতৃত্ব
৭ অক্টোবর ২০০১ সালে নরেন্দ্র মোদি গুজরাটের মুখ্যমন্ত্রী হিসেবে শপথ নেন। এরপর ২০১৪ সালে তিনি ভারতের প্রধানমন্ত্রী হন এবং ২০২৬ সালের ৭ অক্টোবর পর্যন্ত কোনও বিরতি ছাড়াই সরকারের প্রধান হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। বুধবারের অনুষ্ঠান এই ২৫ বছরের ধারাবাহিক সরকারি নেতৃত্বকে কেন্দ্র করেই আয়োজিত হয়। একদিন আগে, ৬ অক্টোবর, কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভা তাঁর ২৫ বছরের নেতৃত্বের জন্য অভিনন্দন জানিয়ে একটি প্রস্তাবও গ্রহণ করে।
মন্ত্রিসভার প্রস্তাবে ৭ অক্টোবর ২০০১ থেকে ৭ অক্টোবর ২০২৬ পর্যন্ত সময়কে নরেন্দ্র মোদির অবিচ্ছিন্ন সরকারি সেবার পর্ব হিসেবে উল্লেখ করা হয়েছে। তথ্য ও সম্প্রচারমন্ত্রী অশ্বিনী বৈষ্ণব বলেছেন, এই সময়কাল ভারতীয় গণতন্ত্রের শক্তিরও প্রতিফলন। প্রস্তাবে ‘নেশন ফার্স্ট’ এবং ‘সিটিজেন ফার্স্ট’ নীতিকে তাঁর রাজনৈতিক যাত্রার পথনির্দেশক হিসেবে তুলে ধরা হয়েছে। এটি কেন্দ্রীয় মন্ত্রিসভার আনুষ্ঠানিক মূল্যায়ন; বিরোধী দলগুলির রাজনৈতিক মূল্যায়ন এতে অন্তর্ভুক্ত নয়।
মোদিও অনুষ্ঠানে তাঁর ২৫ বছরের সরকারি নেতৃত্বের কথা উল্লেখ করে জনগণের প্রতি কৃতজ্ঞতা জানান। তিনি বলেন, এই দীর্ঘ যাত্রা তাঁর একার নয়; দেশের মানুষের আশীর্বাদ, সহযোগী রাজনৈতিক দল এবং গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থাই তাঁকে এগিয়ে নিয়েছে। সকালে দিল্লির শ্রী বিনায়ক মন্দিরে গিয়ে তিনি দেশ ও ১৪০ কোটি মানুষের জন্য প্রার্থনা করেন বলেও জানান।
নীতিন নবীনের বক্তব্য
বিজেপির জাতীয় সভাপতি নীতিন নবীন প্রধানমন্ত্রীর ২৫ বছরের ধারাবাহিক সরকারি নেতৃত্বের জন্য তাঁকে অভিনন্দন জানান। তাঁর বক্তব্য অনুযায়ী, মোদি জনসেবাকে জীবনের মূল উদ্দেশ্য হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং রাজনীতিকে দেশসেবার মাধ্যম হিসেবে ব্যবহার করেছেন। তিনি দরিদ্র, যুবসমাজ, কৃষক ও মহিলাদের জন্য কেন্দ্রের বিভিন্ন প্রকল্পের কথা উল্লেখ করেন।
নীতিন নবীন বিশেষভাবে শৌচাগার নির্মাণ ও উজ্জ্বলা প্রকল্পের উল্লেখ করেন। তাঁর দাবি, এই উদ্যোগগুলি মহিলাদের নিরাপত্তা, মর্যাদা ও আত্মসম্মান বৃদ্ধিতে ভূমিকা রেখেছে। তাঁর বক্তব্য রাজনৈতিক দলের মূল্যায়ন হিসেবে দেখা উচিত; এই অনুষ্ঠানে প্রকল্পগুলির স্বাধীন মূল্যায়ন বা উপকারভোগীদের পৃথক তথ্য প্রকাশ করা হয়নি। তবে গ্রামীণ পরিবার, রান্নার জ্বালানি এবং নারীর স্বাস্থ্য ও নিরাপত্তার প্রশ্নে এই প্রকল্পগুলি দেশের জননীতির আলোচনায় গুরুত্বপূর্ণ স্থান পেয়েছে।
নীতিন নবীন আরও বলেন, গত ২৫ বছরে প্রধানমন্ত্রী দেশের ১৪০ কোটি মানুষের জীবনে উন্নয়ন, আত্মবিশ্বাস ও আত্মমর্যাদা আনার চেষ্টা করেছেন। তিনি বিশ্বজুড়ে নানা চ্যালেঞ্জের মধ্যেও দরিদ্র ও প্রান্তিক মানুষের কল্যাণকে অগ্রাধিকার দেওয়ার কথা বলেন। সভায় তাঁর বক্তব্য মূলত প্রধানমন্ত্রীর রাজনৈতিক নেতৃত্ব ও সরকারি নীতির প্রশংসাকে কেন্দ্র করে ছিল।
অসম ও লালা টাউনের প্রেক্ষাপট
বিকশিত ভারত সংকল্প সভার বক্তব্য সরাসরি অসম বা হাইলাকান্দির নির্দিষ্ট কোনও প্রকল্প নিয়ে ছিল না। তবু ২০৪৭ সালের উন্নত ভারত গড়ার লক্ষ্য নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর বক্তব্যের প্রভাব দেশের প্রতিটি রাজ্যের উন্নয়ন পরিকল্পনার সঙ্গে যুক্ত। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির পাঠকদের কাছে কৃষি, গ্রামীণ সড়ক, স্বাস্থ্য, শিক্ষা, রান্নার জ্বালানি এবং কর্মসংস্থান—এই ক্ষেত্রগুলিতে কেন্দ্রীয় ও রাজ্য প্রকল্পের বাস্তব ফল বেশি গুরুত্বপূর্ণ। জাতীয় স্তরে ঘোষিত লক্ষ্য তখনই অর্থবহ হবে, যখন তা জেলার প্রত্যন্ত এলাকার পরিবারগুলির জীবনে পরিষেবা ও আয়ের উন্নতি ঘটাবে।
বরাক উপত্যকার মতো ভৌগোলিকভাবে বৈচিত্র্যপূর্ণ অঞ্চলে উন্নয়নের ক্ষেত্রে যোগাযোগব্যবস্থা, বন্যা নিয়ন্ত্রণ, কৃষিপণ্যের বাজার, ডিজিটাল সংযোগ ও স্বাস্থ্য পরিষেবাকে অগ্রাধিকার দিতে হয়। বিকশিত ভারত সংকল্প সভায় এই এলাকার জন্য আলাদা ঘোষণা করা হয়নি। তাই লালা ও হাইলাকান্দির ক্ষেত্রে এখন নজর থাকবে কেন্দ্রীয় প্রকল্পের বরাদ্দ, অসম সরকারের বাস্তবায়ন এবং জেলা পর্যায়ে কাজের অগ্রগতির দিকে।
বিকশিত ভারত সংকল্প সভার মূল বার্তা ছিল—দীর্ঘমেয়াদি লক্ষ্য, নীতি ও জনসমর্থনের মাধ্যমে ২০৪৭ সালের মধ্যে উন্নত ভারত গড়া। নরেন্দ্র মোদির ২৫ বছরের সরকারি নেতৃত্বের রাজনৈতিক উদ্যাপন সেই বার্তাকে আরও গুরুত্ব দিয়েছে। এখন এই লক্ষ্য কতটা বাস্তবায়িত হবে, তার বিচার হবে উৎপাদন, কৃষি, কর্মসংস্থান, স্বাস্থ্য, শিক্ষা ও সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার পরিমাপযোগ্য পরিবর্তনের মাধ্যমে। বক্তৃতা ও অভিনন্দনের পরবর্তী ধাপ তাই নীতি বাস্তবায়ন এবং তার ফল মানুষের কাছে পৌঁছানো।