
কাছাড় সীমান্ত নিরাপত্তা জোরদার করে ৯ এপ্রিলের বিধানসভা ভোটের আগে জেলা প্রশাসন একটি ব্যাপক বহু-স্তরীয় নিরাপত্তা বলয় তৈরি করেছে। সিলচর থেকে জানা গেছে, জেলা কমিশনার আয়ুষ গার্গের নেতৃত্বে পরিচালিত এই নিরাপত্তা পরিকল্পনায় মণিপুরসহ প্রতিবেশী রাজ্যগুলোর সীমান্ত এলাকায় অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়েছে। প্রশাসন ৯৫টি ভোটকেন্দ্রকে “সংকটজনক” হিসেবে চিহ্নিত করে সেখানে সশস্ত্র পাহারা ও চব্বিশ ঘণ্টার নজরদারি নিশ্চিত করেছে।
১৬,০০০ কর্মী, ১,৭৩২ বুথ — কাছাড়ের নিরাপত্তার মানচিত্র
বরাক বুলেটিনের প্রতিবেদন অনুযায়ী, কাছাড় জেলায় ১,৭৩২টি পোলিং স্টেশনে মোট ১৬,০০০ কর্মী নিযুক্ত হয়েছেন। এর মধ্যে প্রায় ৯,০০০ জন পোলিং স্টাফ এবং প্রায় ৪,০০০ জন নিরাপত্তা কর্মী সহ অন্যান্য সহায়তা কর্মীরা এই বিশাল বাহিনীর অংশ। Central Armed Police Forces (CAPF) ও রাজ্য পুলিশ একযোগে সীমান্তবর্তী সংবেদনশীল এলাকাগুলোতে মোতায়েন করা হয়েছে। তুপিধর, চণ্ডিখাল এবং জাকুরাধর-সহ বরাক নদীর প্রত্যন্ত সীমান্ত এলাকায় নৌ-টহলও পরিচালিত হচ্ছে। নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় যেকোনো ধরনের বেআইনি চলাচল রুখতে সীমান্তের মূল প্রবেশ ও প্রস্থানপথে নাকা চেকিং এবং এরিয়া ডমিনেশন অভিযান জোরদার করা হয়েছে।
কাছাড়ের জেলা কমিশনার আয়ুষ গার্গ সাংবাদিকদের জানান, “আন্তঃরাজ্য সীমান্ত অঞ্চলগুলো নিরাপত্তার দৃষ্টিকোণ থেকে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। আমরা অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করেছি এবং ভোটগ্রহণের সময় কোনো অবৈধ চলাচল বা হস্তক্ষেপ যাতে না হয়, তার জন্য নজরদারি জোরদার করা হয়েছে।” কাছাড়ের পুলিশ সুপার সঞ্জীব সাইকিয়া জানান, নিরাপত্তা ব্যবস্থা “ফুলপ্রুফ” করা হয়েছে। তিনি বলেন, “নিরাপত্তা কভারেজ সার্বিক। মূল্যায়ন অনুযায়ী কড়াভাবে মোতায়েন করা হয়েছে, বিশেষত চিহ্নিত সংকটজনক পোলিং স্টেশন ও সংবেদনশীল এলাকায়। কোনো নির্দিষ্ট হুমকি নেই।” তিনি আরও জানান, মণিপুর পুলিশ সহযোগিতার আশ্বাস দিয়েছে।
৯৫টি সংবেদনশীল বুথ: কেন চিহ্নিত, কীভাবে সুরক্ষিত
কাছাড় সীমান্ত নিরাপত্তা ব্যবস্থার কেন্দ্রে রয়েছে ভেদ্যতা মানচিত্রণের ভিত্তিতে তৈরি করা একটি বিশেষ তালিকা। প্রশাসন বিস্তারিত মূল্যায়নের পর ৯৫টি পোলিং স্টেশনকে “সংকটজনক” হিসেবে চিহ্নিত করেছে। এর মধ্যে ৩৫টি বুথ ফ্ল্যাগ করা হয়েছে অস্বাভাবিকভাবে উচ্চ ভোটদানের হার — ৯০ শতাংশের বেশি — এবং একপেশে ভোটের ধরনের কারণে। বাকি ৬০টি বুথকে সংবেদনশীল বিবেচনা করা হয়েছে পুলিশ ও গোয়েন্দা তথ্যের ভিত্তিতে। পুলিশ সুপার সাইকিয়া নিশ্চিত করেছেন, এই সকল কেন্দ্রে বর্ধিত নজরদারি ও নিরাপত্তা মোতায়েন থাকবে।
কুইক রেসপন্স টিম এবং স্ট্রাইকিং ফোর্স যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে দ্রুত সাড়া দেওয়ার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। সেক্টরাল ও জোনাল অফিসাররা ঝুঁকিপূর্ণ এলাকায় কড়া তদারকি করছেন। সামগ্রিকভাবে আসামে ১.৫ লক্ষের বেশি নিরাপত্তা কর্মী মোতায়েন করা হয়েছে — ৩১,৯৪০টি পোলিং স্টেশনে ২.৫ কোটি ভোটারের নিরাপদ ভোটদান নিশ্চিত করতে। রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় এই সুরক্ষা বলয়ের অংশ হিসেবে ধুবড়ি থেকে কাছাড় পর্যন্ত একই ধরনের বহু-স্তরীয় নিরাপত্তা পরিকল্পনা কার্যকর রয়েছে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের ভোটাররাও সজাগ
বরাক উপত্যকার কাছাড় জেলার সঙ্গে পাশেই রয়েছে হাইলাকান্দি জেলা, যেখানে লালা টাউনের মতো গুরুত্বপূর্ণ শহর নির্বাচনী প্রক্রিয়ার অবিচ্ছেদ্য অংশ। ২০২৫ সালের পঞ্চায়েত নির্বাচনে হাইলাকান্দির তৎকালীন জেলা কমিশনার নিসর্গ হিভারে জানিয়েছিলেন যে জেলায় ১৭০টি সংবেদনশীল পোলিং স্টেশন চিহ্নিত হয়েছে। এই বছর বিধানসভা নির্বাচনে সেই সংখ্যা এবং প্রস্তুতি আরও বেড়েছে বলে জানা গেছে। ২০১৯ সালের লোকসভা নির্বাচনে হাইলাকান্দিতে বুথ দখলের চেষ্টার ঘটনা ঘটেছিল, যদিও নিরাপত্তা বাহিনী তা রুখে দেয় — সেই ইতিহাস মাথায় রেখেই এবার প্রশাসন আগেভাগে আরও সুচিন্তিত প্রস্তুতি নিয়েছে।
বরাক উপত্যকায় সীমান্তবর্তী এলাকার ভৌগোলিক জটিলতা নিরাপত্তা পরিকল্পনায় সবসময় বাড়তি মাথাব্যথার কারণ হয়ে আসে। মিজোরাম ও মণিপুরের সঙ্গে পার্বত্য সীমান্ত, বরাক নদীর বিস্তৃত জলপথ এবং কিছু এলাকায় দুর্বল সড়ক যোগাযোগ — সব মিলিয়ে নির্বাচনী নিরাপত্তা এই অঞ্চলে সত্যিকারের পরীক্ষা। এবার ভোটার তালিকায় কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ — তিন জেলাতেই নতুন মুখ বেড়েছে, এবং প্রত্যেক ভোটারের নিরাপদ ভোটদানের অধিকার রক্ষা করাটাই প্রশাসনের প্রধান লক্ষ্য।
শান্তিপূর্ণ ভোটের প্রত্যাশায় বরাক উপত্যকা ৯ এপ্রিল সকাল সাতটায় শুরু হওয়া ভোটগ্রহণ থেকে বিকেল পাঁচটা পর্যন্ত কাছাড়ের ১,৭৩২টি এবং হাইলাকান্দির শত শত বুথে যে গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া পরিচালিত হবে, তার নিরাপত্তার দায়িত্ব এখন সম্পূর্ণরূপে প্রস্তুত নিরাপত্তা বাহিনীর হাতে। আসামজুড়ে ১.৫ লক্ষ নিরাপত্তা কর্মী এবং কাছাড়েই ১৬,০০০ কর্মীর মোতায়েন এই বার্তাই দিচ্ছে যে প্রশাসন একটি অবাধ ও সুষ্ঠু নির্বাচন নিশ্চিত করতে বদ্ধপরিকর। লালা টাউনসহ বরাক উপত্যকার প্রতিটি ভোটার যাতে নির্ভয়ে ভোটকেন্দ্রে পৌঁছাতে পারেন এবং নিজের পছন্দের প্রার্থীকে ভোট দিতে পারেন — এই প্রত্যাশায় এখন গোটা অঞ্চল অপেক্ষায়।