Read today's news --> Click here

ডিজেল রপ্তানি শুল্ক বৃদ্ধি করে লিটারে ৫৫.৫ টাকা, দেশীয় সরবরাহ রক্ষায় কড়া পদক্ষেপ কেন্দ্রের

বৈশ্বিক জ্বালানি সংকটের মাঝে দেশীয় বাজারে ডিজেল ও বিমান জ্বালানির সরবরাহ নিরবচ্ছিন্ন রাখতে কেন্দ্রীয় সরকার ডিজেল রপ্তানি শুল্ক বৃদ্ধির বড় সিদ্ধান্ত নিয়েছে। অর্থ মন্ত্রণালয়ের ঘোষণা অনুযায়ী, ডিজেলের রপ্তানি শুল্ক লিটারপ্রতি ২১.৫ টাকা থেকে একলাফে বাড়িয়ে ৫৫.৫ টাকা করা হয়েছে। একইসঙ্গে Aviation Turbine Fuel বা ATF-এর রপ্তানি শুল্কও ২৯.৫ টাকা থেকে বাড়িয়ে লিটারপ্রতি ৪২ টাকা নির্ধারণ করা হয়েছে। উল্লেখ্য, পেট্রলের রপ্তানি শুল্ক আগের মতোই শূন্যে রাখা হয়েছে। মধ্যপ্রাচ্যে চলমান সংঘাতের কারণে বৈশ্বিক সরবরাহ শৃঙ্খলে যে চাপ সৃষ্টি হয়েছে, তার মোকাবিলায় এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে বলে সরকারি সূত্র জানিয়েছে।

রপ্তানি শুল্ক বৃদ্ধির পটভূমি

২০২৬ সালের মার্চ মাসে ভারত সরকার প্রথম দফায় ডিজেলের ওপর লিটারপ্রতি ২১.৫ টাকা এবং ATF-এর ওপর ২৯.৫ টাকা রপ্তানি শুল্ক আরোপ করেছিল। ওই সময় অর্থমন্ত্রী নির্মলা সীতারামন জানিয়েছিলেন, এই পদক্ষেপের মূল লক্ষ্য হলো দেশীয় বাজারে ডিজেল ও বিমান জ্বালানির পর্যাপ্ত সরবরাহ নিশ্চিত করা। তিনি বলেছিলেন, “এই পদক্ষেপ দেশীয় বাজারে ডিজেল ও ATF-এর পর্যাপ্ত প্রাপ্যতা নিশ্চিত করবে। সংসদকেও এ বিষয়ে অবহিত করা হয়েছে।” মার্চের সেই শুল্ক হার এপ্রিলে আরও বড় আকারে বাড়ানো হলো — ডিজেলের ক্ষেত্রে প্রায় আড়াই গুণেরও বেশি বৃদ্ধি পেল।

এই সিদ্ধান্তের পেছনে রয়েছে মধ্যপ্রাচ্যের ইরান-ইসরায়েল সংঘাত, যা আন্তর্জাতিক জ্বালানি সরবরাহে মারাত্মক ব্যাঘাত সৃষ্টি করেছে। যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েল যৌথভাবে ইরানে হামলা চালানোর পর হরমুজ প্রণালি কার্যত বন্ধ হয়ে যায় — এই প্রণালি দিয়ে ভারতের প্রায় ৪০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল আমদানি হয়। এই পরিস্থিতিতে দেশের বেসরকারি রিফাইনারিগুলো পরিশোধিত তেল আন্তর্জাতিক বাজারে রপ্তানি করে বেশি মুনাফা করছিল, যা দেশীয় সরবরাহে চাপ ফেলছিল। সেই পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতেই রপ্তানি শুল্ক বৃদ্ধির এই পথ বেছে নিয়েছে কেন্দ্র।

ATF শুল্ক দেশীয় বাজারে প্রভাব

ডিজেল রপ্তানি শুল্ক বৃদ্ধির পাশাপাশি ATF-এর রপ্তানি শুল্ক ২৯.৫ টাকা থেকে ৪২ টাকায় উন্নীত করা এভিয়েশন সেক্টরের জন্যও গুরুত্বপূর্ণ। দেশীয় ব্যবহারের জন্য ATF অতিরিক্ত শুল্কমুক্ত রাখা হয়েছে, অর্থাৎ রপ্তানিকৃত ATF-কেই কেবল এই উচ্চ শুল্ক দিতে হবে। এর ফলে দেশীয় বিমান সংস্থাগুলো আপাতত সরাসরি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা থেকে রক্ষা পাবে। তবে দীর্ঘমেয়াদে বৈশ্বিক তেলের দাম উঁচুতে থাকলে এভিয়েশন খাতেও তার প্রভাব পড়তে পারে বলে বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

মার্চ মাসে রপ্তানি শুল্ক আরোপের পাশাপাশি সরকার পেট্রল ও ডিজেলের দেশীয় আবগারি শুল্কও হ্রাস করেছিল — পেট্রলে লিটারপ্রতি ১৩ টাকা থেকে কমিয়ে ৩ টাকা এবং ডিজেলকে আবগারি শুল্কমুক্ত করা হয়েছিল। এই দ্বৈত নীতির — অর্থাৎ রপ্তানিতে উচ্চ শুল্ক ও দেশীয় ব্যবহারে শুল্ক ছাড় — মূল লক্ষ্য হলো দেশের সাধারণ মানুষকে জ্বালানি মূল্যবৃদ্ধির ধাক্কা থেকে রক্ষা করা। রেটিং সংস্থা ICRA আগেই হুঁশিয়ারি দিয়েছিল যে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১০০-১০৫ ডলার থাকলে তেল বিপণন সংস্থাগুলো পেট্রলে লিটারপ্রতি ১১ টাকা এবং ডিজেলে ১৪ টাকা পর্যন্ত লোকসান দিতে পারে।

আসাম বরাক উপত্যকায় সম্ভাব্য প্রভাব

ভারতের এই ডিজেল রপ্তানি শুল্ক বৃদ্ধির সিদ্ধান্তের সরাসরি প্রভাব আসামের মতো স্থলবেষ্টিত রাজ্যগুলোর পরিবহন ও কৃষি খাতে পড়তে পারে। হাইলাকান্দি জেলা ও বরাক উপত্যকার অর্থনীতি মূলত চা বাগান, কৃষি, পরিবহন ও ক্ষুদ্র ব্যবসার ওপর নির্ভরশীল — এই সবকটি সেক্টরেই ডিজেল একটি অপরিহার্য জ্বালানি। লালা টাউন ও পার্শ্ববর্তী এলাকায় পণ্য পরিবহনের ট্রাক থেকে শুরু করে কৃষি যন্ত্রপাতি পর্যন্ত সবকিছুই ডিজেলচালিত।

তবে ইতিবাচক দিক হলো, সরকার দেশীয় ডিজেলের আবগারি শুল্ক শূন্যে নামিয়ে এনেছে, যার ফলে পাম্পে পেট্রল ও ডিজেলের দাম বৃদ্ধি এড়ানো সম্ভব হয়েছে। অর্থাৎ লালা বাজারের সাধারণ ব্যবসায়ী, চাষি ও যানবাহন চালকরা আপাতত পাম্পে বাড়তি দামের চাপে পড়বেন না। তবে বৈশ্বিক তেলের বাজার আরও অস্থির হলে ভবিষ্যতে পরিস্থিতি পাল্টাতে পারে — সেদিকে সজাগ দৃষ্টি রাখা জরুরি।

ভবিষ্যতের পরিকল্পনা পর্যালোচনা

সরকার জানিয়েছে যে রপ্তানি শুল্কের হার প্রতি পক্ষকালে অর্থাৎ দুই সপ্তাহে একবার পর্যালোচনা করা হবে এবং আন্তর্জাতিক বাজারের পরিস্থিতি অনুযায়ী প্রয়োজনে সংশোধন করা হতে পারে। উল্লেখ্য, ভারত ২০২২ সালেও অনুরূপ windfall tax ব্যবস্থা চালু করেছিল এবং ২০২৪ সালে তা তুলে নেওয়া হয়েছিল। বর্তমান পরিস্থিতিতে সেই নীতিতে ফেরা স্পষ্টতই একটি সুচিন্তিত পদক্ষেপ। তবে রিলায়েন্স ইন্ডাস্ট্রিজের SEZ রিফাইনারি এই শুল্কের আওতামুক্ত থাকবে কিনা, তা নিয়ে এখনো আলোচনা চলছে। সামগ্রিকভাবে কেন্দ্রীয় সরকারের এই সিদ্ধান্ত দেশীয় জ্বালানি সুরক্ষার ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। মধ্যপ্রাচ্যের অনিশ্চয়তা কতদিন থাকবে তার উপর নির্ভর করছে এই শুল্কনীতি কতটা দীর্ঘস্থায়ী হবে। আন্তর্জাতিক কূটনৈতিক পরিস্থিতির উন্নতি ঘটলে শুল্ক হার আবার কমতে পারে — তবে ততদিন পর্যন্ত দেশীয় বাজারকে সুরক্ষিত রাখাই সরকারের মূল অগ্রাধিকার থাকবে।

ডিজেল রপ্তানি শুল্ক বৃদ্ধি করে লিটারে ৫৫.৫ টাকা, দেশীয় সরবরাহ রক্ষায় কড়া পদক্ষেপ কেন্দ্রের
Scroll to top