আইজলের প্রাণকেন্দ্রে অবস্থিত লামুয়াল এলাকায় শতাধিক বছর পুরনো গাছ কেটে সড়ক প্রশস্ত করার পরিকল্পনার বিরুদ্ধে আদালত কড়া হস্তক্ষেপ করেছে। গৌহাটি হাইকোর্টের আইজল বেঞ্চ ২০ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মিজোরাম সরকারকে অবিলম্বে ওই জমিতে আর কোনো গাছ না কাটার নির্দেশ দিয়েছে। আসাম রাইফেলস সম্প্রতি লামুয়াল এলাকার ওই জমি ছেড়ে দেওয়ার পর রাজ্য সরকার সেখানে পরিকাঠামো উন্নয়নের পরিকল্পনা করে, কিন্তু গৌহাটি হাইকোর্টের আইজল বেঞ্চ থেকে দেওয়া এই অন্তর্বর্তী আদেশ সেই পরিকল্পনায় বড় ধাক্কা দিয়েছে।
কী কারণে আদালতে মামলা, কারা করলেন PIL
পরিবেশকর্মী শিয়াজাম্পুই শাইলো (Siazampuii Sailo) মিজোরামের “সেন্টার ফর এনভায়রনমেন্ট অ্যান্ড সোশ্যাল জাস্টিস (CESJ)”-এর পক্ষ থেকে এই জনস্বার্থ মামলা (PIL) দায়ের করেন। PIL-এ উল্লেখ করা হয় যে লামুয়াল এলাকায় চিহ্নিত ৪০০-এরও বেশি গাছের মধ্যে ১৭৪টি গাছ সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের জন্য কেটে ফেলার পরিকল্পনা করা হয়েছে। বাজার বাংকাউন থেকে ট্রেজারি স্কোয়ার পর্যন্ত মূল সড়কটি ১৪ মিটার চওড়া করার প্রস্তাব রয়েছে, যার জন্য আসাম রাইফেলসের প্রাক্তন ক্যাম্পাসের ভিতরে থাকা গাছগুলো কাটার প্রয়োজন হবে।
CESJ ও নাগরিক সমাজ সংগঠনগুলোর প্রতিবাদের মুখে রাজ্য সরকার আগেই সাময়িকভাবে গাছ কাটা স্থগিত রেখেছিল। কিন্তু পরিবেশ আন্দোলনকারীরা দাবি করেন যে স্থগিতাদেশের আগেই ১০০-এরও বেশি গাছ ইতিমধ্যে কেটে ফেলা হয়ে গেছে। এই পরিস্থিতিতে বিচারিক হস্তক্ষেপের দাবিতে PIL দায়ের করা হয় এবং আদালত দ্রুত ব্যবস্থা নেয়।
আদালতের পর্যবেক্ষণ: শুধু গাছ নয়, হেরিটেজও সংকটে
গৌহাটি হাইকোর্টের আইজল বেঞ্চে বিচারপতি মাইকেল জোথানকুমা ও বিচারপতি কৌশিক গোস্বামীর ডিভিশন বেঞ্চ PIL শুনে গুরুত্বপূর্ণ পর্যবেক্ষণ রাখেন। আদালত লক্ষ্য করেন যে লামুয়াল এলাকার ওই জমিতে যে গাছগুলো কাটার পরিকল্পনা হচ্ছে, সেগুলোর অনেকটাই ১০০ বছরেরও বেশি পুরনো। শুধু তাই নয়, ওই জমিতে ১৮৯৭ সালে নির্মিত ব্যারাক ভবন রয়েছে, যা ইতিমধ্যে হেরিটেজ মর্যাদায় ভূষিত হয়েছে।
আদালত রাজ্য সরকারকে প্রশ্ন করেন, শহরের কেন্দ্রে থাকা এই শতবর্ষী গাছগুলো কাটার যৌক্তিকতা ঠিক কী। মিজোরামের অতিরিক্ত অ্যাডভোকেট জেনারেল পি. ভট্টাচার্য আদালতে রাজ্যের পক্ষে উপস্থিত হন এবং জানান যে সরকার বিষয়টি গুরুত্বের সঙ্গে বিবেচনা করে নির্দেশনা নেবে। আবেদনকারীর পক্ষে সিনিয়র আইনজীবী টি. জে. মহান্ত আদালতকে বলেন যে যথাযথ কারণ ছাড়া একটিও গাছ কাটা উচিত নয় এবং অবিলম্বে অন্তর্বর্তী সুরক্ষা দরকার। শেষমেশ আদালত “পরবর্তী নির্দেশ না দেওয়া পর্যন্ত” আর কোনো গাছ না কাটার আদেশ দেন। পরবর্তী শুনানি ১৮ মে নির্ধারিত হয়েছে।
উন্নয়ন বনাম পরিবেশ: মিজোরাম সরকারের পরিকল্পনা কী ছিল
মিজোরামের নগর উন্নয়ন ও দারিদ্র্যবিমোচন মন্ত্রী কে. শাপদাঙ্গা আগেই ঘোষণা করেছিলেন যে আসাম রাইফেলসের ছেড়ে দেওয়া জমিতে পরিকাঠামো উন্নয়নের কাজ শুরু হবে। সরকারের পরিকল্পনা ছিল জমির একটি অংশ সাধারণ মানুষের জন্য পাবলিক স্পেস হিসেবে গড়ে তোলা এবং কোয়ার্টার গার্ড ও লক হাউসের মতো হেরিটেজ ভবনগুলো সংরক্ষণ করা। হেরিটেজ মর্যাদাহীন অন্যান্য পুরনো ভবনগুলো ভেঙে ফেলার পরিকল্পনাও ছিল পুনর্নির্মাণের অংশ হিসেবে।
কিন্তু পরিবেশ সংগঠনগুলোর প্রশ্ন হল — সড়ক প্রশস্তকরণ কি সত্যিই আইজলের যানজট সমস্যার সমাধান করতে পারবে? নাকি শতবর্ষী গাছ কেটে ও পরিবেশ ধ্বংস করে যে উন্নয়ন হবে, তার ক্ষতি সুদূরপ্রসারী? CESJ দাবি করেছে, এই গাছগুলো কার্বন শোষণ, নগর জীববৈচিত্র্য ও মাটির ক্ষয় রোধে অপরিহার্য ভূমিকা রাখছে। এই যুক্তির প্রেক্ষিতে আদালতের হস্তক্ষেপকে পরিবেশবাদীরা বড় জয় হিসেবে দেখছেন।
উত্তর-পূর্ব ভারতে পরিবেশ ও পরিকাঠামোর টানাপোড়েন: আসাম ও হাইলাকান্দির প্রাসঙ্গিকতা
আইজলের এই ঘটনা উত্তর-পূর্ব ভারতের একটি বৃহত্তর সমস্যাকে সামনে এনেছে — দ্রুত নগরায়ণ ও পরিকাঠামো উন্নয়নের নামে পরিবেশের উপর ক্রমবর্ধমান চাপ। এই সমস্যাটি আসামের ক্ষেত্রেও সমানভাবে প্রাসঙ্গিক। হাইলাকান্দি জেলায়, বিশেষত লালা টাউন ও তার আশপাশের এলাকায়, সড়ক উন্নয়ন ও নির্মাণকাজের নামে বন ও গাছপালা কাটার বিষয়টি দীর্ঘদিনের উদ্বেগের কারণ।
বরাক উপত্যকায় বন্যার ক্রমবর্ধমান প্রবণতার একটি কারণ হিসেবে বিশেষজ্ঞরা অপরিকল্পিত গাছ কাটা ও বনভূমি হ্রাসকে চিহ্নিত করেছেন। আইজলে গৌহাটি হাইকোর্টের গাছ কাটা নিষেধ করার এই নজির এই অঞ্চলের পরিবেশ আন্দোলনকারীদের কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা পাঠায় — আদালতের দ্বারস্থ হলে পরিবেশ সুরক্ষায় আইনি পথে ফল পাওয়া সম্ভব।
পরবর্তী শুনানি ১৮ মে: কী সিদ্ধান্ত আসতে পারে
গৌহাটি হাইকোর্টের আইজল বেঞ্চ ১৮ মে পরবর্তী শুনানির দিন নির্ধারণ করেছে। ততদিন পর্যন্ত লামুয়াল এলাকায় গাছ কাটা সম্পূর্ণ বন্ধ থাকবে। আদালত মিজোরাম সরকারকে শতবর্ষী গাছ অপসারণের যৌক্তিকতা ব্যাখ্যা করে হলফনামা দাখিল করতে বলেছে। পরবর্তী শুনানিতে আদালত যদি অন্তর্বর্তী নিষেধাজ্ঞা বহাল রাখেন বা স্থায়ী আদেশ দেন, তাহলে মিজোরামের ওই বহুল আলোচিত সড়ক প্রশস্তকরণ প্রকল্পের ভবিষ্যৎ অনিশ্চিত হয়ে পড়বে।
এই মামলা উত্তর-পূর্ব ভারতে নগর পরিবেশ আইনের একটি গুরুত্বপূর্ণ নজির হয়ে উঠতে পারে। উন্নয়ন ও পরিবেশ সংরক্ষণের মধ্যে ভারসাম্য রক্ষার এই লড়াইয়ে আদালতের চূড়ান্ত রায় কী হবে, তা কেবল মিজোরাম নয়, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারতের পরিবেশপ্রেমী মানুষেরা উৎসুক দৃষ্টিতে অনুসরণ করছেন।