হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার ও বিকল্প সড়ক প্রকল্পের অগ্রগতি পর্যালোচনা করলেন অসমের মন্ত্রী। শনিবার ডিমা হাসাও জেলায় এই উচ্চপর্যায়ের বৈঠকে সড়ক যোগাযোগ পুনরুদ্ধার, দুর্যোগে ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামত এবং বিকল্প রুট দ্রুত চালুর বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা হয়। ২০২২ সালের ভূমিধস ও বন্যার পর ভেঙে পড়া যোগাযোগব্যবস্থা ফিরিয়ে আনা এবং ভবিষ্যতে এমন বিপর্যয়ে বরাক উপত্যকার সঙ্গে সংযোগ যাতে পুরোপুরি ছিন্ন না হয়, সেই লক্ষ্যেই এই পর্যালোচনা বৈঠককে গুরুত্বপূর্ণ ধরা হচ্ছে।
হাফলং–লামডিং সড়ক সংস্কার কেন জরুরি
ডিমা হাসাওয়ের ভূপ্রকৃতি এমনিতেই দুর্গম। পাহাড়ি ঢাল, ঘন বৃষ্টিপাত আর ভূমিধসপ্রবণ মাটি এই অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগকে প্রতি বর্ষায় ঝুঁকির মুখে ফেলে। হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার তাই শুধু একটি অবকাঠামোগত কাজ নয়, বরং পাহাড়ি জেলার জীবনরেখা পুনর্গঠনের প্রশ্ন। ২০২২ সালে ব্যাপক ভূমিধস ও বন্যার পর এই রুটের একাধিক অংশ ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছিল, ফলে রেল ও সড়কপথে যাতায়াতে বড়সড় বিঘ্ন ঘটে। তখনই বোঝা যায়, বিকল্প সংযোগ না থাকলে ডিমা হাসাও কার্যত বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়তে পারে।
এ কারণে বর্তমান পর্যালোচনা শুধু বর্তমান কাজের অগ্রগতি দেখা নয়, বরং দীর্ঘমেয়াদি প্রস্তুতির প্রশ্নও সামনে এনেছে। প্রশাসনের দৃষ্টিতে মূল চ্যালেঞ্জ হলো—ক্ষতিগ্রস্ত অংশ মেরামতের পাশাপাশি এমন একটি বিকল্প পথ তৈরি করা, যা জরুরি অবস্থায় বিকল্প লাইফলাইন হিসেবে কাজ করতে পারে। পাহাড়ি জেলায় এমন প্রকল্প বাস্তবায়ন সহজ নয়; ভূমির স্থায়িত্ব, কাটিং, রিটেইনিং ওয়াল, জলনিষ্কাশন এবং সুরক্ষা ব্যবস্থার সঙ্গে বারবার কাজ করতে হয়। তাই এই ধরনের প্রকল্পে গতি যেমন জরুরি, তেমনি গুণগত মানও সমান গুরুত্বপূর্ণ।
বিকল্প সড়ক প্রকল্পে অগ্রাধিকার
বৈঠকে বিকল্প সড়ক প্রকল্পকে অগ্রাধিকার দেওয়ার বিষয়টি জোর পায়। দুর্গম পাহাড়ি পথে একটি নতুন রুট শুধু যান চলাচলের সুবিধা দেয় না, বরং জরুরি পরিষেবা, খাদ্য সরবরাহ, ওষুধ পরিবহন এবং পণ্যবাজারের ধারাবাহিকতাও নিশ্চিত করতে পারে। হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার যদি নির্ধারিত সময়ে এগোয়, তাহলে বর্ষার সময় জাতীয় সড়ক নেটওয়ার্কের উপর চাপ কমবে এবং পার্বত্য অঞ্চলের অর্থনৈতিক কার্যক্রমও কিছুটা স্থিতিশীল থাকবে।
একই সঙ্গে আলোচনায় এসেছে এমন বিকল্প পথ তৈরির প্রয়োজন, যা ভূমিধসের ঝুঁকি তুলনামূলক কম এমন এলাকা দিয়ে যাবে। কারণ, কেবল পুরনো রুট প্যাঁচ দেওয়া হলে সমস্যা বারবার ফিরে আসে। প্রকল্প পরিকল্পনায় তাই ভূতাত্ত্বিক মূল্যায়ন, জলধারা নিয়ন্ত্রণ এবং সড়কপারের ঢাল শক্ত করার দিকগুলোতে নজর দেওয়া দরকার। এই বাস্তবতা শুধু ডিমা হাসাও নয়, সমগ্র উত্তর-পূর্বের পাহাড়ি সড়ক উন্নয়ন পরিকল্পনার ক্ষেত্রেও প্রাসঙ্গিক।
বরাক উপত্যকার জন্য সরাসরি প্রভাব
হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার ও বিকল্প রুটের সবচেয়ে বড় প্রভাব পড়ে বরাক উপত্যকায়। ডিমা হাসাওয়ের মধ্য দিয়ে আসা সড়ক ও রেলপথ বন্ধ হয়ে গেলে হাইলাকান্দি, কাছাড়, করিমগঞ্জ—এই তিন জেলাতেই পণ্য সরবরাহ, যাত্রী চলাচল এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় দ্রব্যের দাম পর্যন্ত প্রভাবিত হয়। লালা টাউনের মানুষের জন্যও এই সংযোগ কাগজে আঁকা কোনও দূরের পথ নয়; বরং বাজার, হাসপাতাল, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ও জরুরি পরিষেবার বাস্তব সংযোগ।
বর্ষার সময় একটি ভূমিধস পুরো অঞ্চলের সরবরাহ শৃঙ্খল নাড়িয়ে দিতে পারে। ফল, সবজি, জ্বালানি, নির্মাণসামগ্রী কিংবা চিকিৎসা-সরঞ্জাম—সবকিছুরই পরিবহন ব্যাহত হয়। তাই হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার দ্রুত না হলে তার অভিঘাত পাহাড়ের গা ছুঁয়ে সমতলেও এসে পড়ে। স্থানীয় ব্যবসায়ী, পরিবহনকর্মী ও সাধারণ যাত্রীরাই এর সবচেয়ে বড় ভুক্তভোগী। এ কারণে এই প্রকল্পকে ডিমা হাসাওয়ের পাশাপাশি বরাক উপত্যকার অর্থনৈতিক নিরাপত্তার সঙ্গেও যুক্ত করে দেখা উচিত।
প্রশাসনিক নজরদারি ও ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা
এই পর্যালোচনা বৈঠক থেকে স্পষ্ট যে প্রশাসন এখন শুধুমাত্র ক্ষতির পর মেরামত নয়, আগাম প্রতিরোধে বেশি গুরুত্ব দিতে চাইছে। সড়ক সংস্কারের অগ্রগতি, বিকল্প রুটের নকশা, এবং দুর্যোগকালীন যোগাযোগ পরিকল্পনা—সবকিছু একসঙ্গে ভেবে এগোনোর দরকার রয়েছে। পাহাড়ি অঞ্চলে প্রকল্প শুরু করাই বড় কাজ নয়; বরং মাটির চরিত্র, বর্ষার চাপ এবং স্থানীয় ব্যবহারের সঙ্গে মানিয়ে সেটিকে টেকসই করে তোলা আসল সাফল্য।
ডিমা হাসাওয়ের মতো জেলায় এই ধরনের কাজের ফলে সরকারের দুর্যোগ-প্রস্তুতি নীতিও পরীক্ষা হয়ে যায়। কারণ, কোনো সড়ক যদি ভূমিধসে ভেঙে যায়, তাহলে বিকল্প রুট কত দ্রুত চালু করা যায়, সেটাই বাস্তব সক্ষমতার মাপকাঠি। এই দিক থেকে হাফলং-লামডিং সড়ক সংস্কার এবং বিকল্প সড়ক প্রকল্প একসঙ্গে এগোলে তা ভবিষ্যতের জন্য বড় পরিবর্তন আনতে পারে।
পাহাড়ি অঞ্চলের সড়ক যোগাযোগ কেবল যাতায়াতের বিষয় নয়; এটি স্বাস্থ্য, শিক্ষা, বাণিজ্য এবং দুর্যোগ মোকাবিলার প্রশ্নও বটে। তাই এই প্রকল্পের অগ্রগতি কতটা দ্রুত, কতটা নিরাপদ এবং কতটা টেকসই হয়, সেদিকেই এখন নজর থাকবে। ডিমা হাসাওয়ের এই সড়ক যদি সত্যিই নতুন ভরসা হয়ে ওঠে, তবে তার প্রভাব হাফলং থেকে হাইলাকান্দি পর্যন্ত ছড়িয়ে পড়বে।