পশ্চিমবঙ্গ বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার এখন তুঙ্গে — এই পরিস্থিতিতে আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা সরাসরি দাবি করেছেন, মমতা ব্যানার্জি BJP উত্থান ভয় পাচ্ছেন এবং সেই ভয় থেকেই তিনি মিথ্যা প্রচারের আশ্রয় নিচ্ছেন। ১৬ এপ্রিল কোচবিহার দক্ষিণ বিধানসভা কেন্দ্রে BJP প্রার্থী রতীন্দ্র বসুর সমর্থনে আয়োজিত একটি বড় জনসভায় শর্মা এই মন্তব্য করেন। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা ব্যানার্জি সেদিন একটি প্রচার সভায় দাবি করেছিলেন, BJP ক্ষমতায় এলে মাছ ও মাংস খাওয়ায় বিধিনিষেধ আসতে পারে। শর্মা এই দাবিকে সরাসরি নাকচ করে দেন এবং তার পাল্টায় কড়া সমালোচনা করেন।
মাছ-মাংস নিষেধের দাবিকে ‘মিথ্যা প্রচার’ বললেন হিমন্ত
মমতা ব্যানার্জি BJP উত্থান ভয় পাচ্ছেন — এই দাবির পাশাপাশি হিমন্ত শর্মা আসামের উদাহরণ দিয়ে বোঝানোর চেষ্টা করেন যে BJP-শাসিত রাজ্যে খাদ্যাভ্যাসে কোনো বিধিনিষেধ নেই। তিনি বলেন, আসামে মাছ-মাংস খাওয়া সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে এবং কামাখ্যা মন্দিরে পশুবলিও নিষিদ্ধ করা হয়নি। শর্মার প্রশ্ন ছিল: “মমতা দিদি কেন শুধু গোমাংসের কথা বলছেন? কেন মটন বা মাছের কথা বলছেন না? কারণ তিনি জানেন BJP এলে গোমাংসের অবৈধ বাণিজ্য ও গবাদি পশু পাচার বন্ধ হয়ে যাবে।”
তিনি আরও বলেন, আসামের ধুবড়িতে একটি ঘটনায় হিন্দুদের বাড়ির সামনে গোমাংস ছুঁড়ে ফেলার প্রবণতা BJP সরকারের আমলে পুলিশের কঠোর পদক্ষেপে বন্ধ করা হয়েছিল। মুর্শিদাবাদে সাম্প্রতিক অস্থিরতার প্রসঙ্গ তুলেও শর্মা মমতা ব্যানার্জির সরকারের বিরুদ্ধে ব্যর্থতার অভিযোগ আনেন। তাঁর মতে, TMC সরকার নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পারেনি এবং ভোটারদের মিথ্যা আতঙ্কে বিভ্রান্ত করাটাই এখন TMC-র একমাত্র কৌশল।
হিমন্তের BJP প্রচার কৌশল এবং বাংলার মাঠের বাস্তবতা
মমতা ব্যানার্জি BJP উত্থান ভয় পাচ্ছেন — এই দাবিটি হিমন্ত শর্মা শুধু বক্তৃতার কথা হিসেবে বলেননি, বরং এটি BJP-র বৃহত্তর নির্বাচনী কৌশলের অংশ। ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে BJP ৭৭টি আসন জিতেছিল, যা ছিল দলটির পশ্চিমবঙ্গে ইতিহাসের সেরা ফলাফল। সেই ভিত্তির উপর দাঁড়িয়ে ২০২৬-এ আরও ভালো ফলের প্রত্যাশায় BJP শীর্ষ নেতাদের ব্যাপকভাবে প্রচারে নামিয়েছে।
হিমন্ত শর্মা পশ্চিমবঙ্গে BJP-র অন্যতম প্রধান প্রচারক হিসেবে কাজ করছেন। কোচবিহার ছাড়াও তিনি কালিম্পং ও অন্যান্য জেলায় একাধিক জনসভায় বক্তব্য রাখেন। তাঁর বক্তব্যের মূল সুর — TMC সরকারের আমলে দুর্নীতি, সন্ত্রাস ও তোষণমূলক রাজনীতি চলেছে, এবং BJP এলে একটি সুষম ও সুশাসিত পশ্চিমবঙ্গ গড়া সম্ভব হবে। অন্যদিকে মমতা ব্যানার্জি এপ্রিল মাসের মুর্শিদাবাদের সুতিতে জনসভা থেকে স্পষ্ট ভাষায় বলেছেন, “গন্ডগোল আমি সমর্থন করি না” — এবং BJP-র বিরুদ্ধে পাল্টা আক্রমণ জারি রেখেছেন।
বরাক উপত্যকা ও আসামের দৃষ্টিকোণ: স্থানীয় প্রাসঙ্গিকতা
আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার পশ্চিমবঙ্গ প্রচার সফর বরাক উপত্যকার মানুষের কাছেও প্রাসঙ্গিক। হাইলাকান্দি জেলাসহ বরাক উপত্যকায় বাঙালি হিন্দু ও মুসলমান উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ বাস করেন, এবং পশ্চিমবঙ্গের রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতির প্রতি তাঁদের স্বাভাবিক আগ্রহ রয়েছে। লালা টাউন ও হাইলাকান্দির বহু পরিবারের পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে পারিবারিক ও সাংস্কৃতিক যোগাযোগ রয়েছে — ফলে বাংলার ভোটের ফলাফল এখানকার মানুষের কাছে নিছক বাইরের খবর নয়।
বরাক উপত্যকায় BJP সমর্থকরা শর্মার এই প্রচার সফরকে দলের ক্রমবর্ধমান শক্তির প্রমাণ হিসেবে দেখছেন। অন্যদিকে TMC ও বিরোধী শিবিরের সমর্থকরা তাঁর বক্তব্যকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে সমালোচনা করছেন। আসামের নেতৃত্বের পশ্চিমবঙ্গে এই সক্রিয় ভূমিকা প্রশ্ন তুলছে — উত্তরপূর্ব ভারতের রাজনীতিতে দুই বাংলার সম্পর্ক ভবিষ্যতে কোন দিকে যাবে।
পশ্চিমবঙ্গের ভোট ২১ এপ্রিল ও ২৯ এপ্রিল দুটি দফায় অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা এবং ফলাফল আসবে ৪ মে। মমতা ব্যানার্জি সত্যিই BJP উত্থান ভয় পাচ্ছেন কিনা — সেই প্রশ্নের উত্তর দেবে ব্যালট বাক্স। হিমন্ত শর্মার আক্রমণাত্মক প্রচার কৌশল পশ্চিমবঙ্গের ভোটারদের কতটা প্রভাবিত করবে এবং BJP কোচবিহার-সহ সীমান্ত জেলাগুলোতে কতটা ভালো করবে — সেটি ৪ মে-র ফলাফলেই স্পষ্ট হয়ে যাবে। তবে নির্বাচনী বিতর্কের যে তীব্রতা এই মুহূর্তে দেখা যাচ্ছে, তাতে পরিষ্কার — এই ভোট কোনো পক্ষের জন্যই সহজ হবে না।