হরমুজ প্রণালী বন্ধ ঘোষণা করেছে ইরান — মাত্র একদিন আগে খুলে দেওয়ার পরেই ১৮ এপ্রিল শনিবার এই জলপথ আবার বন্ধ করা হয়েছে। ইরানের সম্মিলিত সামরিক কমান্ড জানিয়েছে, হরমুজ প্রণালীর নিয়ন্ত্রণ পূর্বাবস্থায় ফিরে এসেছে এবং সশস্ত্র বাহিনীর কঠোর ব্যবস্থাপনায় এই প্রণালী পরিচালিত হবে। মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র ইরানের সমুদ্র বন্দরগুলোতে নৌ-অবরোধ অব্যাহত রাখার সিদ্ধান্ত নেওয়ার প্রতিক্রিয়াতেই ইরান এই পদক্ষেপ নিয়েছে বলে জানা গেছে। এই সিদ্ধান্ত বিশ্বের মোট সমুদ্রপথে পরিবাহিত তেলের প্রায় ২০ শতাংশের গতিপথ নিয়ন্ত্রণকারী এই প্রণালীকে ঘিরে নতুন করে উত্তেজনা তৈরি করেছে।
হরমুজ প্রণালী বন্ধের নেপথ্যে: মার্কিন-ইরান সংঘাতের পটভূমি
হরমুজ প্রণালী বন্ধ নিয়ে এই সংকট একদিনের ঘটনা নয় — এর শিকড় বহু মাস আগে। ২০২৬ সালের মার্চ মাস থেকে যুক্তরাষ্ট্র ও ইসরায়েলের সামরিক অভিযানের পরিপ্রেক্ষিতে ইরান হরমুজ প্রণালীতে জাহাজ চলাচলে বিধিনিষেধ আরোপ করে। আন্তর্জাতিক শক্তি সংস্থা (IEA) এই সংকটকে বৈশ্বিক তেল বাজারের ইতিহাসে সবচেয়ে বড় সরবরাহ বাধা হিসেবে চিহ্নিত করেছে। ১২ এপ্রিল মার্কিন-ইরান আলোচনা ব্যর্থ হওয়ার পর মার্কিন প্রেসিডেন্ট ডোনাল্ড ট্রাম্প ঘোষণা দেন যে মার্কিন নৌবাহিনী ইরানের বন্দরে প্রবেশ বা ইরানের বন্দর থেকে বের হওয়া সকল জাহাজ আটকে দেবে।
সাময়িকভাবে একটি যুদ্ধবিরতির ফলে ১৭ এপ্রিল প্রণালীটি খুলে দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু ট্রাম্প স্পষ্ট করে দেন, মার্কিন নৌ-অবরোধ বজায় থাকবে। এর প্রতিক্রিয়ায় ইরান মাত্র একদিনের মাথায় আবার হরমুজ বন্ধ করে দেয়। ইরানের ইসলামিক রেভোলিউশনারি গার্ড কর্পস (IRGC) এক বিবৃতিতে বলেছে, মার্কিন নৌ-অবরোধ “জলদস্যুতা এবং সামুদ্রিক চুরির সামিল।” ১৮ এপ্রিল ব্রিটিশ সামরিক বাহিনী জানায়, IRGC-র দুটি গানবোট হরমুজ প্রণালী দিয়ে যাওয়া একটি ট্যাংকারে গুলি ছুঁড়েছে। ব্রিটিশ সংস্থা UKMTO নিশ্চিত করেছে, জাহাজটি ও তার নাবিকরা নিরাপদ আছেন। মার্কিন সেন্ট্রাল কমান্ড (CENTCOM) জানিয়েছে, ১৩ এপ্রিল থেকে শুরু হওয়া নৌ-অবরোধের পর থেকে মোট ২৩টি জাহাজ তাদের আদেশ মেনে ফিরে গেছে।
ভারতের তেল আমদানি ও জ্বালানি বাজারে কী প্রভাব পড়ছে
হরমুজ প্রণালী বন্ধ থাকলে ভারতের অর্থনীতিতে এর সরাসরি প্রভাব পড়ে — কারণ ভারত তার মোট অপরিশোধিত তেলের প্রয়োজনের ৮৮ শতাংশই আমদানির মাধ্যমে মেটায়। এই সংকটের আগ পর্যন্ত ভারতের প্রায় ৪০–৫০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল এবং প্রায় ৯০ শতাংশ LPG গ্যাস হরমুজ প্রণালীর মধ্য দিয়ে আসত। বিশেষজ্ঞদের হিসাব অনুযায়ী, অপরিশোধিত তেলের প্রতি ব্যারেলে মাত্র এক ডলার দাম বাড়লে ভারতের আমদানি বিল বছরে প্রায় ১.৪ বিলিয়ন মার্কিন ডলার বাড়ে।
ভারত সরকার আগেই বিকল্প রুটে তেল আমদানির পরিমাণ বাড়িয়েছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রণালয় জানিয়েছে, এখন ভারতের প্রায় ৭০ শতাংশ অপরিশোধিত তেল হরমুজ-বহির্ভূত রুটে আসছে। কিন্তু LPG ও LNG সরবরাহে বিকল্প ব্যবস্থা করা কঠিন হচ্ছে। সংকটের কারণে ভারতে বিমান জ্বালানি (ATF) মূল্য ইতিমধ্যে প্রতি কিলোলিটারে ২ লক্ষ টাকার উপরে উঠেছে বলে Times of India জানিয়েছে। ব্র্যান্ট ক্রুড তেলের দাম ১৫ শতাংশের বেশি বৃদ্ধি পেয়েছে এই সংকট শুরুর পর থেকে।
আসাম ও বরাক উপত্যকায় প্রভাব: জ্বালানি থেকে নিত্যপণ্য
হরমুজ প্রণালী বন্ধের প্রভাব কেবল মুম্বই বা দিল্লির বাজারে সীমাবদ্ধ নয় — এর আঁচ পৌঁছেছে আসামের বরাক উপত্যকা এবং হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনেও। পেট্রোল, ডিজেল ও রান্নার গ্যাসের (LPG) দাম বাড়লে পরিবহন খরচ বাড়ে এবং তার সরাসরি প্রভাব পড়ে চাল, ডাল, সবজি ও অন্যান্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের দামে। বরাক উপত্যকার মানুষ ইতিমধ্যেই রান্নার গ্যাসের দাম বৃদ্ধি নিয়ে উদ্বিগ্ন। কৃষি উৎপাদনে ব্যবহৃত সার, কীটনাশক ও পেট্রোকেমিক্যাল পণ্যের মূল্যও এই সংকটে উপরে উঠছে — যা হাইলাকান্দির কৃষকদের উপর বাড়তি চাপ তৈরি করছে।
এগিয়ে কী: সংকট কতদিন চলবে?
হরমুজ প্রণালী বন্ধ পরিস্থিতির সমাধান এখনই দৃশ্যমান নয়। ইরানের জাতীয় নিরাপত্তা কমিশনের প্রধান বলেছেন, মার্কিন অবরোধ যতদিন থাকবে, ততদিন হরমুজ বন্ধ রাখার বিষয়ে ইরান “দৃঢ় প্রতিজ্ঞ।” শিল্প বিশেষজ্ঞরা সতর্ক করছেন, যদি এই বন্ধ অব্যাহত থাকে তাহলে অপরিশোধিত তেলের দাম ব্যারেলপ্রতি ১৩২ মার্কিন ডলার পর্যন্ত উঠে যেতে পারে। ডালাস ফেডারেল রিজার্ভ অনুমান করেছে, প্রণালীর এক-চতুর্থাংশ বন্ধ থাকলেও ২০২৬ সালের দ্বিতীয় প্রান্তিকে বৈশ্বিক GDP বৃদ্ধি বার্ষিক ভিত্তিতে ২.৯ শতাংশ কমে যেতে পারে। ভারতের রিজার্ভ ব্যাংক (RBI) এপ্রিল ২০২৬ বৈঠকে সুদের হার অপরিবর্তিত রেখেছে, কারণ উচ্চমূল্যস্ফীতি ও প্রবৃদ্ধি-মন্দার মাঝে একটি কঠিন ভারসাম্য রক্ষা করতে হচ্ছে। মার্চে ভারতের CPI মূল্যস্ফীতি ছিল ৩.৪ শতাংশ — হরমুজ পরিস্থিতির অবনতি হলে এই হার আবার উপরে উঠতে পারে বলে আশঙ্কা করছেন বিশেষজ্ঞরা। পরিস্থিতি এখন আন্তর্জাতিক কূটনীতির দিকে দৃষ্টি রেখে এগিয়ে চলছে — মার্কিন-ইরান আলোচনা পুনরায় শুরু হওয়া ছাড়া এই সংকটের শান্তিপূর্ণ সমাধানের পথ খুলবে না বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা।