
জয়রাম রমেশ হিমন্ত পাসপোর্ট বিতর্ককে ঘিরে মঙ্গলবার কংগ্রেস ও BJP-র মধ্যে তীব্র বাকযুদ্ধ নতুন মাত্রায় পৌঁছাল। অসম পুলিশ দিল্লিতে কংগ্রেস নেতা পবন খেড়ার (Pawan Khera) বাড়িতে তল্লাশি চালানোর পরপরই কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক জয়রাম রমেশ (Jairam Ramesh) একটি বিবৃতিতে দাবি করেন যে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা (Himanta Biswa Sarma) আসলে “বিচলিত ও ঘাবড়ে গেছেন” । তিনি বলেন, এই পুলিশি তৎপরতা সত্যের মুখোমুখি হওয়ার বদলে বিরোধী নেতাকে ভয় দেখানোর রাজনৈতিক কৌশল ছাড়া আর কিছু নয় । ৯ এপ্রিলের অসম বিধানসভা নির্বাচনের মাত্র দু’দিন আগে এই তীব্র রাজনৈতিক সংঘাত ভোটের প্রচারকে নতুন মাত্রা দিয়েছে।
পুলিশি তল্লাশি এবং কংগ্রেসের “রাজনৈতিক প্রতিহিংসা”র অভিযোগ
মঙ্গলবার সকালে অসম পুলিশের একটি দল দিল্লি পুলিশের সহায়তায় পবন খেড়ার নিজামুদ্দিন ইস্টের (Nizamuddin East) বাসভবনে পৌঁছায় । তল্লাশির সময় খেড়া বাড়িতে ছিলেন না । পুলিশ জানায়, মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী রিনিকি ভূয়াঁ শর্মার (Riniki Bhuyan Sarma) দায়ের করা FIR-এর ভিত্তিতে এই তল্লাশি পরিচালিত হয়েছে । FIR-টি ভারতীয় ন্যায় সংহিতা (BNS), ২০২৩-এর জালিয়াতি ও মানহানি সংক্রান্ত ধারায় রোববার রাতে গুয়াহাটির পানবাজার ক্রাইম ব্রাঞ্চ থানায় দায়ের করা হয়েছিল ।
কংগ্রেসের তরফ থেকে জয়রাম রমেশ এই পুরো পরিস্থিতিকে “সরকারি যন্ত্রের অপব্যবহার” বলে আখ্যা দেন। তিনি বলেন, “পবন খেড়া প্রমাণসহ সত্য কথা বলেছেন। তার জবাবে পুলিশ পাঠানো প্রমাণ করে মুখ্যমন্ত্রী ঘাবড়ে গেছেন। এটি ভয় দেখানোর রাজনীতি।” কংগ্রেস নেতারা সামগ্রিকভাবে দাবি করেন, নির্বাচনের মুখে BJP সরকার বিরোধী দলের কণ্ঠরোধ করতে পুলিশকে ব্যবহার করছে। এটি গণতান্ত্রিক রীতিনীতির বিরুদ্ধে।
পাসপোর্ট অভিযোগের বিস্তারিত এবং BJP-র পাল্টা অবস্থান
এই বিতর্কের সূচনা হয় রোববার (৬ এপ্রিল)। পবন খেড়া দিল্লি ও গুয়াহাটিতে পরপর দুটি সংবাদ সম্মেলনে অভিযোগ করেন যে রিনিকি ভূয়াঁ শর্মার কাছে UAE, আন্তিগুয়া ও বার্বুডা (Antigua and Barbuda) এবং মিশরের (Egypt) তিনটি বিদেশি পাসপোর্ট রয়েছে । UAE-র গোল্ডেন কার্ডটি ২০২২ সাল থেকে ২০২৭ পর্যন্ত এবং আন্তিগুয়া পাসপোর্টটি ২০২১ থেকে ২০৩১ পর্যন্ত বৈধ বলে খেড়া দাবি করেন । তিনি আরও দাবি করেন যে মুখ্যমন্ত্রীর মার্কিন যুক্তরাষ্ট্রের ওয়াইওমিং (Wyoming) রাজ্যে প্রায় ৫৩,০০০ কোটি টাকা মূল্যের একটি LLC রয়েছে ।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এই সমস্ত অভিযোগকে “সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন” ও “জাল নথির উপর নির্মিত রাজনৈতিক প্রচারণা” বলে উড়িয়ে দেন । তাঁর দাবি, বিতর্কিত দলিলগুলো স্ক্রিবড (Scribd) প্ল্যাটফর্ম থেকে চুরি করে বিকৃত করা হয়েছে এবং এর পেছনে পাকিস্তানি সোশ্যাল মিডিয়া গোষ্ঠীর যোগ রয়েছে বলেও তিনি দাবি করেন । রিনিকি নিজে বলেছেন, “ভারতে দ্বৈত নাগরিকত্ব দেওয়া হয় না। আমার কাছে তিনটি পাসপোর্ট থাকবে কীভাবে? এগুলো AI দিয়ে তৈরি।” বস্তুত, ভারতীয় পাসপোর্ট আইন অনুযায়ী একজন ভারতীয় নাগরিক একই সাথে দুটি দেশের পাসপোর্ট রাখতে পারেন না ।
কংগ্রেস সভাপতি খাড়গে এবং ভোটের ময়দানে পাল্টাপাল্টি দাবি
পাসপোর্ট বিতর্কে শুধু জয়রাম রমেশই নয়, কংগ্রেসের জাতীয় সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে (Mallikarjun Kharge) স্বয়ং গুয়াহাটিতে একটি জনসভায় এই ইস্যু তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন, বর্তমান BJP সরকারের আমলে অসমে দুর্নীতি বেড়েছে এবং মুখ্যমন্ত্রী কেবল নিজের পরিবারের স্বার্থে কাজ করছেন । খাড়গে আত্মবিশ্বাসের সাথে জানান, আসন্ন নির্বাচনে কংগ্রেস-নেতৃত্বাধীন জোট অসমের ১২৬ আসনের মধ্যে ৭২ থেকে ৭৩টি আসনে জয়ী হবে ।
অন্যদিকে পবন খেড়া ৫ এপ্রিল প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন যে, কংগ্রেস “কয়েক ঘণ্টার মধ্যে” সমস্ত প্রমাণ জনসমক্ষে তুলে ধরবে । কিন্তু মঙ্গলবার পর্যন্ত সেই সম্পূর্ণ নথিমালা প্রকাশ করা হয়নি। এই পরিস্থিতিতে কংগ্রেসের দাবিগুলি নিয়ে নানা প্রশ্নও উঠছে।
অসম নির্বাচন এবং বরাক উপত্যকার ভোটারদের কাছে এই বিতর্কের গুরুত্ব
হাইলাকান্দি জেলা, লালা শহর সহ সমগ্র বরাক উপত্যকার ভোটারদের কাছে এই জয়রাম রমেশ হিমন্ত পাসপোর্ট বিতর্ক এবং পুলিশি তল্লাশির ঘটনা ভোটের আগে একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে উঠেছে। প্রতিটি রাজনৈতিক দল এই বিতর্ককে নিজেদের পক্ষে ব্যবহার করার চেষ্টা করছে। BJP বলছে কংগ্রেস “মিথ্যা ও বানোয়াট” নথি দিয়ে ভোটারদের বিভ্রান্ত করতে চাইছে। কংগ্রেস বলছে, BJP পুলিশকে হাতিয়ার বানিয়ে সত্য প্রকাশে বাধা দিচ্ছে। এই দুই আখ্যানের মাঝে কে কতটা সত্য বলছে, তার বিচার এখন ভোটারদের হাতেই। ভারতীয় সংবিধান অনুযায়ী রাজ্য পুলিশের কাজ হওয়া উচিত নিরপেক্ষ তদন্ত পরিচালনা করা। নির্বাচনের ঠিক আগে রাজ্য পুলিশের দিল্লি অভিযান বিরোধী দলের কাছে যতটা “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” মনে হচ্ছে, সরকারি দলের কাছে ততটাই এটি “আইনের স্বাভাবিক প্রক্রিয়া”। ৯ এপ্রিলের ভোট এবং ৪ মে-র ফলাফলের পর আদালতে এই মামলার গতিপথ কোনদিকে যায়, সেটাই এখন দেখার বিষয়। জয়রাম রমেশ হিমন্ত পাসপোর্ট বিতর্ক শুধু এই নির্বাচনের নয়, ভবিষ্যতের অসম রাজনীতিরও একটি গুরুত্বপূর্ণ অধ্যায় হয়ে থাকবে।