
আসাম বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণের মাত্র একদিন আগে, ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে কংগ্রেসের সাধারণ সম্পাদক প্রিয়াঙ্কা গান্ধী ওয়াধ্রা (Priyanka Gandhi Vadra) আসামের মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার (Himanta Biswa Sarma) বিরুদ্ধে তীব্র প্রতিক্রিয়া জানিয়েছেন। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী হিমন্ত খাড়গে বিতর্ক তখনই চূড়ায় পৌঁছায় যখন হিমন্ত বিশ্বশর্মা কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গে (Mallikarjun Kharge) সম্পর্কে প্রচারের একেবারে শেষ লগ্নে বিতর্কিত মন্তব্য করেন। India Today NE-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী এই মন্তব্যকে “সম্পূর্ণ লজ্জাজনক ও অগ্রহণযোগ্য” বলে সরাসরি নিন্দা করেছেন এবং মুখ্যমন্ত্রীর কাছে প্রকাশ্যে ক্ষমা প্রার্থনার দাবি জানিয়েছেন।
ভোটের ঠিক আগে এই বিতর্ক রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন ফেলেছে। প্রিয়াঙ্কার বক্তব্য মুহূর্তের মধ্যে সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়িয়ে পড়ে এবং কংগ্রেস কর্মীরা একে নির্বাচনী প্রচারের সর্বশেষ শক্তিশালী বার্তা হিসেবে ব্যাপকভাবে প্রচার করতে থাকেন।
হিমন্তের মন্তব্য এবং কংগ্রেসের কড়া প্রতিক্রিয়া
হিমন্ত বিশ্বশর্মা কংগ্রেস সভাপতি মন্তব্য বিষয়ক বিতর্কটি সরাসরি ব্যক্তিগত সম্মানের প্রশ্নে পরিণত হয়েছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী তাঁর প্রতিক্রিয়ায় বলেন, মল্লিকার্জুন খাড়গে এই দেশের একজন প্রবীণ রাজনেতা, একজন সংবিধানপ্রেমী নেতা, যিনি সারাজীবন দলিত সমাজের অধিকারের জন্য লড়াই করে এসেছেন। তাঁকে নিয়ে এই ধরনের কুরুচিকর মন্তব্য কোনো সভ্য রাজনৈতিক সংস্কৃতির পরিচয় নয়। প্রিয়াঙ্কা স্পষ্টভাবে বলেন, “এটি সম্পূর্ণ লজ্জাজনক এবং অগ্রহণযোগ্য। মুখ্যমন্ত্রীকে অবিলম্বে ক্ষমা চাইতে হবে।”
প্রিয়াঙ্কার এই অবস্থান শুধু ব্যক্তিগত প্রতিরক্ষার জায়গা থেকে নয়, এটি একটি বৃহত্তর রাজনৈতিক বার্তাও বহন করে। কংগ্রেস দেখাতে চাইছে যে BJP-র রাজনীতি বিভাজনমূলক ভাষা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণের ওপর নির্ভরশীল। তারা ভোটারদের সামনে এই প্রশ্ন রাখতে চেয়েছে — উন্নয়নের বদলে আসাম শাসকরা কেন ব্যক্তিআক্রমণে ব্যস্ত?
BJP-র পক্ষ থেকে অবশ্য এই অভিযোগ খারিজ করা হয়েছে। হিমন্ত বিশ্বশর্মার দলের তরফে বলা হয়েছে যে, তাঁর মন্তব্য রাজনৈতিক সমালোচনার মধ্যে পড়ে এবং কংগ্রেস ভোটের ঠিক আগে মনোযোগ সরানোর জন্য এই বিবাদ তৈরি করছে।
আসাম নির্বাচন ২০২৬: শেষ দিনের প্রচারে উত্তাপ
আসাম নির্বাচন ২০২৬ শেষ দিন প্রচার মোটেই শান্ত ছিল না। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী কেবল এই বিতর্কেই সীমাবদ্ধ থাকেননি; তিনি আরও বলেছেন যে হিমন্ত সরকারের আমলে আসামে কর্মসংস্থান কমেছে, কৃষকরা ন্যায্য মূল্য পাচ্ছেন না এবং বন্যার মতো প্রাকৃতিক দুর্যোগে সরকারি সাহায্য পর্যাপ্ত ছিল না।
এই নির্বাচনী প্রচারে কংগ্রেসের “পাঁচ গ্যারান্টি” — মহিলাদের মাসিক ভাতা, বিনামূল্যে স্বাস্থ্যসেবা, কৃষকদের ঋণমুক্তি, যুবকদের কর্মসংস্থান এবং ভূমিহীনদের পাট্টা — এর প্রতিশ্রুতি বারবার সামনে এসেছে। অন্যদিকে BJP তাদের উন্নয়ন কর্মসূচি, CAA বাস্তবায়ন এবং অনুপ্রবেশ-বিরোধী কঠোর অবস্থানকে প্রধান ইস্যু করেছে।
কংগ্রেস BJP বাকযুদ্ধ আসাম প্রচারের শেষ পর্বে সবচেয়ে তীব্র রূপ ধারণ করেছে। রাহুল গান্ধী, প্রিয়াঙ্কা গান্ধী, খাড়গে — এই তিন বড় নাম প্রচারে সক্রিয় ছিলেন। BJP-র পক্ষে নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi) এবং অমিত শাহ (Amit Shah) আসামের বিভিন্ন জনসভায় সরকারের সাফল্য তুলে ধরেছেন। প্রতিটি সমাবেশে পাল্টাপাল্টি অভিযোগ এবং আক্রমণ দেখা গেছে, যা এবারের প্রচারকে ব্যক্তিগত এবং মতাদর্শিক দুই স্তরেই উত্তপ্ত রেখেছে।
বরাক উপত্যকা ও লালার ভোটারদের কাছে এই বিবাদের তাৎপর্য
হাইলাকান্দি (Hailakandi) জেলা এবং লালা টাউনের (Lala Town) ভোটারদের জন্য প্রিয়াঙ্কা গান্ধী হিমন্ত খাড়গে বিতর্ক একটি গুরুত্বপূর্ণ রাজনৈতিক বার্তা বহন করে। বরাক উপত্যকায় দলিত, আদিবাসী এবং সংখ্যালঘু সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ বাস করেন। মল্লিকার্জুন খাড়গে নিজে দলিত সমাজের প্রতিনিধি হওয়ায় তাঁর সম্পর্কে করা যেকোনো অবমাননাকর মন্তব্য এই অঞ্চলের ভোটারদের কাছে একটি স্পর্শকাতর বিষয়।
লালার মতো এলাকায় বহু পরিবার দীর্ঘদিন ধরে কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী ভোটার। তবে গত কয়েক বছরে BJP এই অঞ্চলে উল্লেখযোগ্য অগ্রগতি করেছে। এই পরিস্থিতিতে প্রিয়াঙ্কার এই দৃঢ় প্রতিক্রিয়া কংগ্রেসের ঐতিহ্যবাহী ভোটারদের একত্রিত করতে সাহায্য করতে পারে বলে রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
৯ এপ্রিলের ভোটের ফলাফলই বলে দেবে যে, এই বিতর্ক ভোটারদের মনে কতটা প্রভাব ফেলেছে। প্রিয়াঙ্কা গান্ধী হিমন্ত খাড়গে বিতর্ক শেষ পর্যন্ত একটি নির্বাচনী কৌশলে পরিণত হয়েছে কিনা, নাকি এটি সত্যিকারের জনরোষের প্রতিফলন — সেই প্রশ্নের উত্তর দেবেন আসামের ভোটাররা নিজেরাই। তবে এটা স্পষ্ট যে, ২০২৬ সালের আসাম নির্বাচন কেবল উন্নয়নের আলোচনায় নয়, ব্যক্তিগত সম্মান, সামাজিক মর্যাদা এবং রাজনৈতিক ভদ্রতার প্রশ্নেও একটি গুরুত্বপূর্ণ পরীক্ষা হয়ে উঠেছে।