Read today's news --> Click here

UPI ১০ বছর পূর্ণ: ১২ হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বের ডিজিটাল পেমেন্টে ভারতের নেতৃত্ব

১১ এপ্রিল ২০২৬ — ভারতের সবচেয়ে সফল প্রযুক্তিগত উদ্ভাবনগুলোর একটির দশম জন্মদিন। National Payments Corporation of India বা NPCI চালু করা Unified Payments Interface — সংক্ষেপে UPI — ঠিক এই দিনটিতে ১০ বছর পূর্ণ করল। আর এই এক দশকে UPI ডিজিটাল পেমেন্ট বিপ্লব ঘটিয়েছে এমনভাবে, যা বিশ্বের অনেক উন্নত দেশও দেখেনি। ২০১৬ সালে চালু হওয়ার প্রথম বছরে মাত্র ১৭.৮৬ মিলিয়ন লেনদেন হয়েছিল, ২০২৫-২৬ অর্থবছরে সেই সংখ্যা পৌঁছে গেছে প্রায় ২১৯ বিলিয়নে — ১০ বছরে বৃদ্ধির হার ১২,০০০ গুণেরও বেশি।

শূন্য থেকে শীর্ষে: এক দশকের যাত্রা

UPI-র সূচনা হয়েছিল একটি পাইলট প্রোগ্রাম হিসেবে, ২০১৬ সালের এপ্রিলে। লক্ষ্য ছিল সহজ — ব্যাংকের প্রযুক্তিগত জটিলতা সরিয়ে মানুষকে স্মার্টফোন থেকেই তাৎক্ষণিকভাবে টাকা পাঠানোর সুযোগ দেওয়া। প্রথম দিকে বিস্তার ছিল ধীরে ধীরে — ২০১৮ সালে লেনদেন ৯১৫ মিলিয়নে, ২০১৯ সালে ৫.৩৯ বিলিয়নে পৌঁছায়। ২০২০ সালে UPI মূলধারার পেমেন্ট পদ্ধতি হিসেবে প্রতিষ্ঠিত হয়, ওই বছর লেনদেন ছাড়িয়ে যায় ১২.৫ বিলিয়ন।

এরপর কোভিড অতিমারি পরিস্থিতি UPI-র বিস্তারে এক অপ্রত্যাশিত ত্বরণ এনে দেয়। যোগাযোগ কমাতে মানুষ নগদের বদলে ডিজিটাল পেমেন্টে ঝুঁকে পড়েন, দোকানে দোকানে QR কোড বসে যায়। ২০২১ ও ২০২২ সালে লেনদেন যথাক্রমে ২২.৩৩ বিলিয়ন এবং ৪৫.৯৭ বিলিয়নে উঠে যায়। ২০২৩ সালে ৮৩.৭৫ বিলিয়ন, ২০২৪ সালে ১৩০.১৩ বিলিয়ন এবং ২০২৫ সালে ১৮৫.৮৭ বিলিয়ন লেনদেন রেকর্ড হয়।

মূল্যের দিক থেকেও বৃদ্ধি সমান চমকপ্রদ। ২০১৭ সালে মোট লেনদেন মূল্য ছিল মাত্র ৬,৯৫২ কোটি টাকা। ২০২৫-২৬ অর্থবছরে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে প্রায় ৩০৮ লক্ষ কোটি টাকায় — অর্থাৎ ৪,০০০ গুণেরও বেশি বৃদ্ধি। ২০২৬ সালের মার্চ মাসে একটি নতুন মাসিক রেকর্ড তৈরি হয়েছে — একটি মাসেই ২২.৬৪ বিলিয়ন লেনদেন এবং মোট মূল্য ছিল ২৯.৫৩ লক্ষ কোটি টাকা, অর্থাৎ প্রতিদিন গড়ে প্রায় ১ লক্ষ কোটি টাকার লেনদেন।

বিশ্বমঞ্চে UPI: ভারত এখন ডিজিটাল পেমেন্টের রোলমডেল

UPI ১০ বছর পূর্ণ করার মুহূর্তে ভারতের গর্বিত হওয়ার কারণ আছে একটি বড় সংখ্যায় — ৪৯। বিশ্বের মোট রিয়েল-টাইম ডিজিটাল পেমেন্ট লেনদেনের ৪৯ শতাংশ এখন ভারতের UPI-তে সম্পন্ন হয়। এই তথ্য কেবল ভারত সরকারের নয় — International Monetary Fund বা IMF এবং World Bank উভয়ই UPI-র মাত্রা, দক্ষতা ও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির ভূমিকাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। Vision IAS-এর তথ্য অনুযায়ী, ভারত এখন বিশ্বের তাৎক্ষণিক পেমেন্ট লেনদেনের প্রায় অর্ধেক একা সম্পন্ন করছে — যেখানে চীন, আমেরিকা ও ইউরোপও UPI-র মতো এককেন্দ্রিক ব্যবস্থা তৈরি করতে পারেনি।

UPI এখন আর শুধু দেশের ভেতরে সীমাবদ্ধ নেই। সংযুক্ত আরব আমিরাত, সিঙ্গাপুর, ভুটান, নেপাল, শ্রীলঙ্কা, ফ্রান্স, মরিশাস ও কাতারে এখন UPI থেকে সরাসরি পেমেন্ট করা যায়। এর মানে ভারতের প্রবাসী শ্রমিকরা এখন তাঁদের পরিবারকে মুহূর্তের মধ্যে টাকা পাঠাতে পারছেন — কোনো বিনিময় মাশুল ছাড়াই। Moneycontrol-এর তথ্য অনুযায়ী, ২০২৫ সালে UPI-তে ব্যবসায়িক পেমেন্ট ছিল মোট লেনদেনের ৬২ শতাংশ — যা বলছে এটি কেবল ব্যক্তিগত পেমেন্টের মাধ্যম নয়, ব্যবসায়ের মেরুদণ্ড হয়ে উঠেছে।

একটি সংখ্যা আরও চোখে পড়ার মতো — ২০২৫ সালে ভারতে UPI QR কোডের সংখ্যা দাঁড়িয়েছে ৭৩১.৩৮ মিলিয়নে, যা বছরে ১৫ শতাংশ বেড়েছে। অর্থাৎ দেশের কোণে কোণে ছোট দোকানদার, হকার, সবজি বিক্রেতা — সবাই UPI-তে পেমেন্ট নিচ্ছেন।

UPI-ব্যাংক নেটওয়ার্ক অন্তর্ভুক্তির গল্প

UPI-র সাফল্যের একটি বড় কারণ হলো এর ব্যাপক ব্যাংক সংযুক্তি। ২০২১ সালে UPI-তে যুক্ত ব্যাংকের সংখ্যা ছিল ২১৬। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে সেই সংখ্যা পৌঁছে গেছে ৬৯১-তে। এর মানে যেকোনো ব্যাংকের গ্রাহক — সরকারি, বেসরকারি, সমবায় — সকলেই UPI ব্যবহার করতে পারছেন। ব্যবহারকারীকে অ্যাপ বা ব্যাংক বেছে নেওয়ার দরকার নেই — একটি ভার্চুয়াল পেমেন্ট অ্যাড্রেস বা VPA থেকেই সব সুবিধা পাওয়া যায়।

Vision IAS-এর ফেব্রুয়ারি ২০২৬-এ প্রকাশিত ডিজিটাল পেমেন্ট রিপোর্ট অনুযায়ী, UPI এখন ভারতের সবচেয়ে পছন্দের পেমেন্ট পদ্ধতি — ৫৭ শতাংশ মানুষ UPI পছন্দ করেন, নগদের অংশ নেমে এসেছে ৩৮ শতাংশে। ব্যবসায়ীদের মধ্যে UPI গ্রহণের হার ৯৪ শতাংশে পৌঁছেছে। এই পরিসংখ্যানগুলো বলছে, ডিজিটাল পেমেন্ট এখন আর শহুরে, শিক্ষিত বা প্রযুক্তিসচেতনদের জন্য সীমাবদ্ধ নয় — এটি প্রকৃত অর্থে একটি জনগণের মঞ্চ হয়ে উঠেছে।

লালা টাউন হাইলাকান্দিতে UPI-প্রভাব

আসামের বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলা এবং লালা টাউনেও গত কয়েক বছরে UPI-র বিস্তার উল্লেখযোগ্য হয়েছে। বাজারের ছোট দোকানদার থেকে শুরু করে মুদির দোকান — QR কোড এখন সর্বত্র। PhonePe, Google Pay ও Paytm-এর মাধ্যমে মানুষ চা কেনা থেকে স্কুলের বেতন পরিশোধ — সবই ডিজিটালে করছেন। সরকারি প্রকল্পের সুবিধা, PM কিষান ভাতা, জনধন অ্যাকাউন্ট — সবকিছুই এখন ডিজিটাল মাধ্যমে সরাসরি সুফলভোগীর হাতে পৌঁছাচ্ছে।

তবে চ্যালেঞ্জও আছে। নেটওয়ার্ক সমস্যা, সাইবার জালিয়াতির ঘটনা এবং প্রবীণ বা স্বল্পশিক্ষিত মানুষদের ডিজিটাল সাক্ষরতার অভাব — এগুলো এখনো পুরোপুরি কাটিয়ে ওঠা যায়নি। তবে UPI-র ১০ বছরের যাত্রা প্রমাণ করে, সঠিক প্রযুক্তি ও নীতি থাকলে প্রান্তিক মানুষও আর্থিক অন্তর্ভুক্তির আওতায় আসতে পারেন।

UPI ডিজিটাল পেমেন্ট বিপ্লবের দ্বিতীয় দশক শুরু হলো আরও বড় সম্ভাবনা নিয়ে। সামনে আসছে UPI Credit Line, আন্তর্জাতিক বিস্তার আরও বাড়বে এবং RBI-র নতুন নিরাপত্তা কাঠামো — কিল সুইচ, ১ ঘণ্টার বিরতি — সব মিলিয়ে ব্যবস্থাটি আরও নিরাপদ ও বিশ্বাসযোগ্য হবে। ভারত একটি ডিজিটাল পেমেন্ট পরাশক্তি হিসেবে আগামী দিনে আরও অনেক দেশের কাছে অনুসরণীয় হবে — এই দশকের পরিসংখ্যান সেই বিশ্বাসকে শক্ত ভিত্তি দিয়েছে।

UPI ১০ বছর পূর্ণ: ১২ হাজার গুণ বৃদ্ধি পেয়ে বিশ্বের ডিজিটাল পেমেন্টে ভারতের নেতৃত্ব
Scroll to top