Read today's news --> Click here

কংগ্রেস শাসনে বরাক উপত্যকা অপরাধের কেন্দ্র ছিল: শ্রীভূমির জনসভায় তোপ নীতিন নবীনের

আসন্ন আসাম বিধানসভা নির্বাচনের আগে রাজনৈতিক পারদ ক্রমশ চড়ছে। এবার বরাক উপত্যকায় নির্বাচনী প্রচারে এসে প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানালেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) সর্বভারতীয় সভাপতি নীতিন নবীন। শনিবার নবগঠিত শ্রীভূমি (Sribhumi) জেলার রামকৃষ্ণনগরে এক বিশাল জনসভায় ভাষণ দিতে গিয়ে তিনি অভিযোগ করেন যে, কংগ্রেস শাসনে বরাক উপত্যকা অপরাধের কেন্দ্র হয়ে উঠেছিল। তাঁর দাবি, শুধুমাত্র ভোটব্যাঙ্ক এবং তুষ্টিকরণের রাজনীতির স্বার্থেই পূর্বতন কংগ্রেস সরকার এই অঞ্চলের সাধারণ মানুষের নিরাপত্তাকে জলাঞ্জলি দিয়েছিল। করিমগঞ্জ জেলার নাম পরিবর্তন করে সম্প্রতি ‘শ্রীভূমি’ রাখা হয়েছে এবং এই নতুন জেলার মাটিতে দাঁড়িয়ে বিজেপির শীর্ষ নেতার এই মন্তব্য বরাকের রাজনীতিতে নতুন করে বিতর্কের ঝড় তুলেছে।

কংগ্রেসের তুষ্টিকরণ বনাম বিজেপির উন্নয়ন

শ্রীভূমির রামকৃষ্ণনগরে দলীয় প্রার্থীর সমর্থনে আয়োজিত এই জনসভায় নীতিন নবীন অতীতের কংগ্রেস সরকারের তীব্র সমালোচনা করে বলেন, “পূর্ববর্তী সরকারগুলি শুধুমাত্র তাদের সংকীর্ণ ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতির জন্য বরাক উপত্যকাকে অপরাধের একটি বড় কেন্দ্রে পরিণত করেছিল।” তিনি অভিযোগ করেন যে, কংগ্রেস আমলে তোষণের রাজনীতি এতটাই চরমে পৌঁছেছিল যে, স্থানীয় খিলঞ্জিয়া বা ভূমিপুত্রদের চেয়ে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের স্বার্থ রক্ষাতেই সরকার বেশি মনোযোগী ছিল।

তাঁর কথায়, “কংগ্রেসের এই দ্বিচারিতা ও অনুপ্রবেশকারী-তোষণের কারণেই সাধারণ মানুষ তাদের শাস্তি দেওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় এবং আসামের ক্ষমতা থেকে তাদের পুরোপুরি উৎখাত করে। সাধারণ মানুষ একটি সুস্পষ্ট উন্নয়নের লক্ষ্য নিয়ে বিজেপি-নেতৃত্বাধীন এনডিএ (NDA) সরকারকে ক্ষমতায় বসিয়েছে।” নীতিন নবীন জোর দিয়ে বলেন যে, বর্তমান মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার নেতৃত্বে আসাম সরকার ‘বিরাসত এবং বিকাশ’ (ঐতিহ্য এবং উন্নয়ন)—এই দুই মন্ত্রকে সমানভাবে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে, যার ফলে রাজ্যের দক্ষিণ অংশে, বিশেষ করে বরাক উপত্যকায় অপরাধের হার উল্লেখযোগ্যভাবে কমেছে।

শান্তিশৃঙ্খলা বেদখল মুক্ত আসামের প্রতিশ্রুতি

বিগত প্রায় এক দশক ধরে আসামে বিজেপির শাসনকালে কী কী পরিবর্তন এসেছে, তার একটি খতিয়ান এদিনের জনসভায় তুলে ধরেন নীতিন নবীন। তিনি সুস্পষ্টভাবে জানান যে, বর্তমান সরকারের অন্যতম বড় সাফল্য হলো অনুপ্রবেশকারীদের হাত থেকে সরকারি জমি দখলমুক্ত করা এবং স্থানীয় ভূমিপুত্রদের অধিকার সুরক্ষিত করা।

“আজ আর কোনো অপরাধী সাধারণ মানুষকে বিরক্ত করার সাহস পায় না, কারণ তারা খুব ভালো করেই জানে যে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা অপরাধীদের বিরুদ্ধে কঠোরতম পদক্ষেপ নিতে পিছপা হন না,” ভিড়ে ঠাসা জনসভায় জোর গলায় দাবি করেন নবীন। তিনি আরও যোগ করেন যে, আজ রাজ্যে অতীতের সেই অশান্তির বদলে এক সার্বিক শান্তির পরিবেশ বিরাজ করছে, আর ঠিক সেই কারণেই সব সম্প্রদায়ের মানুষ স্বতঃস্ফূর্তভাবে বিজেপিকে সমর্থন করছেন। আগামী ৯ এপ্রিল অনুষ্ঠিত হতে চলা বিধানসভা নির্বাচনে এনডিএ জোট আসামে বিপুল সংখ্যাগরিষ্ঠতা নিয়ে টানা তৃতীয়বারের জন্য ক্ষমতায় ফিরবে বলেও তিনি গভীর আত্মবিশ্বাস ব্যক্ত করেন।

বরাক উপত্যকা হাইলাকান্দি লালা বাজারের রাজনৈতিক তাৎপর্য

বরাক উপত্যকার তিনটি জেলা—কাছাড়, হাইলাকান্দি এবং নবগঠিত শ্রীভূমি (পূর্বতন করিমগঞ্জ)—আসামের রাজনীতিতে বরাবরই একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করে এসেছে। বিশেষ করে আমাদের হাইলাকান্দি লালা বাজার এবং এর আশেপাশের অঞ্চলগুলোতেও নির্বাচনকে ঘিরে সাধারণ মানুষের মধ্যে ব্যাপক উন্মাদনা লক্ষ করা যাচ্ছে। শ্রীভূমিতে নীতিন নবীনের এই রাজনৈতিক সভা হাইলাকান্দি জেলার ভোটারদের কাছেও একটি স্পষ্ট বার্তা পৌঁছে দিয়েছে।

কংগ্রেসের আমলে বরাকে সত্যিই আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি কেমন ছিল এবং বর্তমান বিজেপি সরকারের আমলে তাতে কতটা উন্নতি হয়েছে, তা নিয়ে হাইলাকান্দি লালা বাজার এলাকার চায়ের দোকান থেকে শুরু করে পাড়ার মোড়গুলোতে এখন জোর চর্চা চলছে। এখানকার সাধারণ মানুষও চাইছেন এমন একটি সরকার ক্ষমতায় আসুক, যারা এলাকার রাস্তাঘাট, পানীয় জল এবং কর্মসংস্থানের মতো মৌলিক উন্নয়নগুলো নিশ্চিত করার পাশাপাশি, সাধারণ নাগরিকের পূর্ণ নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করবে। প্রতিবেশী শ্রীভূমি জেলায় বিজেপির এই হাই-ভোল্টেজ প্রচার নিশ্চিতভাবেই গোটা বরাক উপত্যকায় দলের কর্মীদের মনোবল কয়েকগুণ বাড়িয়ে দিয়েছে।

বিরোধীদের পাল্টা তোপ এবং নির্বাচনের অপেক্ষা

বিজেপির এই লাগাতার আক্রমণের মুখে স্বাভাবিকভাবেই চুপ বসে নেই বিরোধী দলগুলি। কংগ্রেসের স্থানীয় নেতৃত্ব বিজেপির এই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন এবং রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বলে উড়িয়ে দিয়েছেন। তাঁদের দাবি, বিগত দশ বছরে আসামে নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসের আকাশছোঁয়া মূল্যবৃদ্ধি, বেকারত্ব এবং বিভিন্ন প্রতিশ্রুতি পূরণে ব্যর্থতা ঢাকতেই বিজেপি এখন অতীতের কংগ্রেস সরকারের ঘাড়ে দোষ চাপিয়ে সাধারণ মানুষের নজর ঘোরাতে চাইছে। রাজ্যের অন্যান্য প্রান্ত, যেমন নগাঁও ও ধুবড়িতে ইতিমধ্যেই প্রাক-নির্বাচনী হিংসার ঘটনা প্রকাশ্যে এসেছে, যা নিয়ে প্রশাসন হাই অ্যালার্টে রয়েছে।

তবে নীতিন নবীনের এই ঝাঁঝালো ভাষণ এটা স্পষ্ট করে দিয়েছে যে, বরাক উপত্যকায় নিজেদের আধিপত্য ধরে রাখতে বিজেপি কোনো খামতি রাখতে চাইছে না। আগামী ৯ তারিখের নির্বাচনে সাধারণ মানুষ কংগ্রেসের বিরুদ্ধে আনা এই ‘অপরাধের কেন্দ্র’ তত্ত্বকে কতটা গুরুত্ব দেয় এবং উন্নয়নের নিরিখে কোন দলকে বেছে নেয়, তা জানার জন্য এখন আগামী ৪ মে ভোটগণনার দিন পর্যন্ত অপেক্ষা করতে হবে।

কংগ্রেস শাসনে বরাক উপত্যকা অপরাধের কেন্দ্র ছিল: শ্রীভূমির জনসভায় তোপ নীতিন নবীনের
Scroll to top