
সাম্প্রতিক সময়ে ইরান এবং ইজরায়েলের মধ্যে চরম সামরিক সংঘাতের জেরে গোটা মধ্যপ্রাচ্য (Middle East) জুড়ে এক ভয়াবহ যুদ্ধ পরিস্থিতি তৈরি হয়েছে। এই অভূতপূর্ব ভূ-রাজনৈতিক সংকটের মধ্যে সেখানে বসবাসকারী লক্ষ লক্ষ প্রবাসী ভারতীয়ের ভবিষ্যৎ নিয়ে গোটা দেশজুড়ে চরম উদ্বেগ ও উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়েছিল। তবে দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী অত্যন্ত স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছেন যে, মধ্যপ্রাচ্যে ভারতীয়দের নিরাপত্তা সুনিশ্চিত করাই বর্তমান কেন্দ্রীয় সরকারের সর্বোচ্চ অগ্রাধিকার। গত সপ্তাহে লোকসভা ও রাজ্যসভায় দেওয়া তাঁর বিশেষ ভাষণ এবং সাম্প্রতিক এক নির্বাচনী জনসভায় প্রধানমন্ত্রী জোর দিয়ে বলেন যে, যুদ্ধবিধ্বস্ত এলাকাগুলোতে আটকে পড়া প্রতিটি ভারতীয় নাগরিককে সুরক্ষিত রাখতে ভারত সরকার সমস্ত রকম কূটনৈতিক ও কৌশলগত পদক্ষেপ গ্রহণ করেছে। একটি স্বাধীন ও শক্তিশালী রাষ্ট্র হিসেবে আজকের ভারত যে বিপদের দিনে তার কোনো নাগরিককেই বিদেশের মাটিতে অসহায় অবস্থায় ফেলে রাখে না, সেই বার্তাই তাঁর বক্তব্যে ফুটে উঠেছে।
উপসাগরীয় দেশে আটকে পড়া প্রবাসীদের উদ্ধার ও সরকারি তৎপরতা
সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বিভিন্ন উপসাগরীয় দেশ (Gulf countries) এবং গোটা মধ্যপ্রাচ্য মিলিয়ে প্রায় ৯০ লক্ষ থেকে ১ কোটি ভারতীয় নাগরিক কর্মরত রয়েছেন। এরা মূলত নিজেদের এবং পরিবারের সচ্ছলতার আশায় সেখানে পাড়ি জমিয়েছেন। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর ভাষণে উল্লেখ করেছেন যে, যখনই দেশের কোনো নাগরিক বিদেশের মাটিতে বিপদে পড়েন, ভারত সরকার তাদের উদ্ধারে সর্বশক্তি প্রয়োগ করে। তিনি রাজ্যসভায় দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানান যে, এই সাম্প্রতিক যুদ্ধ পরিস্থিতি শুরু হওয়ার পর থেকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৩ লক্ষ ৭৫ হাজার ভারতীয়কে সম্পূর্ণ নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনা সম্ভব হয়েছে। কূটনৈতিক বিশেষজ্ঞদের মতে, মধ্যপ্রাচ্যে ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিশ্চিত করা এই মুহূর্তে বিদেশ মন্ত্রকের কাছে সবচেয়ে বড় ও গুরুত্বপূর্ণ চ্যালেঞ্জ।
এই তীব্র সংকটের মোকাবিলা করতে সম্প্রতি প্রধানমন্ত্রী মোদীর পৌরহিত্যে ‘ক্যাবিনেট কমিটি অন সিকিউরিটি’ (CCS)-এর একটি তিন ঘণ্টার দীর্ঘ জরুরি ও উচ্চপর্যায়ের বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। সেই বৈঠকে প্রতিরক্ষামন্ত্রী, স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এবং জাতীয় নিরাপত্তা উপদেষ্টারা উপস্থিত ছিলেন। সেখানে মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান পরিস্থিতি এবং ভারতীয়দের সুরক্ষার ব্লু-প্রিন্ট নিয়ে বিশদে আলোচনা করা হয়। এছাড়া, প্রধানমন্ত্রী ব্যক্তিগতভাবে মধ্যপ্রাচ্যের বিভিন্ন রাষ্ট্রনেতাদের সঙ্গে প্রতিনিয়ত যোগাযোগ রাখছেন এবং তাদের সহযোগিতার জন্য ধন্যবাদ জানিয়েছেন। ওই অঞ্চলের ভারতীয় দূতাবাসগুলো এখন দিনরাত ২৪ ঘণ্টা খোলা রয়েছে, যাতে যেকোনো জরুরি পরিস্থিতিতে প্রবাসী নাগরিকরা সরাসরি সাহায্য পেতে পারেন।
অর্থনৈতিক প্রভাব মোকাবিলা ও বিরোধীদের কড়া সমালোচনা
মধ্যপ্রাচ্যের এই যুদ্ধের কারণে বিশ্ববাজারে অপরিশোধিত তেল ও প্রাকৃতিক গ্যাসের সরবরাহে বড় ধরনের বিঘ্ন ঘটতে পারে বলে আশঙ্কা করা হচ্ছে। কারণ, সংঘাতের জেরে ইরান ইতিমধ্যেই কৌশলগতভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হরমুজ প্রণালী (Strait of Hormuz) বন্ধ করে দেওয়ার হুঁশিয়ারি দিয়েছে, যেখান দিয়ে বিশ্বের একটি বড় অংশের জ্বালানি বাণিজ্য হয়। এর ফলে ভারতের মতো দেশে, যা বহুলাংশে আমদানিকৃত তেলের ওপর নির্ভরশীল, সেখানে প্রবল মূল্যবৃদ্ধির আশঙ্কা রয়েছে। তবে প্রধানমন্ত্রী দেশবাসীকে আশ্বস্ত করে জানিয়েছেন যে, সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবার এবং কৃষকদের ওপর যাতে এই বিশ্বব্যাপী সংকটের কোনো সরাসরি অর্থনৈতিক প্রভাব না পড়ে, তার জন্য সরকার সবরকমের প্রয়োজনীয় আগাম ব্যবস্থা গ্রহণ করছে।
এর পাশাপাশি, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বিরোধী দল কংগ্রেসের তীব্র সমালোচনা করেছেন। তিনি কড়া ভাষায় অভিযোগ করেন যে, বিরোধীরা এই ধরনের একটি চরম স্পর্শকাতর ও জাতীয় নিরাপত্তার বিষয় নিয়ে সস্তা ভোটব্যাঙ্কের রাজনীতি করছে। কংগ্রেসের উদ্দেশ্যপ্রণোদিত বিভিন্ন ভিত্তিহীন মন্তব্য উপসাগরীয় দেশে কর্মরত প্রায় এক কোটি ভারতীয়ের জীবনকে বিপন্ন করে তুলতে পারে বলে তিনি সতর্কবার্তা দিয়েছেন। রাজনৈতিক মহলের একাংশের মতে, জাতীয় স্বার্থ এবং মধ্যপ্রাচ্যে ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে বিরোধীদের এই ধরনের দায়িত্বজ্ঞানহীন আচরণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। বিদেশের মাটিতে দেশের নাগরিকদের জীবন ও জীবিকার প্রশ্নটি নিয়ে কোনোভাবেই দলীয় রাজনীতি করা উচিত নয় বলে প্রধানমন্ত্রী মনে করিয়ে দিয়েছেন।
হাইলাকান্দি লালা বাজার ও বরাক উপত্যকার প্রবাসী পরিবারগুলোতে স্বস্তি
এই আন্তর্জাতিক সংঘাতের খবর শুধু দেশের রাজধানী বা বড় শহরগুলোতেই সীমাবদ্ধ নেই; এর গভীর প্রভাব এসে পড়েছে আমাদের আসামের বরাক উপত্যকার গ্রামীণ অর্থনীতিতেও। আমাদের হাইলাকান্দি জেলা এবং বিশেষ করে হাইলাকান্দি লালা বাজার, আলগাপুর, বা কাটলিছড়া সহ বিভিন্ন প্রান্ত থেকে হাজার হাজার তরুণ, শিক্ষিত যুবক ও শ্রমিক উন্নত জীবিকার সন্ধানে দুবাই, কাতার, সৌদি আরব এবং ওমানের মতো দেশগুলোতে কর্মরত রয়েছেন। উপত্যকার অর্থনীতি অনেকটাই এই প্রবাসীদের পাঠানো রেমিট্যান্স বা উপার্জিত বিদেশি মুদ্রার ওপর নির্ভরশীল। এখানকার শ্রমিকরা সেখানে নির্মাণ কাজ, সুপারমার্কেট বা ড্রাইভিংয়ের মতো নানা পেশার সঙ্গে যুক্ত থেকে দেশের অর্থনীতিতে বড় অবদান রাখছেন।
স্বভাবতই, টেলিভিশনের পর্দায় বা সোশ্যাল মিডিয়ায় মধ্যপ্রাচ্যের মিসাইল হামলা ও যুদ্ধের খবর দেখে লালা বাজার এলাকার প্রবাসী পরিবারগুলোতে চরম আতঙ্ক ও দুশ্চিন্তা দেখা দিয়েছিল। বাড়ির রোজগেরে সদস্য সেখানে কেমন আছে, নিরাপদে আছে কি না, তা নিয়ে পরিবারের বয়স্ক মা-বাবা ও স্ত্রী-সন্তানদের রাতের ঘুম উড়ে গিয়েছিল। ঠিক এমন এক চরম উদ্বেগের মুহূর্তে, দেশের প্রশাসনিক প্রধানের মুখ থেকে সরাসরি এই আশ্বাস—যে রাষ্ট্র তাদের সুরক্ষার ঢাল হয়ে দাঁড়িয়েছে—লালা শহরের প্রবাসী পরিবারগুলোর কাছে এক বিরাট মানসিক স্বস্তি বয়ে এনেছে। স্থানীয় বাসিন্দাদের বক্তব্য, সরকার যেভাবে কূটনৈতিক স্তরে তৎপরতা দেখাচ্ছে, তাতে সাধারণ মানুষের মনে এই ভরসা তৈরি হয়েছে যে পরিস্থিতি যতই খারাপ হোক না কেন, তাদের ঘরের ছেলেদের নিরাপদে ফিরিয়ে আনার পুরো দায়িত্ব রাষ্ট্র নেবে। তাই মধ্যপ্রাচ্যে ভারতীয়দের নিরাপত্তা নিয়ে প্রধানমন্ত্রীর এই গ্যারান্টি হাইলাকান্দির সাধারণ মানুষের কাছে অনেক বড় একটি পাওনা।
পরিশেষে, আজকের এই বিশ্বায়নের যুগে কোনো যুদ্ধই আর শুধুমাত্র দুটি দেশের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; তার সরাসরি প্রভাব এসে পড়ে হাজার হাজার কিলোমিটার দূরে বসে থাকা সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনেও। মধ্যপ্রাচ্যের বর্তমান উত্তপ্ত ভূ-রাজনৈতিক পরিস্থিতি আগামী দিনে কোন দিকে মোড় নেবে, তা নিশ্চিত করে বলা এই মুহূর্তে খুবই কঠিন। তবে ভারত সরকার যেভাবে প্রথম দিন থেকেই অত্যন্ত সতর্কতার সাথে গোটা পরিস্থিতির ওপর নজর রাখছে এবং কূটনৈতিক ভারসাম্য বজায় রেখে নিজেদের নাগরিকদের সুরক্ষার ওপর সর্বোচ্চ জোর দিচ্ছে, তা সত্যিই প্রশংসনীয়। এখন দেখার বিষয়, আগামী দিনগুলোতে যদি সংঘাত আরও ব্যাপক আকার ধারণ করে, তবে সরকার কত দ্রুত এবং কার্যকরীভাবে বাকি প্রবাসী ভারতীয়দের সম্পূর্ণ নিরাপদে দেশে ফিরিয়ে আনার জন্য কোনো মেগা ইভাকুয়েশন বা বড় মাপের উদ্ধার অভিযানের ঘোষণা করে কি না। গোটা দেশ এবং প্রতিটি প্রবাসী পরিবার এখন সেই দিকেই অধীর আগ্রহে তাকিয়ে আছে।