Read today's news --> Click here

দেশে পর্যাপ্ত পেট্রোল ডিজেল ও রান্নার গ্যাস মজুত রয়েছে, দেশবাসীকে আশ্বস্ত করল কেন্দ্র

সাম্প্রতিক সময়ে মধ্যপ্রাচ্যে ঘনিয়ে ওঠা চরম যুদ্ধ পরিস্থিতি এবং আন্তর্জাতিক স্তরে খনিজ তেলের সরবরাহে বিঘ্ন ঘটার গুজবের জেরে গোটা দেশজুড়ে এক ধরনের অঘোষিত আতঙ্ক তৈরি হয়েছিল। তবে দেশের সাধারণ মানুষকে সম্পূর্ণরূপে আশ্বস্ত করে কেন্দ্রীয় সরকার শনিবার স্পষ্টভাবে জানিয়ে দিয়েছে যে, ভারতজুড়ে পেট্রোল ডিজেল রান্নার গ্যাস বা এলপিজি (LPG)-এর কোনো প্রকার ঘাটতি নেই। কেন্দ্রীয় পেট্রোলিয়াম ও প্রাকৃতিক গ্যাস মন্ত্রকের (Ministry of Petroleum and Natural Gas) পক্ষ থেকে দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যে সম্পূর্ণ মজবুত রয়েছে, সেই বিষয়ে নিশ্চিত গ্যারান্টি দেওয়া হয়েছে। সরকারি বিবৃতিতে বলা হয়েছে যে, দেশের সমস্ত পরিশোধনাগার বা রিফাইনারিগুলি (Refineries) তাদের সর্বোচ্চ ক্ষমতায় কাজ করছে এবং আগামী দিনের জন্য প্রয়োজনীয় অপরিশোধিত তেল বা ক্রুড অয়েলের পর্যাপ্ত স্টক মজুত রয়েছে। একটি সুপরিকল্পিত মিথ্যা প্রচার চালিয়ে বাজারে যে কৃত্রিম হাহাকার তৈরির চেষ্টা চলছে, কেন্দ্র তা কড়া ভাষায় নস্যাৎ করেছে।

অযথা আতঙ্ক বা প্যানিক বায়িং এড়িয়ে চলার পরামর্শ

সোশ্যাল মিডিয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়া গুজবের কারণে গত কয়েকদিন ধরে দেশের বহু জায়গায় পেট্রোল পাম্প এবং গ্যাস ডিলারদের কাছে সাধারণ মানুষের লম্বা লাইন দেখা যাচ্ছিল। এই বিষয়টিতে সরাসরি হস্তক্ষেপ করে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক নাগরিকদের কাছে বিনীত অনুরোধ জানিয়েছে যে, তাঁরা যেন কোনোভাবেই গুজবে কান না দেন এবং অযথা আতঙ্কিত হয়ে ‘প্যানিক বায়িং’ (panic buying) বা অতিরিক্ত জ্বালানি মজুত করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকেন।

পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের যুগ্ম সচিব সুজাতা শর্মা সম্প্রতি নয়াদিল্লিতে আয়োজিত একটি আন্তঃমন্ত্রণালয় ব্রিফিংয়ে জানিয়েছেন, দেশের এক লক্ষেরও বেশি রিটেইল ফুয়েল আউটলেট বা পেট্রোল পাম্প সম্পূর্ণ স্বাভাবিকভাবে কাজ করছে এবং সেখানে পেট্রোল ও ডিজেলের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ অব্যাহত রয়েছে। পাশাপাশি, দেশজুড়ে পেট্রোল ডিজেল রান্নার গ্যাস-এর সরবরাহ স্বাভাবিক রাখতে সরকার একাধিক তৎপর পদক্ষেপ নিয়েছে। সরকারি তথ্য অনুযায়ী, গ্যাস সিলিন্ডারের অনলাইন বুকিং বর্তমানে ৯৫ শতাংশে পৌঁছে গেছে এবং প্যানিক অর্ডারের জেরে তৈরি হওয়া সাময়িক চাপ সামলে নিয়ে মাত্র এক দিনেই প্রায় ৫১ লক্ষ গার্হস্থ্য এলপিজি সিলিন্ডার সফলভাবে গ্রাহকদের বাড়িতে ডেলিভারি দেওয়া হয়েছে।

বিকল্প জ্বালানির ব্যবহার এবং কেজি সিলিন্ডারে ছাড়

জ্বালানি সংকট মোকাবিলার পাশাপাশি সরকার পরিবেশবান্ধব ও বিকল্প জ্বালানির ওপরও ব্যাপক জোর দিচ্ছে। পেট্রোলিয়াম মন্ত্রকের তরফ থেকে নাগরিকদের পাইপড ন্যাচারাল গ্যাস (PNG) বা পিএনজি এবং বৈদ্যুতিক ইন্ডাকশন কুকটপ (Electric cooktop) ব্যবহারের জন্য ব্যাপকভাবে উৎসাহিত করা হচ্ছে। সরকারি পরিসংখ্যান অনুযায়ী, গত মাস থেকে নতুন করে ৩.৫ লক্ষেরও বেশি পিএনজি সংযোগ দেওয়া হয়েছে এবং আরও প্রায় ৩.৮ লক্ষ নতুন গ্রাহক এই পরিবেশবান্ধব সংযোগের জন্য সফলভাবে নিজেদের নাম নথিভুক্ত করেছেন।

এর পাশাপাশি, দেশের সাধারণ এবং নিম্নবিত্ত মানুষের সুবিধার্থে সরকার একটি বড় ঘোষণা করেছে। মন্ত্রক জানিয়েছে যে, এখন থেকে ৫ কেজি ওজনের ছোট গ্যাস সিলিন্ডারগুলি স্থানীয় এলপিজি ডিস্ট্রিবিউটরদের কাছ থেকে খুব সহজেই কেনা যাবে এবং এর জন্য গ্রাহকের কোনো ঠিকানার প্রমাণপত্র বা অ্যাড্রেস প্রুফের প্রয়োজন হবে না। শুধুমাত্র যেকোনো একটি বৈধ সচিত্র পরিচয়পত্র (ID proof) দেখালেই এই সিলিন্ডার হাতে পাওয়া যাবে। গত মাসের ২৩ তারিখ থেকে ইতিমধ্যেই প্রায় ৫ লক্ষ ৭০ হাজার ৫ কেজি ওজনের এলপিজি সিলিন্ডার বিক্রি হয়েছে, যা প্রমাণ করে সাধারণ মানুষ সরকারের এই উদ্যোগে কতটা উপকৃত হচ্ছেন। প্রায় ২৬টি রাজ্য ইতিমধ্যেই ২২,০০০ টন কমার্শিয়াল বা বাণিজ্যিক এলপিজিও সফলভাবে বণ্টন করেছে, ফলে হোটেল ও রেস্তোরাঁ ব্যবসায়ীদের কোনো সমস্যায় পড়তে হচ্ছে না।

দেশের মজবুত তেল ভাণ্ডার শক্তিশালী রিফাইনারি ব্যবস্থা

বিশ্বের জ্বালানি মানচিত্রে ভারত বর্তমানে একটি অত্যন্ত শক্তিশালী ও সুরক্ষিত অবস্থানে রয়েছে। সরকারের পেশ করা তথ্য অনুযায়ী, পরিশোধিত পেট্রোলিয়াম পণ্য উৎপাদনের ক্ষেত্রে ভারত বর্তমানে বিশ্বের চতুর্থ বৃহত্তম রিফাইনার এবং পঞ্চম বৃহত্তম রপ্তানিকারক দেশ। বিশ্বের প্রায় ১৫০টি দেশে ভারত তার পরিশোধিত তেল রপ্তানি করে। তাই একটি নেট রপ্তানিকারক দেশ হওয়ার সুবাদে ভারতে অভ্যন্তরীণ ব্যবহারের জন্য পেট্রোল ডিজেল রান্নার গ্যাস-এর প্রাপ্যতা কাঠামোগতভাবেই অত্যন্ত সুরক্ষিত।

বর্তমানে ভারতের হাতে আপৎকালীন খনিজ তেলের রিজার্ভ ক্যাপাসিটি বা মজুত ক্ষমতা রয়েছে ৭৪ দিনের। মধ্যপ্রাচ্যে গত এক মাস ধরে চলা ভূ-রাজনৈতিক উত্তেজনার পরেও বর্তমানে দেশের হাতে অন্তত ৬০ দিনের অপরিশোধিত তেলের মজুত সুরক্ষিত রয়েছে। এছাড়া অভ্যন্তরীণ রান্নার গ্যাসের উৎপাদন প্রায় ৪০ শতাংশ বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা দেশের দৈনন্দিন চাহিদার ৬০ শতাংশেরও বেশি পূরণ করতে সক্ষম। অন্যান্য রাষ্ট্র থেকে অতিরিক্ত অপরিশোধিত তেলের কার্গো ইতিমধ্যেই ভারতের পথে রয়েছে।

বরাক উপত্যকা এবং হাইলাকান্দি লালা বাজারের পরিস্থিতি

জাতীয় স্তরের এই বড় খবর ও গুজবের সরাসরি প্রভাব আসামের বরাক উপত্যকাতেও এসে পড়েছিল। বিশেষ করে আসামের মতো রাজ্যে যেখানে ভৌগোলিক কারণ ও যোগাযোগ ব্যবস্থার জন্য নিত্যপ্রয়োজনীয় জিনিসপত্রের দাম খুব দ্রুত বাড়ে, সেখানে এই ধরনের জ্বালানি সংকটের গুজব সাধারণ মানুষের জন্য অত্যন্ত ক্ষতিকর। জ্বালানির সংকটের গুজব শুনে হাইলাকান্দি জেলা এবং বিশেষ করে আমাদের হাইলাকান্দি লালা বাজার এলাকার সাধারণ মানুষ ও গাড়িচালকদের মধ্যেও গত কয়েকদিনে চাপা আতঙ্ক দেখা দিয়েছিল। লালা টাউনের বিভিন্ন পেট্রোল পাম্পে বাইক, অটো ও ম্যাজিক চালকরা অতিরিক্ত তেল ভরার জন্য ভিড় জমাচ্ছিলেন।

তবে কেন্দ্র সরকারের এই সুস্পষ্ট ঘোষণার পর লালা বাজার এবং হাইলাকান্দির সাধারণ মানুষ স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলেছেন। স্থানীয় প্রশাসন এবং পেট্রোলিয়াম ডিলার্স অ্যাসোসিয়েশনের তরফ থেকেও জানানো হয়েছে যে, গুয়াহাটি এবং ডিগবয়ের তেলের ডিপোগুলি থেকে বরাক উপত্যকায় তেলের ট্যাঙ্কার চলাচল সম্পূর্ণ স্বাভাবিক রয়েছে। হাইলাকান্দি লালা বাজার এলাকার সাধারণ নাগরিকদের প্রতি প্রশাসনের স্পষ্ট বার্তা, তাঁরা যেন সোশ্যাল মিডিয়ায় ছড়ানো কোনো ভিত্তিহীন কথায় কান না দেন। আগামী দিনেও পেট্রোল ডিজেল রান্নার গ্যাস নিয়ে এই অঞ্চলে কোনো ঘাটতি বা সমস্যা দেখা দেবে না।

উপসংহারে বলা যায়, আন্তর্জাতিক বাজারে খনিজ তেলের দামের ওঠানামা একটি বিশ্বব্যাপী সমস্যা হলেও, ভারত সরকার তার সুদৃঢ় মজুত নীতি এবং দূরদর্শিতার মাধ্যমে দেশের অভ্যন্তরীণ বাজারকে সম্পূর্ণ সুরক্ষিত রাখতে পেরেছে। সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন জীবনে যাতে এর কোনো নেতিবাচক প্রভাব না পড়ে, তা নিশ্চিত করতে পেট্রোলিয়াম মন্ত্রক দিনরাত কাজ করে চলেছে। গুজব এড়িয়ে সরকারি তথ্যের ওপর ভরসা রাখাই এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় নাগরিক দায়িত্ব। পরিস্থিতি যাই হোক না কেন, দেশের জ্বালানি নিরাপত্তা যে কোনোভাবেই বিঘ্নিত হবে না, সরকারের এই আত্মবিশ্বাসী পদক্ষেপ তারই প্রমাণ।

দেশে পর্যাপ্ত পেট্রোল ডিজেল ও রান্নার গ্যাস মজুত রয়েছে, দেশবাসীকে আশ্বস্ত করল কেন্দ্র
Scroll to top