Read today's news --> Click here

আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী দুর্ঘটনা: জীবনযুদ্ধে এমবিএ পড়ুয়া, চিকিৎসার বিপুল খরচ জোগাতে ভরসা ক্রাউডফান্ডিং

গত ২৮ মার্চ রাতের এক মর্মান্তিক আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী দুর্ঘটনা গোটা বরাক উপত্যকার ছাত্রসমাজকে গভীরভাবে নাড়িয়ে দিয়েছে। শিলচরের প্রাণকেন্দ্র অম্বিকাপট্টি এলাকায় একটি বেপরোয়া দ্রুতগামী গাড়ির ধাক্কায় গুরুতরভাবে আহত হয়েছেন আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের (Assam University) বিজনেস অ্যাডমিনিস্ট্রেশন বিভাগের চূড়ান্ত বর্ষের এমবিএ (MBA) ছাত্রী রোজি দেব। বর্তমানে তিনি গুয়াহাটির অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অফ মেডিকেল সায়েন্সেস বা এইমস (AIIMS Guwahati)-এ জীবন-মৃত্যুর সঙ্গে আক্ষরিক অর্থেই পাঞ্জা লড়ছেন। এই ভয়াবহ ও মর্মান্তিক দুর্ঘটনার পর দোষীদের দৃষ্টান্তমূলক শাস্তির দাবির পাশাপাশি, রোজির চিকিৎসার বিপুল খরচ জোগাতে বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়ারা এবার ক্রাউডফান্ডিং (Crowdfunding)-এর পথ বেছে নিয়েছেন। সহপাঠীর প্রাণ বাঁচাতে রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মার কাছেও জরুরি আর্থিক সাহায্যের আকুল আবেদন জানিয়েছেন উদ্বিগ্ন ছাত্রছাত্রীরা। একটি সম্ভাবনাময় উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ কীভাবে এক মুহূর্তের অসতর্কতায় ধ্বংসের মুখে পড়তে পারে, এই ঘটনা তারই এক করুণ দৃষ্টান্ত।

শিলচরে আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী দুর্ঘটনা: ঠিক কী ঘটেছিল?

সূত্রের খবর, গত ২৮ মার্চ রাতে শিলচর শহরের অন্যতম ব্যস্ত অম্বিকাপট্টি (Ambicapatty) এলাকা দিয়ে নিজের টিউশন শেষে বাড়ি ফিরছিলেন বছর তেইশের তরুণী রোজি দেব। সেই সময়ই পিছন দিক থেকে আসা একটি অত্যন্ত দ্রুতগামী গাড়ি তাঁকে সজোরে ধাক্কা মারে এবং তাঁকে রাস্তায় ফেলে রেখে পালিয়ে যায়। প্রত্যক্ষদর্শীদের অভিযোগ, ঘাতক গাড়ির চালক মত্ত অবস্থায় ছিলেন এবং গাড়ির গতি স্বাভাবিকের চেয়ে অনেক বেশি ছিল। এই দুর্ঘটনার জেরে রোজির শরীরে মারাত্মক আঘাত লাগে।

হাসপাতাল সূত্রে ও চিকিৎসকদের বয়ান অনুযায়ী জানা গেছে যে, তাঁর মাথায় গভীর চোট (severe head trauma) লেগেছে, মেরুদণ্ড একাধিক জায়গায় ভেঙে গেছে এবং সারা শরীরে প্রায় ৮০টিরও বেশি সেলাই পড়েছে। প্রাথমিকভাবে দুর্ঘটনার পরপরই তাঁকে শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতালে (SMCH) ভর্তি করা হয়েছিল। কিন্তু তাঁর শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হওয়ায় এবং উন্নত নিউরোলজিক্যাল চিকিৎসার প্রয়োজনে তাঁকে দ্রুত গুয়াহাটির এইমসে (AIIMS) স্থানান্তরিত করা হয়। পুলিশ ইতিমধ্যেই এই ঘটনায় একটি মামলা (এফআইআর) দায়ের করেছে এবং এলাকার সিসিটিভি ফুটেজ খতিয়ে দেখে ঘটনার বিস্তারিত তদন্ত শুরু করেছে। তবে এই ঘটনার পর থেকে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসে তীব্র ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে। শিক্ষার্থীরা অবিলম্বে দোষী চালককে চিহ্নিত করে গ্রেপ্তার করার এবং কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়ার দাবিতে সরব হয়েছেন।

চিকিৎসার বিপুল খরচ এবং ক্রাউডফান্ডিং উদ্যোগ

গুয়াহাটিতে স্থানান্তরিত হলেও রোজির শারীরিক অবস্থা এখনও অত্যন্ত সঙ্কটাপন্ন। চিকিৎসকরা জানিয়েছেন, তাঁর জীবন রক্ষাকারী উন্নত অস্ত্রোপচার ও দীর্ঘমেয়াদি চিকিৎসার জন্য অন্তত ৫০ থেকে ৬০ লক্ষ টাকার প্রয়োজন। রোজির মতো একটি সাধারণ মধ্যবিত্ত পরিবারের পক্ষে এত অল্প সময়ের মধ্যে এই বিপুল পরিমাণ অর্থ জোগাড় করা কার্যত অসম্ভব। পরিবারের এই অসহায় অবস্থার কথা মাথায় রেখে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সংসদ (Assam University Students’ Union) এবং রোজির এমবিএ বিভাগের সহপাঠীরা সম্মিলিতভাবে একটি ব্যাপক ক্রাউডফান্ডিং (Crowdfunding) বা গণ-তহবিল সংগ্রহ অভিযান শুরু করেছেন।

ফেসবুক, ইনস্টাগ্রাম থেকে শুরু করে বিশ্ববিদ্যালয়ের বিভিন্ন হোয়াটসঅ্যাপ গ্রুপে রোজির জন্য আর্থিক সাহায্য চেয়ে আবেদন ছড়ানো হচ্ছে। কিউআর কোড (QR Code) ও ইউপিআই (UPI) এর মাধ্যমে যে যার সাধ্যমতো সাহায্য পাঠাচ্ছেন সাধারণ মানুষ। গত শুক্রবার যখন রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা নির্বাচনী প্রচারে শিলচর সফরে এসেছিলেন, তখন একদল উদ্বিগ্ন শিক্ষার্থী তাঁর সঙ্গে দেখা করার আপ্রাণ চেষ্টা করেন। পড়ুয়াদের এক প্রতিনিধি দল সংবাদমাধ্যমকে জানান, “রোজির অবস্থা খুবই সংকটজনক। আমরা মুখ্যমন্ত্রীর কাছে আবেদন জানাচ্ছি তিনি যেন তাঁর বিশেষ ত্রাণ তহবিল থেকে রোজির জীবন বাঁচাতে এই চিকিৎসার পুরো দায়িত্ব নেন। দরকারে উন্নত চিকিৎসার জন্য তাঁকে যেন রাজ্যের বা দেশের বাইরে পাঠানোর ব্যবস্থা করা হয়, আমরা সেই দাবিই রাখছি।”

সড়ক নিরাপত্তার অভাব প্রশাসনের নীরবতা

এই আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী দুর্ঘটনা শিলচর শহরের ভেঙে পড়া ট্রাফিক ব্যবস্থা ও সড়ক নিরাপত্তার অভাবকে আবার নতুন করে চোখে আঙুল দিয়ে দেখিয়ে দিয়েছে। রাতের বেলা শহরের বিভিন্ন রাস্তায় বেপরোয়া যান চলাচল, বিশেষ করে মদ্যপ অবস্থায় গাড়ি চালানোর প্রবণতা ইদানীং মারাত্মকভাবে বৃদ্ধি পেয়েছে। সাধারণ নাগরিকদের অভিযোগ, রাতের দিকে রাস্তায় পর্যাপ্ত ট্রাফিক পুলিশ বা নজরদারি না থাকার কারণেই অম্বিকাপট্টির মতো ব্যস্ত আবাসিক এলাকায় এমন দুর্ঘটনা ঘটতে পেরেছে।

আসামের আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে এই ঘটনাটি যুবসমাজের মধ্যে একটি বড় আলোচনার বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে। রাজনৈতিক দলগুলো যখন উন্নয়নের বড় বড় প্রতিশ্রুতি দিচ্ছে, তখন খোদ শহরের বুকেই একজন বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্রীর এমন মর্মান্তিক পরিণতি অনেককেই ক্ষুব্ধ করেছে। সাধারণ মানুষের প্রশ্ন, যেখানে রাজ্যের ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হিসেবে পরিচিত ছাত্রছাত্রীদেরই নিরাপত্তা নেই, সেখানে কিসের উন্নয়ন? প্রশাসনকে অবিলম্বে রাতের বেলায় ড্রিঙ্ক অ্যান্ড ড্রাইভ (Drink and Drive) রুখতে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে বলে দাবি উঠেছে গোটা বরাক জুড়ে।

বরাক উপত্যকা হাইলাকান্দি লালা বাজারের পড়ুয়াদের উদ্বেগ

আসাম বিশ্ববিদ্যালয় শুধুমাত্র শিলচরের নয়, এটি সমগ্র বরাক উপত্যকা এবং উত্তর-পূর্ব ভারতের অন্যতম প্রধান কেন্দ্রীয় বিশ্ববিদ্যালয়। কাছাড়, করিমগঞ্জ এবং হাইলাকান্দি—এই তিন জেলার হাজার হাজার ছেলেমেয়ে এখানে পড়াশোনা করেন। রোজি দেবের এই মর্মান্তিক আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী দুর্ঘটনা এর খবর ছড়িয়ে পড়ার পর হাইলাকান্দি জেলা এবং বিশেষ করে আমাদের হাইলাকান্দি লালা বাজার (Hailakandi Lala Bazar) এলাকার ছাত্রছাত্রী ও অভিভাবকমহলেও গভীর শোক ও চরম উদ্বেগের ছায়া নেমে এসেছে।

লালা টাউন থেকে প্রতিদিন বহু ছাত্রছাত্রী বাসে বা ট্রেনে করে শিলচরে যাতায়াত করেন। আবার অনেকেই শিলচরের মেহেরপুর, অম্বিকাপট্টি বা শিলংপট্টি এলাকায় মেস ও ভাড়াবাড়িতে থেকে পড়াশোনা করেন। লালা বাজার এলাকার যে সমস্ত পড়ুয়ারা আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াশোনা করেন, তাঁরাও এই ক্রাউডফান্ডিং উদ্যোগে সক্রিয়ভাবে অংশ নিচ্ছেন। অনেকেই নিজেদের হাতখরচ বাঁচিয়ে রোজির চিকিৎসার তহবিলে ইউপিআইয়ের মাধ্যমে অনুদান পাঠাচ্ছেন। লালা বাজারের এক স্থানীয় অভিভাবক সংবাদমাধ্যমের কাছে উদ্বেগ প্রকাশ করে বলেন, “আমাদের ছেলেমেয়েরাও পড়াশোনার জন্য শিলচরে থাকে। রোজির এই দুর্ঘটনার খবর শোনার পর থেকে আমরাও আতঙ্কে আছি। রাস্তাঘাটে যদি ন্যূনতম নিরাপত্তাই না থাকে, তবে ছেলেমেয়েদের উচ্চশিক্ষার জন্য শহরের বাইরে পাঠাব কীভাবে?”

এই মর্মান্তিক দুর্ঘটনা শুধুমাত্র একটি পরিবারের বিপর্যয় নয়, এটি গোটা সমাজের কাছে একটি সতর্কবার্তা। একটি তরুণ তাজা প্রাণ, যার সামনে একটি উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ অপেক্ষা করছিল, সে আজ হাসপাতালের বিছানায় যন্ত্রের সাহায্যে শ্বাস নিচ্ছে। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের পড়ুয়াদের এই মানবিক ও স্বতঃস্ফূর্ত উদ্যোগ প্রমাণ করে যে বিপদের দিনে ছাত্রসমাজই সমাজের সবচেয়ে বড় শক্তি এবং ভরসা। এখন দেখার বিষয়, রাজ্য সরকার এবং প্রশাসন পড়ুয়াদের এই আবেদনে সাড়া দিয়ে কতটা দ্রুত রোজির পরিবারের পাশে এসে দাঁড়ায় এবং ঘাতক চালকের বিরুদ্ধে দৃষ্টান্তমূলক আইনি পদক্ষেপ গ্রহণ করে। রোজি এই কঠিন জীবনযুদ্ধে জয়ী হয়ে খুব দ্রুত সুস্থ হয়ে তাঁর চেনা ক্যাম্পাসে ফিরে আসুক, লালা বাজার সহ সমগ্র বরাক উপত্যকার আপামর মানুষের এখন এটাই একমাত্র প্রার্থনা।

আসাম বিশ্ববিদ্যালয় ছাত্রী দুর্ঘটনা: জীবনযুদ্ধে এমবিএ পড়ুয়া, চিকিৎসার বিপুল খরচ জোগাতে ভরসা ক্রাউডফান্ডিং
Scroll to top