
আসামে আসন্ন বিধানসভা নির্বাচনের প্রাক্কালে রাজনৈতিক উত্তাপ ক্রমশ বেড়েই চলেছে । এর মধ্যেই আসাম নির্বাচন ডিপফেক ভিডিও বিতর্কে উত্তাল হয়ে উঠেছে রাজ্যের রাজনৈতিক মহল । গুয়াহাটি সেন্ট্রাল (Guwahati Central) কেন্দ্র থেকে আসাম জাতীয় পরিষদের (এজেপি) হয়ে লড়ছেন সাতাশ বছর বয়সী তরুণ প্রার্থী কুংকি চৌধুরী । সম্প্রতি সোশ্যাল মিডিয়ায় তাঁকে এবং তাঁর পরিবারকে নিশানা করে একাধিক ভুয়া বা ফেক ভিডিও ছড়িয়ে পড়ার পর তিনি পুলিশের দ্বারস্থ হয়েছেন । তিনি সরাসরি পুলিশে একটি অভিযোগ (এফআইআর) দায়ের করেছেন । তাঁর দাবি, কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা বা আর্টিফিশিয়াল ইন্টেলিজেন্স (এআই) ব্যবহার করে তৈরি করা এই ডিপফেক ভিডিওগুলোর মূল উদ্দেশ্য হলো নির্বাচনের ঠিক আগে জনসমক্ষে তাঁর ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ণ করা । আধুনিক প্রযুক্তির অপব্যবহার করে কীভাবে রাজনৈতিক ফায়দা লোটার চেষ্টা চলছে, গুয়াহাটির এই ঘটনা তারই একটি স্পষ্ট ও চাঞ্চল্যকর দৃষ্টান্ত।
আসাম নির্বাচন ডিপফেক ভিডিও: সোশ্যাল মিডিয়ায় পরিকল্পিত অপপ্রচার
বর্তমান ডিজিটাল যুগে সোশ্যাল মিডিয়া প্রচারের অন্যতম প্রধান হাতিয়ার হয়ে উঠলেও, এর অন্ধকার দিকটি এবার আসামের রাজনীতিতে ব্যাপকভাবে ফুটে উঠেছে। গুয়াহাটি সেন্ট্রাল কেন্দ্র থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতাকারী এজেপি প্রার্থী কুংকি চৌধুরী অভিযোগ করেছেন যে, বিরোধী শিবিরের লোকেরা অত্যন্ত পরিকল্পিতভাবে তাঁর বিরুদ্ধে এই অপপ্রচার চালাচ্ছে । এই ফেক ভিডিওগুলোতে তাঁকে এবং তাঁর পরিবারের সদস্যদের জড়িয়ে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন, মিথ্যা ও কুরুচিকর তথ্য উপস্থাপন করা হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন ।
পুলিশের কাছে দায়ের করা অভিযোগে এই তরুণ নেত্রী স্পষ্ট জানিয়েছেন যে, উন্নত প্রযুক্তির সাহায্যে তাঁর মুখাবয়ব ও কণ্ঠস্বর নকল করে এই ডিপফেক ভিডিওগুলি বানানো হয়েছে । তিনি ক্ষোভ প্রকাশ করে বলেন, “গণতন্ত্রে সুস্থ প্রতিযোগিতার জায়গা সবসময় রয়েছে, কিন্তু এআই প্রযুক্তির সাহায্যে একজন প্রার্থীর নামে এবং তাঁর পরিবারের বিরুদ্ধে এমন জঘন্য কুৎসা রটানো অত্যন্ত নিন্দনীয় অপরাধ।” পুলিশ ইতিমধ্যেই এই গুরুতর ঘটনার তদন্ত শুরু করেছে এবং সাইবার সেলের সাহায্য নিয়ে ভিডিওগুলির উৎস খোঁজার আপ্রাণ চেষ্টা চালাচ্ছে ।
গুয়াহাটি সেন্ট্রাল কেন্দ্রে হাড্ডাহাড্ডি লড়াই ও রাজনৈতিক প্রেক্ষাপট
গুয়াহাটি সেন্ট্রাল কেন্দ্রটি এবারের আসাম বিধানসভা নির্বাচনের অন্যতম হাই-প্রোফাইল আসন হিসেবে পরিচিত। এখানে লড়াই মূলত দুটি ভিন্ন প্রজন্মের । একদিকে রয়েছেন ভারতীয় জনতা পার্টির (বিজেপি) প্রবীণ ও দীর্ঘদিনের অভিজ্ঞ রাজনীতিবিদ বিজয় কুমার গুপ্তা, আর অন্যদিকে রয়েছেন জেন-জেড (Gen Z) বা আধুনিক প্রজন্মের বলিষ্ঠ প্রতিনিধি আসাম জাতীয় পরিষদের নেত্রী কুংকি চৌধুরী । রাজনীতিতে একেবারেই নতুন মুখ হওয়া সত্ত্বেও, তিনি খুব অল্প সময়ের মধ্যেই সাধারণ মানুষ এবং যুব সমাজের দৃষ্টি আকর্ষণ করতে সক্ষম হয়েছেন।
গত কয়েক সপ্তাহ ধরেই রাজ্যের মুখ্যমন্ত্রী ড. হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এবং তরুণ এই নেত্রীর মধ্যে প্রবল রাজনৈতিক বাগ্যুদ্ধ চলছিল । খোদ মুখ্যমন্ত্রীর তীক্ষ্ণ সমালোচনার মুখে দাঁড়িয়েও কুংকি চৌধুরী অত্যন্ত সাহসিকতার সাথে তাঁর নিজস্ব প্রচার চালিয়ে গেছেন । তাঁর প্রচারের মূল ফোকাস ছিল এলাকার সাধারণ মানুষের দৈনন্দিন সমস্যা সমাধান করা—যেমন নিকাশি ব্যবস্থার আমূল উন্নয়ন, সঠিক বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, যুবকদের জন্য দক্ষতা উন্নয়ন কেন্দ্র গড়ে তোলা, শহরের পার্কিং সমস্যার সমাধান এবং পানীয় জলের পাইপলাইনের দীর্ঘদিনের সমস্যা দূর করা । এজেপি প্রার্থী কুংকি চৌধুরী এর আগে সংবাদমাধ্যমকে জানিয়েছিলেন, “আমার প্রতি সাধারণ মানুষের অনেক প্রত্যাশা রয়েছে” এবং “তরুণ প্রজন্ম এই নির্বাচনে একটি নির্ণায়ক শক্তি হয়ে উঠবে” । রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের একাংশের মতে, তাঁর এই বাড়তে থাকা জনপ্রিয়তায় ঈর্ষান্বিত হয়েই কোনো একটি চক্র এখন ডিপফেক প্রযুক্তির মতো সাইবার অপরাধের রাস্তা বেছে নিয়েছে।
বরাক উপত্যকা, হাইলাকান্দি ও লালা বাজারের ভোটারদের জন্য সতর্কতা
গুয়াহাটি সেন্ট্রাল কেন্দ্রের এই চাঞ্চল্যকর ঘটনাটি শুধুমাত্র ব্রহ্মপুত্র উপত্যকার মধ্যে সীমাবদ্ধ কোনো সাধারণ রাজনৈতিক খবর নয়; এটি গোটা আসাম রাজ্যের ভোটারদের জন্যই একটি বড় সতর্কবার্তা। বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি জেলা এবং বিশেষ করে আমাদের হাইলাকান্দি লালা বাজার এলাকার সাধারণ মানুষকেও এই বিষয়ে এখন থেকেই অত্যন্ত সচেতন হতে হবে। বর্তমান সময়ে নির্বাচনের প্রচারণায় মোবাইল ফোন, বিশেষত হোয়াটসঅ্যাপ, ইনস্টাগ্রাম এবং ফেসবুকে প্রচুর রাজনৈতিক খবর, ছবি ও ভিডিও খুব দ্রুত শেয়ার করা হয়। গুয়াহাটির এই ঘটনা প্রমাণ করে যে, ডিজিটাল স্ক্রিনে যা দেখা যায়, তার সবকিছুই নিখাদ সত্য নয়।
হাইলাকান্দি লালা বাজার এলাকার শিক্ষিত সমাজ এবং যুব সম্প্রদায়কে এই ধরনের আধুনিক সাইবার অপরাধ সম্পর্কে আরও সতর্ক থাকতে হবে। কোনো রাজনৈতিক দলের কর্মী বা সাধারণ ভোটার হিসেবে কোনো চাঞ্চল্যকর ভিডিও বা খবর পাওয়ার পর, তার সত্যতা যাচাই না করে শেয়ার করা থেকে সম্পূর্ণ বিরত থাকতে হবে। আজ গুয়াহাটি সেন্ট্রাল কেন্দ্রে যা ঘটছে, আগামীকাল হাইলাকান্দি বা লালা শহরের কোনো প্রার্থীর ক্ষেত্রেও এমন সাইবার আক্রমণ ঘটতে পারে। স্থানীয় প্রশাসন এবং নির্বাচন কমিশনের উচিত শুধুমাত্র বড় শহর নয়, লালা টাউনের মতো গ্রামীণ ও আধা-শহরাঞ্চলেও ভোটারদের মধ্যে সাইবার সচেতনতা বৃদ্ধির জন্য দ্রুত পদক্ষেপ গ্রহণ করা।
আসন্ন নির্বাচন ও প্রশাসনের প্রতি সাধারণ মানুষের প্রত্যাশা
আগামী ৯ এপ্রিল আসাম বিধানসভার ১২৬টি আসনে একযোগে এক দফায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হতে চলেছে এবং আগামী ৪ মে ভোটের চূড়ান্ত ফলাফল ঘোষণা করা হবে । এই গুরুত্বপূর্ণ নির্বাচনের আগে সোশ্যাল মিডিয়ার এই ধরনের মারাত্মক অপব্যবহার রোধ করতে নির্বাচন কমিশনকে আরও কঠোর ও কার্যকরী পদক্ষেপ নিতে হবে বলে দাবি তুলছেন রাজ্যের বিশিষ্টজনেরা। ফেক নিউজ এবং ডিপফেক ভিডিওগুলো শুধুমাত্র ভোটারদের বিভ্রান্তই করে না, বরং একটি সুস্থ, নিরপেক্ষ ও অবাধ গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়াকে সম্পূর্ণভাবে কালিমালিপ্ত করে।
কুংকি চৌধুরীর এই নির্ভীক পদক্ষেপ আগামী দিনে আসামের সাইবার অপরাধীদের জন্য একটি কড়া আইনি বার্তা হতে পারে। তিনি নিজে যেমন কোনো হুমকিতে ভয় না পেয়ে সরাসরি আইনি লড়াইয়ের পথ বেছে নিয়েছেন, তেমনই তিনি রাজ্যের আপামর যুব সমাজকেও সত্যের পক্ষে শক্ত হয়ে দাঁড়ানোর আহ্বান জানিয়েছেন। এখন দেখার বিষয়, আসাম পুলিশ ও সাইবার সেল কত দ্রুত এই অপরাধীদের প্রযুক্তিগতভাবে চিহ্নিত করে আইনের আওতায় আনতে পারে। সাধারণ মানুষও গভীরভাবে আশা করছেন যে, খুব শিগগিরই আসল সত্য উন্মোচিত হবে এবং দোষীরা কঠোর থেকে কঠোরতম শাস্তি পাবে। আগামী ৯ তারিখের নির্বাচনে এই ডিপফেক ভিডিওর বিতর্ক ভোটারদের রায়ের ওপর কতটা প্রভাব ফেলে এবং তরুণ প্রজন্ম কাকে বেছে নেয়, তা জানতে ৪ মে পর্যন্ত অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করতেই হবে।