
৬ এপ্রিল, সোমবার, ভারতের তিনটি গুরুত্বপূর্ণ অঞ্চল—আসাম, কেরালা এবং পুদুচেরিতে বিধানসভা নির্বাচনের প্রচার চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছাল। আগামী ৯ এপ্রিল (বৃহস্পতিবার) এই তিন স্থানে এক দফায় ভোটগ্রহণ অনুষ্ঠিত হবে। মঙ্গলবার প্রচারের শেষ দিন হওয়ায় সব রাজনৈতিক দলের শীর্ষ নেতারা আসাম নির্বাচন শেষ মুহূর্তের প্রচার-এ নিজেদের সর্বশক্তি নিয়োগ করেছেন। আসামের ১২৬টি আসন, কেরালার ১৪০টি আসন এবং পুদুচেরির ৩০টি আসনে সাধারণ মানুষ তাঁদের গণতান্ত্রিক অধিকার প্রয়োগ করবেন। জাতীয় রাজনীতিতে এই নির্বাচনগুলো অত্যন্ত তাৎপর্যপূর্ণ, কারণ এর ফলাফল ২০২৬ সালের রাজনৈতিক সমীকরণকে গভীরভাবে প্রভাবিত করবে।
মোদীর ৩ সমাবেশ ও BJP-র ‘আত্মনির্ভর আসাম’-এর বার্তা
আসাম নির্বাচন শেষ মুহূর্তের প্রচার-এর অন্যতম প্রধান আকর্ষণ ছিলেন প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী (Narendra Modi)। সোমবার তিনি আসামের বরপেটা (Barpeta), হোজাই (Hojai) এবং ডিব্রুগড়ে (Dibrugarh) তিনটি বিশাল জনসভায় ভাষণ দেন। হোজাইয়ের সমাবেশে বক্তব্য রাখতে গিয়ে প্রধানমন্ত্রী স্পষ্ট ভাষায় জানান, আসামের প্রতিটি জেলার সুষম উন্নয়নই ভারতীয় জনতা পার্টি (BJP) এবং ন্যাশনাল ডেমোক্রেটিক অ্যালায়েন্স (NDA)-এর প্রধান অগ্রাধিকার। তিনি তীব্র ভাষায় কংগ্রেসকে আক্রমণ করে বলেন, কংগ্রেসের আমলে আসাম সবদিক থেকেই বঞ্চিত ছিল এবং তারা কেবল নিজেদের রাজনৈতিক স্বার্থসিদ্ধির জন্যই কাজ করেছে।
অন্যদিকে বরপেটার সমাবেশে প্রধানমন্ত্রী বলেন, দেশের পাশাপাশি আসামকে স্বাবলম্বী এবং উন্নত করাই তাঁদের প্রধান লক্ষ্য। তিনি দাবি করেন, গত ১০ বছরে আসামে শান্তি ও সমৃদ্ধির এক নতুন যুগের সূচনা হয়েছে। বিগত দিনের অস্থিরতা কাটিয়ে রাজ্যটি এখন উন্নয়নের পথে হাঁটছে। প্রধানমন্ত্রীর এই তিনটি সভা নরেন্দ্র মোদী আসাম সমাবেশ হিসেবে গোটা রাজ্যের রাজনৈতিক মহলে ব্যাপক আলোড়ন সৃষ্টি করেছে।
কংগ্রেসের পাল্টা তোপ এবং আঞ্চলিক দলগুলোর তৎপরতা
শাসক দল যখন উন্নয়নের খতিয়ান তুলে ধরছে, তখন পিছিয়ে নেই প্রধান বিরোধী দল কংগ্রেসও। গুয়াহাটিতে (Guwahati) আয়োজিত একটি সাংবাদিক সম্মেলনে প্রবীণ কংগ্রেস নেত্রী কুমারী শৈলজা (Kumari Selja) অভিন্ন দেওয়ানি বিধি (Uniform Civil Code – UCC) ইস্যুতে BJP-কে তীব্র আক্রমণ করেন। তিনি অভিযোগ করেন যে, নির্বাচনের সময় এলেই শাসক দল উদ্দেশ্যপ্রণোদিতভাবে এই ধরনের বিতর্কিত বিষয়গুলো সামনে নিয়ে আসে, যাতে সাধারণ মানুষের মধ্যে মেরুকরণ ও বিভাজন তৈরি করা যায়। তাঁর মতে, কংগ্রেস সর্বদা সবার জন্য ন্যায়বিচার এবং সমান অধিকারের পক্ষে দাঁড়িয়েছে।
কংগ্রেস এবং BJP-র এই দ্বিমুখী লড়াইয়ের পাশাপাশি, আসামের আঞ্চলিক দলগুলোও মাঠে বেশ সক্রিয়। অসম গণ পরিষদ (Asom Gana Parishad – AGP), আসাম জাতীয় পরিষদ (Assam Jatiya Parishad – AJP) এবং রাইজর দলের (Raijor Dal) মতো আঞ্চলিক শক্তিগুলোও ভোটারদের মন জয় করতে প্রচার অভিযান জোরদার করেছে। প্রচারের শেষ বেলায় এসে প্রতিটি দলই তাদের নিজস্ব ইশতেহার ও প্রতিশ্রুতির কথা তুলে ধরছে।
কেরালা, পুদুচেরি এবং পশ্চিমবঙ্গের নির্বাচনী চিত্র
শুধু আসাম নয়, কেরালা পুদুচেরি ভোট প্রচার-ও সোমবার ছিল একেবারে তুঙ্গে। পুদুচেরিতে এদিন প্রচারের ঝড় তোলেন রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi), কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah) এবং তামিলনাড়ুর মুখ্যমন্ত্রী এম. কে. স্ট্যালিন (M. K. Stalin)। কংগ্রেস পুদুচেরিতে তাদের ইশতেহার প্রকাশ করেছে, যেখানে রাজ্যের পূর্ণাঙ্গ মর্যাদা, কেন্দ্র থেকে নেওয়া ঋণ মকুব, ৩০,০০০ কর্মসংস্থান এবং বেকার যুবকদের জন্য মাসিক ২,০০০ টাকা ভাতার প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছে।
কেরালাতেও রাজনৈতিক উত্তেজনা চরমে। সেখানে অমিত শাহ হরিপাডে (Haripad) একটি মেগা রোডশো করেন। কেরালার মুখ্যমন্ত্রী পিনারাই বিজয়ন (Pinarayi Vijayan) তাঁর সরকারের উন্নয়নের ‘প্রোগ্রেস কার্ড’ প্রকাশ করেন এবং কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধী বঢরা (Priyanka Gandhi Wadra) কারাসেরি ও থিরুভামবাডিতে প্রচার সভা করেন। এদিকে, তামিলনাড়ুর ২৩৪টি আসন এবং পশ্চিমবঙ্গের প্রথম দফার ১৫২টি আসনের জন্য মনোনয়ন জমা দেওয়ার প্রক্রিয়া সোমবারই শেষ হয়েছে। ২৩ এপ্রিল এই দুই রাজ্যে ভোটগ্রহণ হবে বলে জানিয়েছে নির্বাচন কমিশন।
লালা ও হাইলাকান্দিতে প্রচারের উত্তাপ ও স্থানীয় প্রভাব
জাতীয় ও রাজ্য স্তরের এই প্রচারের ঢেউ সরাসরি এসে পড়েছে বরাক উপত্যকায়। হাইলাকান্দি লালা নির্বাচন প্রস্তুতি এখন একেবারে শেষ পর্যায়ে। আগামী ৯ এপ্রিল আসামের অন্যান্য অংশের সাথে হাইলাকান্দি জেলার আসনগুলোতেও ভোটগ্রহণ হবে। মঙ্গলবার প্রচারের মাইক স্তব্ধ হওয়ার আগে লালা টাউনের (Lala Town) অলিগলিতে স্থানীয় প্রার্থীরা ভোটারদের দুয়ারে দুয়ারে ঘুরছেন।
লালা বাজারের ব্যবসায়িক মহল থেকে শুরু করে সাধারণ চা-বাগান শ্রমিক—সবার মধ্যেই এখন ভোটের আলোচনা। হাইলাকান্দি কেন্দ্রে মূল লড়াইয়ে থাকা প্রার্থীরা জাতীয় নেতাদের বার্তার পাশাপাশি স্থানীয় সমস্যা—যেমন রাস্তার বেহাল দশা, পানীয় জলের সমস্যা এবং বেকারত্ব নিয়ে সরব হয়েছেন। আসাম নির্বাচন শেষ মুহূর্তের প্রচার-এ শাসক দল যেখানে ডাবল ইঞ্জিন সরকারের সুবিধা বোঝাচ্ছে, সেখানে বিরোধীরা স্থানীয় স্তরের বঞ্চনাকে হাতিয়ার করেছে। লালার মানুষ অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করছেন ৯ তারিখের জন্য, যেদিন তাঁরা তাঁদের ভোটাধিকার প্রয়োগ করে নিজেদের জনপ্রতিনিধি বেছে নেবেন।
সব মিলিয়ে, প্রচারের এই শেষ মুহূর্তগুলো রাজ্য ও জাতীয় রাজনীতির ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি নির্ণায়ক ভূমিকা পালন করবে। মঙ্গলবার প্রচার শেষ হওয়ার পর শুরু হবে নীরব চিন্তনের সময়। আগামী বৃহস্পতিবার আসাম, কেরালা এবং পুদুচেরির লক্ষ লক্ষ ভোটার ইভিএম (EVM)-এ বোতাম টিপে তাঁদের চূড়ান্ত রায় জানাবেন। কার প্রতিশ্রুতিতে মানুষ বেশি ভরসা রাখলেন—উন্নয়ন নাকি পরিবর্তনের ডাক—তা জানতে এখন শুধু ৪ মে-র ফলাফল ঘোষণার অপেক্ষা। তবে তার আগে, প্রচারের শেষ দিনে লালা ও সমগ্র হাইলাকান্দি সহ গোটা রাজ্যে রাজনৈতিক উত্তাপ যে তার চরমে পৌঁছবে, তা নিশ্চিতভাবেই বলা যায়।