
৬ এপ্রিল, সোমবার, আসামের ধুবড়িতে তীর জুয়া চক্র ফাঁস করে এক ব্যক্তিকে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করল আসাম পুলিশ। এদিন বিকেল নাগাদ ধুবড়ি শহরের পুরনো আদালত ভবনের (Old Court Building) ঠিক পাশেই চলছিল এই অবৈধ আর্চারি-ভিত্তিক জুয়া বা ‘তীর খেলা’। গোপন সূত্রের খবরের ভিত্তিতে আসাম পুলিশের একটি বিশেষ দল এই সফল অভিযান চালায়। এই ঘটনা আবারও প্রমাণ করল যে রাজ্যের বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষ করে জনবহুল ও গুরুত্বপূর্ণ সরকারি এলাকার আশেপাশে, বেআইনি জুয়ার জাল কতটা গভীরে ছড়িয়েছে। এই খবর লালা ও হাইলাকান্দির মতো শহরের জন্যও অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এই ধরনের জুয়া চক্র প্রায়শই ছোট শহরগুলোকে তাদের প্রধান লক্ষ্যবস্তু বানায় l
ধুবড়িতে তীর জুয়া চক্র: পুলিশের ঝটিকা অভিযান ও উদ্ধারকৃত সামগ্রী
সোমবার বিকেল প্রায় ৩:৫০ মিনিট নাগাদ ধুবড়ি থানার পুলিশ এই অভিযান চালায়। পুলিশি সূত্রে জানা গেছে, ওই এলাকায় দীর্ঘদিন ধরে জুয়ার আসর বসার বিষয়ে তাদের কাছে সুনির্দিষ্ট গোয়েন্দা তথ্য ছিল। সেই তথ্যের ভিত্তিতেই পুলিশ সেখানে হানা দেয়। ঘটনাস্থল থেকে আজল হক (Azal Hoque) নামের ৩০ বছর বয়সী এক যুবককে হাতেনাতে গ্রেপ্তার করা হয়। পুলিশ জানিয়েছে, আজল হকের বাড়ি দক্ষিণ শালমারা-মানকাচর জেলার (South Salmara-Mankachar district) ফকিরগঞ্জ থানার অন্তর্গত চালাকুরা পার্ট-৪ (Chalakura Part-IV) এলাকায়। সে মূলত একজন এজেন্ট বা বুকি হিসেবে সেখানে কাজ করছিল।
অভিযানের সময় পুলিশ আজল হকের কাছ থেকে নগদ ৫,৫৭০ টাকা উদ্ধার করে, যা ওই দিনের জুয়ার আসর থেকে উপার্জিত বলে মনে করা হচ্ছে। এর পাশাপাশি, ‘তীর জুয়া’ (Teer Juwa)-র লেনদেনের বিস্তারিত হিসাব লেখা দুটি খাতা (notebooks) এবং একটি স্মার্টফোন বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে। পুলিশের ধারণা, এই মোবাইল ফোনে জুয়ার বৃহত্তর নেটওয়ার্ক এবং অন্যান্য এজেন্টদের সম্পর্কে অনেক গুরুত্বপূর্ণ ডিজিটাল তথ্য লুকিয়ে আছে, যা তদন্তে বড় সাহায্য করবে।
আসামে তীর খেলা বেআইনি: কীভাবে চলে এই অবৈধ কারবার?
প্রতিবেশী রাজ্য মেঘালয়ে তীর খেলা বা আর্চারি বেটিং আইনত বৈধ হলেও, আসামে এটি সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। তা সত্ত্বেও, তীর খেলা বেআইনি জেনেও রাজ্যের বিভিন্ন জেলায় গোপনে এই জুয়ার আসর বসানো হয়। এই খেলায় মূলত তীরন্দাজরা কতগুলো তীর লক্ষ্যবস্তুতে বিদ্ধ করল, তার শেষ দুটি সংখ্যার ওপর বাজি ধরা হয়। আসামের বুকিরা মেঘালয়ের নির্দিষ্ট কাউন্টারগুলোর সঙ্গে যোগাযোগ রাখে এবং সেখানে ফলাফল ঘোষণার সঙ্গে সঙ্গেই আসামে বসে থাকা জুয়াড়িরা তাদের জেতা বা হারা টাকার হিসাব পায়।
পুলিশ জানিয়েছে, ধুবড়িতে তীর জুয়া চক্র এবং অন্যান্য অবৈধ বাণিজ্যের বিরুদ্ধে তাদের ধারাবাহিক অভিযানের অংশ হিসেবেই এই পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। রাজ্যের বিভিন্ন স্থানে চা-বাগান, পান দোকান বা রাস্তার ধারের ছোট চায়ের দোকানগুলোকে এই বুকিরা তাদের গোপন আস্তানা হিসেবে ব্যবহার করে। সাধারণ মানুষের চোখে ধুলো দিয়ে দিনের পর দিন এই কারবার চলতে থাকে।
ডিজিটাল জুয়ার ফাঁদ ও সমাজের দরিদ্র শ্রেণির দুর্দশা
সাম্প্রতিক বছরগুলোতে আসাম পুলিশ অভিযান জোরদার হওয়ায় জুয়াড়িরাও নিজেদের কৌশল বদলেছে। এখন আর শুধু রাস্তার ধারে দাঁড়িয়ে টিকিট বিক্রি হয় না, বরং WhatsApp, Telegram এবং Facebook-এর মতো ডিজিটাল প্ল্যাটফর্ম ব্যবহার করে বুকিরা তীরের নম্বর আদানপ্রদান করছে। ধুবড়ি পুলিশের হাতে ধৃত আজল হকের মোবাইল ফোনটি ঘেঁটে পুলিশ এই ডিজিটাল নেটওয়ার্কের অন্যান্য বুকিদের সন্ধান পাওয়ার চেষ্টা করছে।
এই ধরনের বেআইনি জুয়া মূলত সমাজের অর্থনৈতিকভাবে দুর্বল ও দরিদ্র শ্রেণির মানুষদের টার্গেট করে। দিনমজুর, রিকশাচালক ও নিম্ন আয়ের মানুষরা দ্রুত বড়লোক হওয়ার আশায় এই ফাটকা বা বাজিতে নিজেদের কষ্টার্জিত অর্থ বিনিয়োগ করে এবং শেষ পর্যন্ত সর্বস্বান্ত হয়। ধুবড়ির স্থানীয় বাসিন্দারা পুলিশের এই পদক্ষেপকে ব্যাপকভাবে সমর্থন করেছেন। তাঁদের মতে, আদালত চত্বরের মতো একটি গুরুত্বপূর্ণ সরকারি প্রতিষ্ঠানের কাছে এ ধরনের জুয়ার আসর বসলে এলাকায় চুরি-ছিনতাইয়ের মতো ছোটখাটো অপরাধ বৃদ্ধি পায় এবং সামাজিক পরিবেশ নষ্ট হয়।
বরাক উপত্যকা ও লালা টাউনের জন্য সতর্কবার্তা
ধুবড়ির এই ঘটনা বরাক উপত্যকা তথা হাইলাকান্দি জেলার সাধারণ মানুষ এবং প্রশাসনের জন্যও একটি বড় সতর্কবার্তা। হাইলাকান্দি লালা জুয়া এবং বিভিন্ন অনলাইন বাজির ফাঁদে পড়ে এখানকার অনেক যুবকও সর্বস্বান্ত হচ্ছেন, যা নিয়ে স্থানীয় মহলে গভীর উদ্বেগ রয়েছে। এর আগে হাইলাকান্দি পুলিশ লালা শহরে অভিযান চালিয়ে বেশ কয়েকটি অনলাইন জুয়া চক্রের পর্দাফাঁস করেছিল এবং বেআইনি অস্ত্রসহ অপরাধীদের গ্রেপ্তার করেছিল।
বরাক উপত্যকায়ও ‘শিলং তীর’-এর টিকিট বিক্রি গোপনে চলে বলে দীর্ঘদিনের অভিযোগ রয়েছে। লালা বাজার, স্টেশন রোড বা অন্যান্য গ্রামীণ এলাকার ছোট ছোট দোকানগুলোকে অনেক সময় এই ধরনের অসাধু কাজের ঢাল হিসেবে ব্যবহার করা হয়। ধুবড়িতে পুলিশের এই কড়া পদক্ষেপ প্রমাণ করে যে প্রশাসন জুয়াড়িদের কোনোভাবেই ছাড় দিতে নারাজ। লালা টাউনের সচেতন নাগরিকদের দাবি, হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসন এবং লালা পুলিশকেও স্থানীয় বাজার ও এর আশেপাশের এলাকায় এ ধরনের সন্দেহভাজন কার্যকলাপের ওপর নিয়মিত নজরদারি চালাতে হবে। বিশেষ করে যুবসমাজ যাতে এই সর্বনাশা নেশার ফাঁদে পা না দেয়, তার জন্য সামাজিক সচেতনতা বৃদ্ধি করা অত্যন্ত জরুরি।
আপাতত ধৃত আজল হক পুলিশি হেফাজতে রয়েছে এবং এই জুয়া চক্রের সঙ্গে জড়িত মূল মাথাদের বা “মাস্টারমাইন্ড”দের ধরতে পুলিশের চিরুনি তল্লাশি অব্যাহত রয়েছে। বেআইনি জুয়া সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে যে পচন ধরিয়ে দিচ্ছে, তা নির্মূল করতে পুলিশ ও সাধারণ মানুষ উভয়কেই কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করতে হবে। ধুবড়ির এই সফল পুলিশি অভিযান অন্যান্য জেলার জুয়াড়িদের জন্যও একটি অত্যন্ত স্পষ্ট বার্তা যে, আইনের হাত থেকে তারা বেশিদিন নিজেদের লুকিয়ে রাখতে পারবে না।