
অসম বিধানসভা নির্বাচনের আগে শেষ মুহূর্তের প্রচারে বরাক উপত্যকায় নামলেন কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী অমিত শাহ (Amit Shah)। মঙ্গলবার সকালে তিনি শ্রীভূমি জেলার পাথরকান্দিতে (Patharkandi) একটি বড় নির্বাচনী জনসভায় ভাষণ দেন । এই অমিত শাহ পাথরকান্দি সভায় তিনি কংগ্রেসের বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ করেন এবং স্পষ্ট জানিয়ে দেন যে BJP অসমকে কোনো দিন “অনুপ্রবেশকারী-অধ্যুষিত রাজ্য”-তে পরিণত হতে দেবে না । পাথরকান্দি থেকে তিনি একই দিনে হাইলাকান্দি এবং শিলচরেও দলীয় প্রার্থীদের সমর্থনে সভা করেন, যার প্রস্তুতিতে এর আগেই সমগ্র বরাক উপত্যকায় কড়া নিরাপত্তা ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছিল ।
অনুপ্রবেশকারী বিতাড়নের শপথ এবং কংগ্রেসকে আক্রমণ
পাথরকান্দির জনসমাবেশে অমিত শাহ কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধীকে (Rahul Gandhi) সরাসরি নিশানা করে দাবি করেন যে কংগ্রেস দশকের পর দশক ধরে অবৈধ অনুপ্রবেশকারীদের আশ্রয় দিয়ে রাজ্যের জনবিন্যাস পরিবর্তন করেছে এবং তাদের ভোটব্যাঙ্ক হিসেবে ব্যবহার করেছে । কেন্দ্রীয় স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী বলেন, “আমরা অসমকে অনুপ্রবেশকারী-অধ্যুষিত অঞ্চলে পরিণত হতে দেব না।” তিনি আরও যোগ করেন, “আমরা ইতিমধ্যে অনুপ্রবেশকারীদের চিহ্নিত করে নিয়েছি। এখন একে একে তাদের বিতাড়িত করার সময় এসেছে। BJP সরকারকে ভোট দিন।”
শাহ জানান, অসম, পশ্চিমবঙ্গ এবং ত্রিপুরায় একসাথে BJP সরকার থাকলে তিনটি রাজ্যের সমন্বিত প্রশাসনের মাধ্যমে অনুপ্রবেশ সম্পূর্ণভাবে রোধ করা সম্ভব হবে । তিনি দাবি করেন, কংগ্রেস আমলে অনুপ্রবেশ বিরোধী আগের আইনগুলো বাতিল করে এমন নীতি চালু করা হয়েছিল যা অনুপ্রবেশকারীদের সুবিধা দিয়েছিল । তাঁর কথায়, কংগ্রেস এই সমস্যাকে সাম্প্রদায়িক রঙ দেওয়ার চেষ্টা করছে। কিন্তু অপর একটি সভায় এপ্রিলের গোড়ায় তিনি এ বিষয়ে স্পষ্ট বলেছিলেন, “BJP অনুপ্রবেশকারীদের বিরুদ্ধে, অসমের ভূমিপুত্র মুসলিমদের বিরুদ্ধে নয়।”
শ্রীভূমি নামকরণ, CAA এবং ক্লাসিক্যাল ভাষার মর্যাদা
অমিত শাহ পাথরকান্দি সভায় সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রশ্নটিকেও জোরালোভাবে তুলে ধরেন। তিনি দাবি করেন যে একমাত্র BJP-ই করিমগঞ্জ জেলার নাম “শ্রীভূমি” (Sribhumi) করার সংকল্প নিয়েছে এবং এই প্রতিশ্রুতি বাস্তবায়ন করার ক্ষমতা ও সদিচ্ছা শুধুমাত্র BJP সরকারেরই রয়েছে । এর পাশাপাশি তিনি প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীকে (Narendra Modi) কৃতিত্ব দেন যে তাঁর সরকারই অসমিয়া ও বাংলা ভাষাকে ভারতের ক্লাসিক্যাল ভাষার মর্যাদা দিয়েছে, যা বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী জনগোষ্ঠীর কাছে একটি গুরুত্বপূর্ণ প্রাপ্তি ।
নাগরিকত্ব সংশোধনী আইন (CAA) প্রসঙ্গে শাহ আবারও কংগ্রেসকে কাঠগড়ায় দাঁড় করান। তাঁর দাবি, কংগ্রেস নিছক রাজনৈতিক কারণে CAA-র বিরোধিতা করে চলেছে। তিনি বলেন, এই আইন প্রতিবেশী দেশগুলিতে ধর্মীয় নিপীড়নের শিকার সংখ্যালঘুদের ন্যায্য সুরক্ষা দেওয়ার জন্যই তৈরি করা হয়েছে এবং বিরোধীদের এই প্রচারণা মানুষকে বিভ্রান্ত করার একটি রাজনৈতিক কৌশল মাত্র । কংগ্রেস সভাপতি মল্লিকার্জুন খাড়গের সাম্প্রতিক কিছু মন্তব্যকেও “অগণতান্ত্রিক” আখ্যা দিয়ে আক্রমণ করেন শাহ ।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকায় তিন সভার বিশেষ গুরুত্ব
পাথরকান্দির পর অমিত শাহ একই দিনে হাইলাকান্দি এবং শেষে শিলচরের পুলিশ গ্রাউন্ডে একটি মেগা সভায় ভাষণ দেন । কাছাড়ের মন্ত্রী কৌশিক রায়ের (Kaushik Rai) দেওয়া তথ্য অনুযায়ী, শিলচরের সভাটি শিলচর ও উধারবন্দ উভয় কেন্দ্রের ভোটারদের উদ্দেশ্যে আয়োজন করা হয়েছিল । হাইলাকান্দি জেলার লালা শহর সহ সমগ্র বরাক উপত্যকায় এই তিনটি সভাকে BJP-র সর্বোচ্চ মাত্রার কেন্দ্রীয় প্রচার উদ্যোগ হিসেবে দেখা হচ্ছে। উল্লেখ্য, শ্রীভূমি জেলার নামকরণ এবং CAA নিয়ে শাহের বক্তব্য হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জের বাংলাভাষী হিন্দু সমাজের কাছে একটি সরাসরি রাজনৈতিক বার্তা। এই অঞ্চলের মানুষের একটি বড় অংশ এই দুটি ইস্যুতে অত্যন্ত সংবেদনশীল এবং BJP এই ইস্যুগুলিকে সামনে রেখেই এবারের ভোটে নিজেদের পার্থক্য তুলে ধরতে চাইছে।
৯ এপ্রিলের ভোটে বরাক উপত্যকার দিকে সবার নজর
অসমের ১২৬ আসনের বিধানসভায় ৯ এপ্রিল ভোট এবং ৪ মে ফলাফল ঘোষণার কথা। শেষ পর্যন্ত অনুপ্রবেশ বিতাড়ন, CAA বাস্তবায়ন এবং শ্রীভূমি নামকরণ — এই তিনটি প্রতিশ্রুতির ভিত্তিতে BJP কতটা ভোট টানতে পারে, তা জানা যাবে ৪ মে। হাইলাকান্দি ও পাথরকান্দির মতো কেন্দ্রগুলিতে BJP-র এই প্রচারের ফল কতটা মেলে, সেটা দেখার অপেক্ষায় রয়েছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।