
আসাম বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণের মাত্র একদিন আগে, ৮ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা (Himanta Biswa Sarma) গোমাংস খাওয়া সম্পর্কে তাঁর সরকারের অবস্থান সরাসরি স্পষ্ট করে দিয়েছেন। হিমন্ত গোমাংস বিতর্ক আসাম নির্বাচন-এ একটি কেন্দ্রীয় ইস্যু হয়ে ওঠার প্রেক্ষাপটে তিনি সাংবাদিকদের বলেন যে তিনি গোমাংস সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ করতে চাইছেন না, তবে জনপরিসরে এর ব্যবহার বন্ধ রাখার পক্ষে। India Today এবং Moneycontrol-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, হিমন্ত বলেছেন, “আসামে একটি বড় মুসলিম সম্প্রদায় আছে যারা গোমাংস খান। আমি এটি বন্ধ করছি না। আমি শুধু বলছি, বাড়ির ভেতরে খান। পাবলিক স্পেসে খাবেন না।” এই মন্তব্য ভোটের ঠিক আগে রাজ্যের রাজনৈতিক আলোচনায় নতুন মাত্রা যোগ করেছে।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা আরও উল্লেখ করেছেন যে অনেকে ইতিমধ্যে গরুর মাংসের পরিবর্তে মহিষের মাংস (buffalo meat) খাওয়া শুরু করেছেন এবং এই পরিবর্তন তাঁর আবেদনের ফলেই হয়েছে বলে তিনি দাবি করেছেন। তিনি পরিষ্কার করেছেন যে তাঁর এই আবেদন মূলত হিন্দু সম্প্রদায়ের প্রতি, মুসলিমদের প্রতি নয়।
আসাম গবাদিপশু সংরক্ষণ আইন ২০২১ এবং পাবলিক স্পেসে নিষেধাজ্ঞার পটভূমি
আসাম গবাদিপশু সংরক্ষণ আইন ২০২১ (Assam Cattle Preservation Act, 2021) বিষয়টির আইনি ভিত্তি বোঝার জন্য গুরুত্বপূর্ণ। এই আইন অনুযায়ী, মন্দির বা সত্র (Vaishnavite monastery)-এর ৫ কিলোমিটারের মধ্যে গোমাংস বিক্রি ও ক্রয় নিষিদ্ধ এবং হিন্দু, জৈন, শিখ ও অন্যান্য অমাংসভোজী সম্প্রদায়ের প্রাধান্যমূলক এলাকায় গোমাংস বিক্রি নিষিদ্ধ। তবে এই আইন ব্যক্তিগত পরিসরে গোমাংস খাওয়া নিষিদ্ধ করে না — এটি India Today-এর প্রতিবেদনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ করা হয়েছে।
এর পরবর্তী পদক্ষেপ হিসেবে ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হিমন্ত সরকার এই বিধিনিষেধ আরও বিস্তৃত করে। Hindustan Times এবং NDTV-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৪ সালে রাজ্য মন্ত্রিসভার সিদ্ধান্তে রেস্তোরাঁ, হোটেল এবং সমস্ত পাবলিক অনুষ্ঠানে গোমাংস পরিবেশন ও খাওয়া নিষিদ্ধ করা হয়। BBC-র প্রতিবেদনেও এটি নিশ্চিত করা হয়েছে যে এই নতুন বিধান বাড়িতে গোমাংস খাওয়ার অধিকারকে বাধা দেয় না, তবে রেস্তোরাঁ বা জনসমাবেশে এটি অনুমোদিত নয়। সুতরাং হিমন্তের সাম্প্রতিক বক্তব্য মূলত বিদ্যমান আইনেরই পুনরাবৃত্তি, নতুন কোনো নীতির ঘোষণা নয় — তবে নির্বাচনের ঠিক আগে এই স্পষ্টীকরণটির রাজনৈতিক তাৎপর্য আলাদা।
হিমন্ত মুসলিম সম্প্রদায় ভোট বার্তা: রাজনৈতিক কৌশল না সামাজিক ভারসাম্য?
হিমন্ত মুসলিম সম্প্রদায় ভোট বার্তা হিসেবে এই স্পষ্টীকরণকে অনেক রাজনৈতিক বিশ্লেষক দেখছেন একটি সুচিন্তিত কৌশল হিসেবে। আসামে মুসলিম জনগোষ্ঠী মোট জনসংখ্যার প্রায় ৩৪ শতাংশেরও বেশি। সংখ্যাগরিষ্ঠ মুসলিম ভোটারদের একটি বড় অংশ ঐতিহাসিকভাবে কংগ্রেস বা AIUDF-এর পক্ষে ভোট দিয়ে এসেছেন। এই প্রেক্ষাপটে হিমন্তের “বাড়িতে খান, নিষেধ নেই” বার্তাটি BJP-বিরোধী মুসলিম ভোটারদের কাছে একটি সংযমী ও গ্রহণযোগ্য বার্তা পৌঁছে দেওয়ার প্রচেষ্টা হিসেবে দেখা হচ্ছে।
তবে বিরোধী শিবির এই বক্তব্যকে “নির্বাচনী মুখোশ” বলে নাকচ করেছে। কংগ্রেসের তরফে বলা হয়েছে, একদিকে বছরের পর বছর ধরে গোমাংস ইস্যুকে মেরুকরণের হাতিয়ার বানানো, আর ভোটের আগের দিন “নিষেধ নেই” বলা — এই দুটি কথা একসঙ্গে বিশ্বাসযোগ্য নয়। AIUDF নেতারাও জানিয়েছেন যে, এই ধরনের মন্তব্যে সংখ্যালঘু সম্প্রদায় বিভ্রান্ত হবেন না।
হিমন্ত বিশ্বশর্মা অবশ্য এই সমালোচনা প্রত্যাখ্যান করে বলেছেন যে তাঁর সরকার সংবিধান ও আইনের মধ্যে থেকেই কাজ করছে। হিমন্ত গোমাংস বিতর্ক আসাম নির্বাচন-এর এই পর্যায়ে তাঁর বক্তব্য হলো, মুসলিমদের ব্যক্তিগত খাদ্যাভ্যাসে সরকার হস্তক্ষেপ করছে না, তবে সামাজিক সম্প্রীতি বজায় রাখতে পাবলিক স্পেসে সংযম জরুরি।
বরাক উপত্যকা ও হাইলাকান্দির প্রেক্ষাপটে এই বিতর্কের গুরুত্ব
বরাক উপত্যকার (Barak Valley) জেলাগুলোতে — বিশেষত হাইলাকান্দি (Hailakandi) এবং লালা (Lala)-তে — এই বিতর্কটি বিশেষ সংবেদনশীলতার সঙ্গে অনুভূত হয়। এই অঞ্চলে বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলিম জনগোষ্ঠীর সহাবস্থান দীর্ঘকালের। লালা বাজারের মতো মিশ্র জনগোষ্ঠীর এলাকায় হিন্দু ও মুসলিম উভয় সম্প্রদায়ের মানুষ প্রতিদিন কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ব্যবসা-বাণিজ্য করেন এবং সামাজিক সম্পর্ক বজায় রাখেন।
আসাম গবাদিপশু সংরক্ষণ আইন ২০২১-এর প্রয়োগ এবং পাবলিক স্পেসে বিধিনিষেধ এই এলাকার ছোট ব্যবসায়ীদের জীবিকার ওপর সরাসরি প্রভাব ফেলেছে। কিছু মুসলিম মালিকানাধীন রেস্তোরাঁ মালিক জানিয়েছেন যে, গোমাংস না রাখার কারণে তাঁদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হয়েছে। তবে সামাজিক সম্প্রীতি রক্ষার দিক থেকে অনেকে এই নিয়মকে স্বাভাবিকভাবেই মেনে নিয়েছেন। হিমন্ত গোমাংস বিতর্ক আসাম নির্বাচন-এর এই দিকটি হাইলাকান্দি জেলার ভোটারদের কাছে শুধু রাজনৈতিক নয়, জীবনযাত্রার প্রশ্নও।
৯ এপ্রিলের ভোটের পর, বিজয়ী দল যেই হোক, গোমাংস ইস্যুটি আসামের রাজনৈতিক আলোচনা থেকে সরে যাওয়ার কথা নয়। হিমন্ত গোমাংস বিতর্ক আসাম নির্বাচন প্রমাণ করে যে, আইনি বিধিনিষেধ এবং সামাজিক-সাংস্কৃতিক অনুভূতির এই সংযোগবিন্দুটি আসামের রাজনীতিতে দীর্ঘমেয়াদে একটি গুরুত্বপূর্ণ ইস্যু হয়েই থাকবে। ভোটাররা কীভাবে এই বার্তাটিকে গ্রহণ করেছেন, তা জানা যাবে ফলাফল ঘোষণার পর।