
আসাম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ভোটগ্রহণের দিন, ৯ এপ্রিল, আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির (APCC) সভাপতি গৌরব গোগৈ জোরহাট কেন্দ্রে নিজের ভোট প্রদান করলেন। গৌরব গোগৈ ভোটদান শেষে সাংবাদিকদের সামনে আত্মবিশ্বাসী কণ্ঠে বললেন যে রাজ্যে একটি রাজনৈতিক পরিবর্তনের বার্তা তিনি স্পষ্ট অনুভব করছেন। তিন বারের লোকসভা সাংসদ এবং সংসদে বিরোধীদের উপনেতা হিসেবে পরিচিত এই ৪৩ বছর বয়সী কংগ্রেস নেতা প্রথমবারের মতো বিধানসভা নির্বাচনে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন — এটিই তাঁর ও তাঁর দলের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ মুহূর্ত।
“মানুষ গণতান্ত্রিক আসামের জন্য ভোট দিচ্ছে”: গোগৈর বার্তা
India Today NE-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোট দেওয়ার পর গৌরব গোগৈ বলেন, “আজ আসামের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ দিন। মানুষ এগিয়ে আসছেন এবং রাজ্যের ভবিষ্যৎ নির্ধারণে একটি সুনির্দিষ্ট পছন্দ করছেন। মানুষের চোখে যে আশা, কণ্ঠে যে আত্মবিশ্বাস এবং নির্ভয়ে মতপ্রকাশের যে সাহস দেখছি — তাতে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে, ৪ মে আমরা একটি ক্ষমতাবান ও নতুন আসাম দেখতে পাব।” তিনি আরও যোগ করেন, “মানুষ একটি প্রজাতান্ত্রিক, গণতান্ত্রিক ও ক্ষমতাবান আসামকে বেছে নিচ্ছেন — আসামের সভ্যতা, নৈতিকতা ও গণতান্ত্রিক মূল্যবোধের পক্ষে ভোট দিচ্ছেন।”
ভোট দেওয়ার আগে গৌরব গোগৈ তাঁর প্রয়াত পিতা ও তিন বারের আসামের মুখ্যমন্ত্রী তরুণ গোগৈর প্রতি পুষ্পার্ঘ্য অর্পণ করেন। তরুণ গোগৈ ২০২০ সালে প্রয়াত হয়েছেন এবং জোরহাট ছিল তাঁরই রাজনৈতিক কর্মক্ষেত্র। পিতার স্মৃতির প্রতি এই শ্রদ্ধাজ্ঞাপন জোরহাটের ভোটারদের কাছে একটি আবেগময় বার্তা বহন করে। তাঁর মা ডলি গোগৈও পুত্রের সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে ছিলেন। ডলি গোগৈ ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, “জোরহাটবাসীর ভালোবাসা ও আশীর্বাদ চাই।” গৌরবের মাসি লক্ষ্মীরানী গোগৈও আশা প্রকাশ করেন যে আসামের উন্নয়ন অব্যাহত থাকুক এবং গৌরব গোগৈ সফল হোন।
জোরহাট: চায়ের রাজধানীতে হাই-স্টেক লড়াই
Times of India ও NDTV-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, “আসামের চায়ের রাজধানী” হিসেবে পরিচিত জোরহাট কেন্দ্রটি এবারের সবচেয়ে আলোচিত রাজনৈতিক লড়াইয়ের একটি। গৌরব গোগৈ ভোটদান করে যে কেন্দ্রে জয়ের প্রত্যাশা করছেন, সেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী হলেন BJP-র বর্তমান বিধায়ক হিতেন্দ্রনাথ গোস্বামী — যিনি শান্তশিষ্ট, বুদ্ধিজীবী ভাবমূর্তির একজন রাজনীতিক। NDTV-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, গোস্বামী প্রথমে AGP-তে ছিলেন এবং ২০১৪ সালে BJP-তে যোগ দেন। BJP-র বুথ ব্যবস্থাপনা ও হাইপার-লোকাল প্রচারণায় তাঁর সাংগঠনিক দক্ষতা গৌরবের পারিবারিক ঐতিহ্য ও উচ্চ-প্রোফাইল পরিচিতির সঙ্গে একটি টান টান প্রতিযোগিতা তৈরি করেছে।
জোরহাটের ভোটার-বিন্যাস রাজনৈতিকভাবে জটিল। চা-বাগান সম্প্রদায়, আহোম হিন্দু ও আসামিভাষী নগর-অর্ধ-নগর ভোটার — এই তিন গোষ্ঠীর একটি বিশেষ ভারসাম্য এখানকার নির্বাচনী ফলাফল নির্ধারণ করে। দশকের পর দশক ধরে জোরহাট কংগ্রেসের ঘাঁটি ছিল, কিন্তু সাম্প্রতিক বছরগুলোতে BJP-র সাংগঠনিক বিস্তার সেই অবস্থান কঠিন করে তুলেছে। গৌরব গোগৈ NewsX-কে দেওয়া একটি সাক্ষাৎকারে জানিয়েছেন, অনুপ্রবেশ ও অবকাঠামো ভোটারদের মূল উদ্বেগ, এবং এই বিষয়গুলোতে সরাসরি কথা বলার জন্য তিনি প্রচারণায় প্রতিটি গ্রামে যাওয়ার চেষ্টা করেছেন।
ছয় দলের জোট ও কংগ্রেসের বড় বাজি
NDTV ও National Herald-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ২০২৬ সালের নির্বাচনে কংগ্রেস একা লড়ছে না। দলটি একটি ছয় দলের মহাজোটের নেতৃত্ব দিচ্ছে — যেখানে রয়েছে CPI, CPI(M), CPI(ML), রাইজর দল, আসাম জাতীয় পরিষদ ও জাতীয় দল-আসম। গৌরব গোগৈ APCC সভাপতি হিসেবে ২০২৫ সালের মে মাসে দায়িত্ব গ্রহণ করেন — নির্বাচনের মাত্র এক বছর আগে। India Today-র বিশ্লেষণ অনুযায়ী, রাহুল গান্ধীর ঘনিষ্ঠ এই নেতাকে “ববর শের” হিসেবে চিহ্নিত করে কংগ্রেস তাঁকে BJP-র হিমন্ত বিশ্বশর্মার বিপরীতে প্রধান মুখ হিসেবে প্রজেক্ট করেছে।
কংগ্রেস পরপর দুটি বিধানসভা নির্বাচনে আসামে হেরেছে। ২০১১ সালের পর থেকে দলটি ক্ষমতার বাইরে। এই প্রেক্ষাপটে গৌরব গোগৈ ভোটদান শেষে যে আত্মবিশ্বাসী বার্তা দিলেন, তা একটি প্রতীকী গুরুত্বও বহন করে — কারণ জোরহাট ছিল তাঁর পিতা তরুণ গোগৈর রাজনৈতিক শক্তির কেন্দ্র। পিতার উত্তরাধিকার বহন করে পুত্র কি আসামে কংগ্রেসের পুনরুত্থানের নেতৃত্ব দিতে পারবেন — এই প্রশ্নের উত্তর মিলবে ৪ মে।
বরাক উপত্যকা ও লালা টাউনের প্রাসঙ্গিকতা
গৌরব গোগৈর রাজনৈতিক বার্তা বরাক উপত্যকার ভোটারদের কাছেও প্রাসঙ্গিক। হাইলাকান্দি জেলার লালা কেন্দ্রসহ বরাক উপত্যকার ১৩টি আসনে কংগ্রেস ও AIUDF ঐতিহাসিকভাবে শক্তিশালী। গৌরব গোগৈ আগেই বলেছেন যে AIUDF কার্যত BJP-র “গোপন মিত্র” — এই মন্তব্য বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী ভোটারদের মধ্যে রাজনৈতিক হিসাব নিকাশকে প্রভাবিত করতে পারে। লালা টাউনের ভোটাররাও এবার যে পছন্দ করলেন, সেটি ৪ মে পুরো আসামের ফলাফলের মানচিত্রে একটি ছোট কিন্তু গুরুত্বপূর্ণ অংশ হয়ে থাকবে।
৪ মে: তরুণ গোগৈর রাজ্যে নতুন অধ্যায়ের অপেক্ষা
৯ এপ্রিলের ভোটগ্রহণ শেষ হলেও আসল নাটক শুরু হবে ৪ মে ভোর থেকে। গৌরব গোগৈ ভোটদানের মাধ্যমে যে আশাবাদ প্রকাশ করেছেন, সেটি ব্যক্তিগত জয়ের বাইরেও একটি বড় রাজনৈতিক স্বপ্নকে প্রতিনিধিত্ব করে — পিতার রাজ্যে, পিতার উত্তরাধিকারের মাটিতে দাঁড়িয়ে কংগ্রেসকে আবার আসামের ক্ষমতায় ফিরিয়ে আনা। ২.৫ কোটি ভোটার আজ যে রায় দিলেন, সেই রায় গণনা হবে ৪ মে — এবং সেদিনই জানা যাবে গৌরবের সেই প্রত্যাশা বাস্তবে পরিণত হলো কি না।