১৪ এপ্রিল ২০২৬, মঙ্গলবার বিকেলে মণিপুরের বিষ্ণুপুর জেলায় নিরাপত্তা বাহিনীর সঙ্গে স্থানীয় জনতার সংঘর্ষে ১৮ জন আহত হয়েছেন — যাঁদের মধ্যে পাঁচ জন মহিলা। মণিপুর বিষ্ণুপুর সংঘর্ষের এই ঘটনায় উত্তেজিত জনতা নিরাপত্তা বাহিনীর দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে নিরাপত্তা বাহিনী কাঁদানে গ্যাস ব্যবহার করে এবং অতিরিক্ত বাহিনী মোতায়েন করা হয়। ঘটনার পর জেলা প্রশাসন বিষ্ণুপুরে নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ (Section 163 BNSS) জারি করেছে। ঘটনাস্থল থেকে চার জনকে গ্রেফতার করা হয়েছে এবং অন্যদের শনাক্তে পুলিশি তদন্ত চলছে।
কী থেকে শুরু হলো এই সংঘাত?
ঘটনার সূত্রপাত ইম্ফল বিমানবন্দরে একজন সন্দেহভাজন মাদক পাচারকারীর কাছ থেকে বিপুল পরিমাণ মাদক জব্দ করার মধ্য দিয়ে। প্রাথমিক জিজ্ঞাসাবাদে গ্রেফতারকৃত ব্যক্তি বিষ্ণুপুর জেলার কোয়াকটা এলাকায় একটি লুকানো অস্ত্র ও গোলাবারুদের মজুতের তথ্য দেন। সেই তথ্যের ভিত্তিতে নিরাপত্তা বাহিনীর একটি দল ওই অবস্থানের দিকে রওনা হয়।
দুপুর সাড়ে বারোটার দিকে বিষ্ণুপুরের থিনুংগেই এলাকায় পৌঁছালে স্থানীয় বাসিন্দারা নিরাপত্তা বাহিনীর গতিপথ আটকে দেন। মণিপুর পুলিশের বিবৃতি অনুযায়ী, “বাহিনীর পরিচয় ও উদ্দেশ্য নিয়ে ভিত্তিহীন ও বিভ্রান্তিকর গুজব” ছড়িয়ে পড়ায় জনতা উত্তেজিত হয়ে পড়ে। এরপর পরিস্থিতি দ্রুত সহিংস রূপ নেয় — জনতার একটি অংশ গাড়ি ভাঙচুর করে এবং দুটি গাড়িতে আগুন ধরিয়ে দেয়। নিরাপত্তাকর্মীদের আটকে রাখার চেষ্টাও হয়েছিল বলে পুলিশের বিবৃতিতে জানানো হয়েছে। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে অতিরিক্ত বাহিনী পাঠানো হয় এবং কাঁদানে গ্যাস নিক্ষেপ করে জনতাকে ছত্রভঙ্গ করা হয়। থিনুংগেই-সংলগ্ন নিংথোখং এলাকায়ও উত্তেজনা ছড়িয়ে পড়েছিল বলে জানা গেছে।
ট্রংলাওবি বোমা হামলা: পটভূমিতে গভীর ক্ষোভ
১৪ এপ্রিলের মণিপুর বিষ্ণুপুর সংঘর্ষকে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে ভুল হবে। এর পেছনে রয়েছে সাম্প্রতিক একটি ভয়াবহ ঘটনার গভীর ক্ষত। ৭ এপ্রিল ২০২৬ তারিখে বিষ্ণুপুর জেলার মোইরাং থাংলাওবি এলাকায় সন্দেহভাজন জঙ্গিদের স্থাপিত বোমা বিস্ফোরণে দুটি শিশু নিহত হয়। সেই হামলার প্রতিবাদে ক্ষুব্ধ জনতা একটি CRPF ক্যাম্পে হামলা চালায়, যেখানে নিরাপত্তা বাহিনীর গুলিতে তিন জন প্রাণ হারান এবং ৩০ জনের বেশি আহত হন। সেই ক্ষোভ সম্পূর্ণ প্রশমিত হওয়ার আগেই ১৪ এপ্রিলের অস্ত্র উদ্ধার অভিযানকে কেন্দ্র করে নতুন গুজব ছড়িয়ে পরিস্থিতি আবার উত্তপ্ত হয়ে ওঠে।
Hindustan Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, পুলিশ সুস্পষ্টভাবে জানিয়েছে এই সংঘর্ষের মূল কারণ সামাজিক মাধ্যমে ছড়ানো “বিভ্রান্তিকর ও ভিত্তিহীন গুজব”। কর্তৃপক্ষ সাধারণ মানুষকে গুজব না ছড়ানোর এবং যাচাই না করে কোনো তথ্য প্রচার না করার আহ্বান জানিয়েছে এবং সহিংসতায় জড়িতদের বিরুদ্ধে কঠোর আইনি ব্যবস্থার হুঁশিয়ারি দিয়েছে। ঘটনার পর পুরো এলাকায় ফ্ল্যাগ মার্চ করে নিরাপত্তা বাহিনী। সহিংসতায় গ্রেফতার চার জনের বিরুদ্ধে অগ্নিসংযোগ, বেআইনি সমাবেশ এবং নিরাপত্তা বাহিনীকে বাধাদানের অভিযোগে মামলা দায়ের করা হয়েছে।
মণিপুর সংকটের দীর্ঘ ছায়া এবং আসামের প্রভাব
মণিপুরে ২০২৩ সালের মে মাসে শুরু হওয়া জাতিগত সংঘর্ষ আজও পুরোপুরি শেষ হয়নি। বিষ্ণুপুর জেলা বরাবরই এই সংঘর্ষের অন্যতম কেন্দ্র হয়ে দাঁড়িয়েছে — কারণ এই জেলাতেই মেইতেই এবং কুকি সম্প্রদায়ের মানুষের বসবাস পাশাপাশি। সাম্প্রতিক বোমা হামলা ও পরবর্তী সহিংসতা মণিপুরে শান্তি প্রক্রিয়ার সামনে নতুন বাধা তৈরি করেছে।
মণিপুরের এই অস্থিরতা আসামের বরাক উপত্যকার মানুষের জন্যও উদ্বেগের কারণ। মণিপুর থেকে শিলচর হয়ে বরাক উপত্যকায় পণ্য আসে এবং বহু পরিযায়ী শ্রমিক ও ব্যবসায়ী দুই রাজ্যের মধ্যে যাতায়াত করেন। মণিপুরে বারবার নিষেধাজ্ঞা ও সংঘর্ষ হলে জাতীয় সড়কে পণ্য চলাচল ব্যাহত হয় — যার সরাসরি প্রভাব পড়ে হাইলাকান্দি জেলাসহ বরাক উপত্যকার বাজারে নিত্যপণ্যের সরবরাহ ও দামে। লালা টাউনের অনেক বাসিন্দারই আত্মীয়স্বজন এবং ব্যবসায়িক যোগাযোগ মণিপুরের সঙ্গে রয়েছে — তাই এই ধরনের সংঘর্ষ সেখানে সরাসরি উদ্বেগ তৈরি করে।
বিষ্ণুপুরের পরিস্থিতি এখন কতটা স্থিতিশীল তা নির্ভর করছে প্রশাসনের পরবর্তী পদক্ষেপের উপর। নিষেধাজ্ঞামূলক আদেশ কতদিন বলবৎ থাকবে, গ্রেফতারকৃতদের বিরুদ্ধে কোন ধারায় মামলা হবে এবং অস্ত্র উদ্ধার অভিযানের পরবর্তী পরিণতি কী হয় — এই প্রশ্নগুলো সামনের দিনগুলোতে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠবে। মণিপুরে শান্তি ফেরানোর প্রক্রিয়া যতদিন না সুদৃঢ় ভিত্তির উপর দাঁড়াবে, ততদিন এই ধরনের গুজব-উৎসারিত সহিংসতার পুনরাবৃত্তির ঝুঁকি থেকে যাবে।