১৫ এপ্রিল ২০২৬, বুধবার — বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখ এবং আসামের রঙালি বিহু উৎসবের শুভলগ্নে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী সমগ্র দেশবাসীকে উষ্ণ শুভেচ্ছা ও অভিনন্দন জানিয়েছেন। All India Radio-র সরকারি সংবাদ পরিষেবা Newsonair-এর মাধ্যমে প্রকাশিত তাঁর বার্তায় প্রধানমন্ত্রী মোদী বলেছেন, এই বিশেষ উৎসবগুলো ভারতের বৈচিত্র্যের মধ্যে ঐক্যের সবচেয়ে উজ্জ্বল প্রকাশ। পয়লা বৈশাখ ও রঙালি বিহু উপলক্ষে তাঁর শুভেচ্ছা বার্তায় দেশের সাংস্কৃতিক বৈভব এবং জনগণের মধ্যে সমৃদ্ধি ও সুখের প্রত্যাশার কথা বিশেষভাবে উঠে এসেছে।
মোদীর শুভেচ্ছা বার্তায় কী বললেন প্রধানমন্ত্রী?
প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী তাঁর শুভেচ্ছা বার্তায় রঙালি বিহু, পয়লা বৈশাখ, বিশু, পুথান্ডু এবং বৈশাখী — একইসঙ্গে উদযাপিত বিভিন্ন আঞ্চলিক নববর্ষ উৎসবের কথা উল্লেখ করেছেন। তিনি বলেন, ভারতের প্রতিটি কোণে এই মুহূর্তে নতুন বছরকে স্বাগত জানানোর আনন্দ ছড়িয়ে পড়েছে। প্রধানমন্ত্রী বিশেষভাবে কৃষক সমাজের কথা স্মরণ করে বলেন যে, বিহু মূলত কৃষিজীবী মানুষের উৎসব — ফসল কাটার আনন্দে যে উৎসব জন্ম নেয় তা আজ সমগ্র আসামের, সমগ্র ভারতের সাংস্কৃতিক পরিচয় হয়ে উঠেছে। তাঁর বার্তায় দেশের জনগণের সুখ, সমৃদ্ধি ও কল্যাণ কামনা করা হয়েছে।
রঙালি বিহু-র পাশাপাশি পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে বাংলাভাষী মানুষদের প্রতি আলাদাভাবে শুভেচ্ছা জানানো উল্লেখযোগ্য। বাংলা নববর্ষ পয়লা বৈশাখ পশ্চিমবঙ্গ ও বাংলাদেশে যেমন পালিত হয়, তেমনি আসামের বরাক উপত্যকায়ও বাংলাভাষী মানুষদের কাছে এটি অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ উৎসব। প্রধানমন্ত্রীর এই সার্বিক শুভেচ্ছা বার্তা উত্তর-পূর্ব ভারতের বিভিন্ন সাংস্কৃতিক সম্প্রদায়ের প্রতি কেন্দ্রীয় সরকারের অন্তর্ভুক্তিমূলক দৃষ্টিভঙ্গিকে প্রতিফলিত করে।
রঙালি বিহু: আসামের সংস্কৃতির হৃদয়
রঙালি বিহু — যা বহাগ বিহু নামেও পরিচিত — আসামের সবচেয়ে প্রাণবন্ত ও ঐতিহ্যবাহী উৎসব। প্রতি বছর বাংলা নববর্ষের সঙ্গে সামঞ্জস্য রেখে এপ্রিল মাসের মাঝামাঝি এই উৎসব উদযাপিত হয়। মূলত বোরো কৃষিচক্রের শুরুতে নতুন চাষের মরসুমকে স্বাগত জানাতে বিহু পালিত হয়। গান, নৃত্য, ঢোল এবং পিঠা-পানার আনন্দে মেতে ওঠেন আসামের মানুষ। বিশেষত তরুণ-তরুণীরা বিহুর নৃত্যে অংশ নেন — লাল-সাদা পোশাকে সজ্জিত মেয়েরা এবং ঢোল-পেঁপা বাজিয়ে ছেলেরা মিলে তৈরি করেন এক অপূর্ব সাংস্কৃতিক পরিবেশ।
আসাম সরকার প্রতি বছর রাজ্যব্যাপী বিহু উৎসবের আয়োজন করে। গুয়াহাটির সরুসজাই স্টেডিয়ামে কেন্দ্রীয় বিহু অনুষ্ঠান এবং জেলায় জেলায় স্থানীয় আয়োজন সারা আসামে উৎসবের আমেজ তৈরি করে। ২০২৬ সালেও আসাম সরকার বিহু উপলক্ষে বিশেষ সাংস্কৃতিক কার্যক্রমের আয়োজন করেছে।
বরাক উপত্যকায় পয়লা বৈশাখ: লালা থেকে শিলচর পর্যন্ত উৎসব
আসামের ব্রহ্মপুত্র উপত্যকায় যেমন রঙালি বিহু, বরাক উপত্যকায় তেমনি পয়লা বৈশাখ — বাংলা নববর্ষ — সমান গুরুত্ব নিয়ে পালিত হয়। হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনসহ সমগ্র বরাক উপত্যকায় বাংলাভাষী মানুষের কাছে পয়লা বৈশাখ একটি আবেগের উৎসব। প্রতি বছর এই দিনে স্থানীয় মেলা, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং মিষ্টি বিতরণের আয়োজন করা হয়। লালা বাজার এলাকায় পয়লা বৈশাখ উপলক্ষে ব্যবসায়ীরা নতুন হালখাতা শুরু করেন — পুরনো বকেয়া মেটানো এবং নতুন বছরে ব্যবসার শুভ সূচনার এই ঐতিহ্য শতাব্দীপ্রাচীন। মিষ্টির দোকানগুলোতে রসগোল্লা, সন্দেশ ও পিঠার বিক্রি কয়েকগুণ বেড়ে যায়। এই দিনে সরকারি ও বেসরকারি অফিসগুলোতে নতুন বছরের শুভেচ্ছা বিনিময় এবং সামাজিক অনুষ্ঠানের আয়োজন হয়।
প্রধানমন্ত্রী মোদীর পয়লা বৈশাখ ও রঙালি বিহু উপলক্ষে শুভেচ্ছা বার্তা এই দুটি আলাদা কিন্তু একই মুহূর্তে উদযাপিত উৎসবকে জাতীয় স্বীকৃতি দেওয়ার পাশাপাশি উত্তর-পূর্বের মানুষের কাছে একটি আন্তরিক বার্তা পাঠায়। আসামের ব্রহ্মপুত্র ও বরাক উপত্যকার দুই ধারার সংস্কৃতিকে একটি জাতীয় বার্তায় ধারণ করার এই প্রয়াস স্থানীয় মানুষের কাছে তাৎপর্যপূর্ণ। নতুন বছরের এই উৎসবমুখর মুহূর্তে দেশের সর্বোচ্চ পদাধিকারীর শুভেচ্ছা বার্তা শুধু আনুষ্ঠানিকতা নয় — এটি ভারতের বিচিত্র সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যের প্রতি রাষ্ট্রের স্বীকৃতি। পয়লা বৈশাখ ও রঙালি বিহুর এই সন্ধিক্ষণে লালা থেকে গুয়াহাটি, শিলচর থেকে দিব্রুগড় — সমগ্র আসামে নতুন বছরের আলো এবং নতুন আশার বার্তা ছড়িয়ে পড়ুক, এটাই প্রত্যাশা সকলের।