Read today's news --> ⚡️Click here 

সিটি বাজাও স্কুল বুলাও অভিযান: অসমের ৮ জেলায় বাঁশি দিয়ে স্কুলছুট রোধের নতুন উদ্যোগ

স্কুলছুট সমস্যা মোকাবিলায় অসম সরকার একটি সৃজনশীল ও কম খরচের উদ্যোগ নিয়েছে — নাম ‘সিটি বাজাও স্কুল বুলাও’। সমগ্র শিক্ষা অসম (SSA) কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের Project Approval Board (PAB)-এর অনুমোদনের পর রাজ্যের আটটি উচ্চ স্কুলছুট জেলায় এই অভিযান চালু করেছে। এই কর্মসূচির আওতায় প্রতিটি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীকে একটি করে বাঁশি দেওয়া হবে — যা ছাত্রছাত্রীরা সকালে বাজিয়ে পাড়া-প্রতিবেশী সহপাঠীদের স্কুলে আসতে ডাকবে। সিটি বাজাও স্কুল বুলাও অভিযানটি ঝাড়খণ্ডের সফল UDDYAM মডেল থেকে অনুপ্রাণিত, যেখানে এটি ইতিমধ্যে স্কুল হাজিরা উল্লেখযোগ্যভাবে বাড়িয়েছে।

বাঁশির শব্দে স্কুলের ডাক — কীভাবে কাজ করে এই উদ্যোগ?

SSA-র পাঠানো চিঠিতে আটটি জেলার মিশন কো-অর্ডিনেটরদের নির্দেশ দেওয়া হয়েছে নির্দিষ্ট ব্লকগুলোতে এই কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে। লক্ষ্যভুক্ত আটটি জেলা হলো — বারপেটা, কাছাড়, ধুবড়ি, দিমা হাসাও, গোয়ালপাড়া, নগাঁও, নলবাড়ি এবং পশ্চিম কার্বি আংলং। প্রতিটি শিশু সকালে স্কুলে যাওয়ার পথে বাঁশি বাজাবে — এই সাংকেতিক শব্দই হবে পাড়ার অন্য শিশুদের জন্য স্কুলে যাওয়ার নিমন্ত্রণ। প্রতিটি বাঁশির দাম মাত্র এক টাকারও কম, অথচ এই ছোট উদ্যোগটি স্কুলে আসার প্রতি শিশুদের মধ্যে একটি সামাজিক অভ্যাস ও উৎসাহ তৈরি করতে পারে বলে শিক্ষা বিশেষজ্ঞরা মনে করছেন।

ঝাড়খণ্ডে এই মডেলের সূচনা হয়েছিল সিমদেগা জেলায় পাইলট প্রকল্প হিসেবে। সেখানে সাফল্যের পর পুরো রাজ্যে ছড়িয়ে দেওয়া হয়। রাঁচির তৎকালীন DC রাহুল কুমার সিনহা জানান, “শিশুরা প্রায়ই অজুহাত দেখিয়ে স্কুল এড়িয়ে যায়। SBSB কর্মসূচি সরাসরি স্কুল প্রশাসনকে অভিভাবকদের সঙ্গে যুক্ত করে।” ঝাড়খণ্ডের এই সাফল্যই SSA-কে অসমে একই মডেল চালু করতে অনুপ্রাণিত করেছে।

অসমের স্কুলছুট পরিসংখ্যান — সংকটের গভীরতা

সিটি বাজাও স্কুল বুলাও অভিযান চালুর পেছনে রয়েছে অসমের গভীর স্কুলছুট সংকটের বাস্তবতা। UDISE+ ২০২৪-২৫ প্রতিবেদন অনুযায়ী, অসমে প্রাথমিক স্তরে বার্ষিক গড় ড্রপআউট হার ৩.৮% (ছেলে ৪.৭%, মেয়ে ২.৯%) এবং উচ্চ প্রাথমিক স্তরে ৫% (ছেলে ৭%, মেয়ে ৩.২%)। যদিও আগের বছরের তুলনায় এই হার কমেছে — প্রাথমিকে ৬.২% থেকে ৩.৮% এবং উচ্চ প্রাথমিকে ৮.২% থেকে ৫% — তবু জাতীয় গড়ের তুলনায় অসম এখনও অনেকটা পিছিয়ে।

জাতীয় স্তরে প্রাথমিকে ড্রপআউট হার ২.৩%, উচ্চ প্রাথমিকে ৩.৫%, কিন্তু অসমে এই হার যথাক্রমে ৩.৮% ও ৫%। মাধ্যমিক স্তরে পরিস্থিতি আরও উদ্বেগজনক — অসমে ১৭.৫%, যেখানে জাতীয় গড় মাত্র ৮.২%। ২০২৪-২৫ শিক্ষাবর্ষে অসমে ৬৮,৮৪৩ জন শিশু স্কুলের বাইরে ছিল বলে কেন্দ্রীয় শিক্ষা মন্ত্রণালয় জানিয়েছে। সংখ্যালঘু-অধ্যুষিত এলাকা, চর অঞ্চল এবং চা বাগান এলাকায় ড্রপআউটের হার সবচেয়ে বেশি।

কাছাড় হাইলাকান্দিতে প্রাসঙ্গিকতা

আটটি লক্ষ্যভুক্ত জেলার মধ্যে কাছাড় একটি — যা বরাক উপত্যকার মূল জেলা এবং সিলচর এই জেলার সদর দফতর। হাইলাকান্দি জেলা সরাসরি এই তালিকায় না থাকলেও বরাক উপত্যকার সামগ্রিক শিক্ষা পরিস্থিতি একই ধরনের চ্যালেঞ্জের মুখোমুখি। লালা শহরসহ হাইলাকান্দির বিভিন্ন প্রান্তে, বিশেষত চা বাগান এলাকা ও গ্রামাঞ্চলে, ছেলেদের স্কুলছুটের হার বেশি। দারিদ্র্য, পরিবারের আয় বাড়াতে শিশুশ্রম এবং পরিবহন সংকট — এই তিনটি কারণ এই অঞ্চলে স্কুলছুটের প্রধান নিয়ামক।

অসম সরকারের শিক্ষামন্ত্রী রনোজ পেগু UDISE+ রিপোর্ট প্রকাশের সময় বলেছিলেন, প্রাথমিক স্তরে ড্রপআউট হার ৩.৮%-এ নামানো “একটি বড় অর্জন”, কিন্তু মাধ্যমিক স্তরে আরও কাজ করতে হবে। সিটি বাজাও স্কুল বুলাও-এর মতো সমাজভিত্তিক কার্যক্রম এই বার্তাকেই মাঠ পর্যায়ে বাস্তবে রূপ দেওয়ার চেষ্টা করছে।

সিটি বাজাও স্কুল বুলাও অভিযান প্রমাণ করছে যে শিক্ষায় পরিবর্তন আনতে সবসময় বিশাল বাজেটের প্রয়োজন নেই — কখনও কখনও একটি ছোট বাঁশিই হতে পারে বড় পরিবর্তনের সূচনা। অসম জুড়ে এই কর্মসূচি কতটা কার্যকর হয়, তা নির্ভর করবে স্থানীয় শিক্ষক, অভিভাবক ও সম্প্রদায়ের অংশগ্রহণের উপর। কাছাড়সহ আটটি জেলায় এই পাইলট সফল হলে হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার অন্য জেলাগুলোতেও একই মডেল ছড়িয়ে দেওয়ার পথ খুলে যাবে।

সিটি বাজাও স্কুল বুলাও অভিযান: অসমের ৮ জেলায় বাঁশি দিয়ে স্কুলছুট রোধের নতুন উদ্যোগ
Scroll to top