Read today's news --> Click here

আশা ভোঁসলে প্রয়াণ: ৯২ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে শেষ নিঃশ্বাস নিলেন ভারতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী

ভারতীয় সঙ্গীতজগতের এক অপরিবর্তনীয় কণ্ঠস্বর চিরতরে থেমে গেল। ১২ এপ্রিল ২০২৬, রবিবার দুপুরে মুম্বাইয়ের ব্রিচ ক্যান্ডি হাসপাতালে ৯২ বছর বয়সে মৃত্যু হয়েছে আশা ভোঁসলে-র। হাসপাতালের চিকিৎসক ডা. প্রতীত সামদানি PTI-কে জানান, “কিছুক্ষণ আগে মাল্টি-অর্গান ফেইলিউরে তাঁর মৃত্যু হয়েছে।” আশা ভোঁসলে প্রয়াণের এই খবর মুহূর্তের মধ্যে সারা দেশে শোকের ঢেউ তুলেছে। ১১ এপ্রিল রাতে অতিরিক্ত শারীরিক ক্লান্তি ও বুকের সংক্রমণের কারণে তাঁকে হাসপাতালে ভর্তি করা হয়েছিল — তাঁর নাতনি জানাই ভোঁসলে এ কথা সামাজিক মাধ্যমে জানিয়েছিলেন। মাত্র একদিনের ব্যবধানে তাঁর মৃত্যুর খবর আসে।

৯২ বছরের জীবন, আট দশকের সংগীত যাত্রা

আশা ভোঁসলে ১৯৩৩ সালে বিখ্যাত মঙ্গেশকর পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন। মাত্র নয় বছর বয়সে গান শেখা শুরু এবং ১৯৪৩ সালে প্রথম চলচ্চিত্রের গান রেকর্ড করেন — এভাবেই শুরু হয় এক অসাধারণ সংগীত জীবনের পথচলা। পঞ্চাশের দশকের মধ্যেই হিন্দি চলচ্চিত্রের অন্যতম প্রধান কণ্ঠশিল্পী হিসেবে তিনি নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করেন এবং এরপর কখনো পিছনে ফিরে তাকাননি। আট দশকের সংগীতজীবনে তিনি হিন্দি, মারাঠি, বাংলাসহ মোট ২০টিরও বেশি ভারতীয় ভাষায় এবং বেশ কিছু বিদেশি ভাষায় গান রেকর্ড করেছেন।

Rolling Stone India-এর প্রতিবেদন অনুসারে, আশা ভোঁসলে তাঁর কর্মজীবনে মোট ১২,০০০-এরও বেশি গান রেকর্ড করেছেন এবং ২০১১ সালে Guinness Book of World Records তাঁকে “সর্বাধিক স্টুডিও রেকর্ডিং — সিঙ্গেলস” বিভাগে স্বীকৃতি দিয়েছিল। মীনা কুমারী, মধুবালা, জিনাত আমান থেকে কাজল, উর্মিলা মাতোন্ডকর — প্রজন্মের পর প্রজন্মের নায়িকাদের পর্দার কণ্ঠ ছিলেন তিনি। দক্ষিণ ভারতীয় শিল্পী পদ্মিনী ও বৈজয়ন্তীমালার জন্যও তাঁর কণ্ঠ ব্যবহার হয়েছে।

পুরস্কার স্বীকৃতি: এক অতুলনীয় উত্তরাধিকার

আশা ভোঁসলে-র জীবনে সম্মান ও স্বীকৃতির তালিকা দীর্ঘ এবং বৈচিত্র্যময়। দুটি জাতীয় চলচ্চিত্র পুরস্কার এবং রেকর্ড সাতটি Filmfare Award for Best Female Playback Singer তাঁর সংগীতের শ্রেষ্ঠত্বের প্রমাণ। ভারত সরকার তাঁকে পদ্মবিভূষণ সম্মানে ভূষিত করেছিল এবং ভারতীয় চলচ্চিত্রে অবদানের জন্য তিনি দাদাসাহেব ফালকে পুরস্কারও পেয়েছেন। উস্তাদ আলী আকবর খানের সঙ্গে যৌথ অ্যালবাম “Legacy” (১৯৯৭) এবং “You’ve Stolen My Heart” (২০০৬) অ্যালবামের জন্য Grammy পুরস্কারে মনোনীতও হয়েছিলেন তিনি।

তাঁর বাংলা গানের অবদানও কম নয়। পশ্চিমবঙ্গের মুখ্যমন্ত্রী মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় শোকবার্তায় বলেন, “তিনি অনেক বাংলা গানও গেয়েছেন এবং বাংলায়ও তিনি অবিশ্বাস্যরকম জনপ্রিয়। আমরা ২০১৮ সালে তাঁকে আমাদের সর্বোচ্চ বেসামরিক সম্মান ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রদান করতে পেরেছিলাম।” এই তথ্যটি লালা বাজার ও বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী পাঠকদের কাছে বিশেষভাবে তাৎপর্যপূর্ণ — কারণ আশা ভোঁসলে শুধু হিন্দি গানেরই শিল্পী ছিলেন না, তিনি বাংলার নিজস্ব গানের ভুবনেরও একজন পরিচিত মুখ ছিলেন।

প্রধানমন্ত্রী থেকে বলিউড — শোকের ঢেউ সর্বত্র

আশা ভোঁসলে প্রয়াণের খবরে সারা দেশজুড়ে শোকের বার্তা আসতে শুরু করে। প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী X-এ লেখেন, “আশা ভোঁসলে জির চলে যাওয়ায় আমি গভীরভাবে মর্মাহত। ভারত এ পর্যন্ত যত আইকনিক ও বহুমুখী কণ্ঠস্বর শুনেছে, তিনি তার মধ্যে অন্যতম। দশকের পর দশক জুড়ে তাঁর অসাধারণ সংগীতযাত্রা আমাদের সাংস্কৃতিক ঐতিহ্যকে সমৃদ্ধ করেছে এবং বিশ্বজুড়ে অগণিত হৃদয় স্পর্শ করেছে।” তিনি আরও যোগ করেন, “তাঁর গান চিরকাল মানুষের জীবনে প্রতিধ্বনিত হতে থাকবে।” মহারাষ্ট্রের সাংস্কৃতিক মন্ত্রী আশীষ শেলার হাসপাতালের বাইরে সংবাদমাধ্যমকে তাঁর প্রয়াণের খবর আনুষ্ঠানিকভাবে নিশ্চিত করেন।

তাঁর পুত্র আনন্দ ভোঁসলে NDTV ও ANI-কে জানান, “আমার মা আজ চলে গেছেন। ১৩ এপ্রিল সকাল ১১টায় লোয়ার পারেলের কাসা গ্রান্ডেতে তাঁর বাসভবনে শেষ শ্রদ্ধা জানানো যাবে। বিকেল ৪টায় শিবাজি পার্কে শেষকৃত্য অনুষ্ঠিত হবে।” বলিউড থেকেও শোকের স্রোত বইছে — অক্ষয় কুমার লিখেছেন, “আশা ভোঁসলে জির চলে যাওয়ার বেদনা ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়।”

বরাক উপত্যকার বাংলা মনে আশা ভোঁসলে

হাইলাকান্দি জেলার লালা টাউনসহ বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী মানুষের কাছে আশা ভোঁসলে একটি বিশেষ স্থান দখল করে আছেন। তাঁর গাওয়া হিন্দি চলচ্চিত্রের গান যেমন এখানকার মানুষের প্রিয়, তেমনই তাঁর বাংলা গানের অবদানও এই অঞ্চলে সুপরিচিত। ‘দিল চিজ ক্যা হ্যায়’, ‘আঁখোঁ কি মস্তি’, ‘পিয়া তু আব তো আজা’ — এই গানগুলো প্রজন্মের পর প্রজন্ম ধরে বরাক উপত্যকার বিভিন্ন অনুষ্ঠানে বেজে চলেছে। মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় তাঁকে ‘বঙ্গবিভূষণ’ প্রদানের প্রসঙ্গ তুলে ধরেছেন — এই স্বীকৃতিটি বাংলার সঙ্গে আশা ভোঁসলের আত্মার সংযোগকেই মূর্ত করে তোলে।

আশা ভোঁসলের জীবন শুধু একজন গায়িকার গল্প নয় — এটি একজন মানুষের অদম্য মনোবলের আখ্যান। বিবাহবিচ্ছেদ, ব্যক্তিগত ট্র্যাজেডি এবং নানা প্রতিকূলতার মধ্যে দিয়েও তিনি গান গেয়ে গেছেন, নিজেকে প্রাসঙ্গিক রেখেছেন। তাঁর ছেলে আনন্দ ভোঁসলে বলেছিলেন, তাঁর মা একবার বলেছিলেন — “যতক্ষণ নিঃশ্বাস আছে, মানুষ বেঁচে থাকে। আমি সংগীতকে সব কিছু দিয়েছি।” সেই নিঃশ্বাস থেমেছে আজ। কিন্তু ১২,০০০-এরও বেশি গানের কণ্ঠস্বর থেমে যাবে না কোনোদিন — সেগুলো বেঁচে থাকবে প্রতিটি শ্রোতার হৃদয়ে, প্রতিটি প্রজন্মের স্মৃতিতে।

আশা ভোঁসলে প্রয়াণ: ৯২ বছর বয়সে মুম্বাইয়ে শেষ নিঃশ্বাস নিলেন ভারতের কিংবদন্তি কণ্ঠশিল্পী
Scroll to top