
বরাক উপত্যকার কৃষকদের কাছে প্রযুক্তির সুবিধা সরাসরি পৌঁছে দেওয়ার লক্ষ্যে আসাম বিশ্ববিদ্যালয়, সিলচার ‘কৃষি বিকাশ’ নামক একটি মোবাইল অ্যাপ আনুষ্ঠানিকভাবে চালু করেছে। ২০২৬ সালের এপ্রিল মাসে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের উদ্যোগে এই কৃষি বিকাশ মোবাইল অ্যাপ আসাম বিশ্ববিদ্যালয় উদ্বোধন করা হয়। এই অ্যাপটি কৃষকদের ফসলের রোগ, কীটপতঙ্গ ব্যবস্থাপনা এবং আধুনিক চাষাবাদ পদ্ধতির সহজলভ্য তথ্য দিতে বিশেষভাবে ডিজাইন করা হয়েছে। উল্লেখযোগ্য বিষয় হলো, বিশ্ববিদ্যালয় ইতিমধ্যে ড্রোন প্রযুক্তি ব্যবহার করে ফসলের রোগবালাই পর্যবেক্ষণের কাজও শুরু করেছে, যা এই অ্যাপের সঙ্গে সমন্বিতভাবে কাজ করবে।
অ্যাপটির মূল বৈশিষ্ট্য ও কার্যকারিতা
‘কৃষি বিকাশ’ মোবাইল অ্যাপটি বিশেষভাবে বরাক উপত্যকার ছোট ও প্রান্তিক কৃষকদের কথা মাথায় রেখে তৈরি করা হয়েছে। সহজ ইন্টারফেস এবং স্থানীয় ভাষায় তথ্য পরিবেশনের মাধ্যমে এটি ব্যবহার করা সম্ভব যা প্রযুক্তিতে কম অভিজ্ঞ কৃষকদের জন্যও উপযুক্ত। অ্যাপটি ড্রোন-সংগৃহীত তথ্যের সঙ্গে সমন্বিত হয়ে ফসলের কীটপতঙ্গ আক্রমণ এবং রোগের পূর্বাভাস দিতে সক্ষম। বিশ্ববিদ্যালয়ের কৃষি বিভাগের উদ্যোগে তৈরি এই প্ল্যাটফর্মে ফল, শাকসবজি, ধান, সরিষাসহ বিভিন্ন ধরনের স্থানীয় ফসল সম্পর্কিত তথ্য অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে।
আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ উত্তর-পূর্বাঞ্চলের কৃষি-প্রযুক্তি ক্ষেত্রে একটি গুরুত্বপূর্ণ পদক্ষেপ। ইতিপূর্বে IIT গুয়াহাটি, NIT সিলচার এবং ডিব্রুগড় বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষার্থীরা যৌথভাবে ‘AgSpeak’ নামক একটি কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তাচালিত অ্যাপ তৈরি করেছিল। সেই অ্যাপটি ৫০০ কৃষক এবং দুটি চা বাগানে পরীক্ষা করা হয়েছিল এবং আলু ব্লাইট ও চা মশা-পোকার আক্রমণের পূর্বাভাস দিতে সফল হয়েছিল। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কৃষি বিকাশ’ অ্যাপটি সেই ধারাকে এগিয়ে নিয়ে গিয়ে বরাক উপত্যকার প্রেক্ষাপটে আরও স্থানীয়ভাবে কার্যকর একটি সমাধান হাজির করছে।
বরাক উপত্যকার কৃষি খাতে প্রযুক্তির প্রয়োজনীয়তা
বরাক উপত্যকার কৃষি অর্থনীতিতে এই ধরনের প্রযুক্তি-সহায়ক উদ্যোগের গুরুত্ব অপরিসীম। কাছাড়, হাইলাকান্দি ও করিমগঞ্জ — এই তিন জেলায় ধান, সরিষা, শাকসবজি এবং বিভিন্ন ফলের চাষ ব্যাপকভাবে হয়। তবে অধিকাংশ কৃষক এখনো ঐতিহ্যবাহী পদ্ধতিতে চাষ করেন এবং রোগবালাই বা পোকামাকড়ের আক্রমণ সম্পর্কে সময়মতো তথ্য না পেয়ে প্রতি বছর উল্লেখযোগ্য ফসলহানির শিকার হন। একটি সহজলভ্য মোবাইল অ্যাপের মাধ্যমে যদি এই তথ্যের ঘাটতি পূরণ করা যায়, তাহলে কৃষকদের উৎপাদন ও আয় উভয়ই বৃদ্ধি পাওয়ার সম্ভাবনা রয়েছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী বরাক উপত্যকা পরিদর্শনের সময় বলেছিলেন, “বরাক ভ্যালি এখন কৃষি গবেষণা ও শিক্ষার কেন্দ্র হয়ে উঠবে।” তিনি পাথারকান্দিতে এই অঞ্চলের প্রথম কৃষি কলেজ প্রতিষ্ঠার ঘোষণাও করেন এবং বলেন এটি স্থানীয় তরুণদের কৃষি-স্টার্টআপ চালু করতে সহায়তা করবে। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কৃষি বিকাশ’ অ্যাপ সেই বৃহত্তর লক্ষ্যের সঙ্গে সঙ্গতিপূর্ণ একটি বাস্তব পদক্ষেপ।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের কৃষকদের জন্য সুযোগ
হাইলাকান্দি জেলায় কৃষি একটি প্রধান জীবিকা। লালা টাউন ও তার আশেপাশের গ্রামগুলোতে বহু পরিবার এখনো কৃষির উপর নির্ভরশীল। এই অঞ্চলের কৃষকদের প্রধান সমস্যাগুলোর মধ্যে রয়েছে বিশেষজ্ঞ পরামর্শের অভাব, বাজার মূল্য সম্পর্কে সঠিক তথ্যের ঘাটতি এবং ফসলের রোগবালাই সম্পর্কে সময়মতো সতর্কতার অভাব। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘কৃষি বিকাশ’ অ্যাপটি যদি স্থানীয় ভাষায় এবং সহজলভ্য উপায়ে এই তথ্যগুলো দিতে পারে, তাহলে হাইলাকান্দি জেলার কৃষকরাও সরাসরি উপকৃত হতে পারবেন।
উল্লেখ্য, বরাক উপত্যকায় কৃষি প্রযুক্তির ব্যবহার ইতিমধ্যে শুরু হয়েছে। কাছাড় জেলার ‘গ্র্যাজুয়েট ফার্মার’ উদ্যোগ ইতিমধ্যে একশোরও বেশি কৃষককে আধুনিক পদ্ধতিতে চাষাবাদের সঙ্গে যুক্ত করেছে এবং বার্ষিক ২০ শতাংশ বৃদ্ধির রেকর্ড তৈরি করেছে। আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই অ্যাপ সেই গতিকে আরও বেগবান করতে পারে।
কৃষি প্রযুক্তির ভবিষ্যৎ পথ আসাম বিশ্ববিদ্যালয়ের এই উদ্যোগ বৃহত্তর একটি জাতীয় লক্ষ্যমাত্রার সঙ্গে মিলে যায়। কেন্দ্রীয় কৃষি মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী, ভারতে PM-Kisan Samman Nidhi প্রকল্পের আওতায় আসামের কৃষকদের কাছে এ পর্যন্ত ২০,০০০ কোটি টাকারও বেশি অর্থ সহায়তা পৌঁছেছে। পাশাপাশি আসামের কৃষিমন্ত্রী অতুল বোরা জানিয়েছেন যে ২০২৬-২৭ সালের মধ্যে আসামের কৃষিপণ্য রপ্তানি ১০,০০০ কোটি টাকায় পৌঁছানোর লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। আর্থিক সহায়তা ও প্রযুক্তিগত উদ্যোগের এই দ্বিমুখী প্রচেষ্টায় ‘কৃষি বিকাশ’ অ্যাপ যদি বরাক উপত্যকার কৃষকদের কাছে সত্যিকার অর্থেই পৌঁছাতে পারে, তাহলে এটি এই অঞ্চলের কৃষি অর্থনীতিতে দীর্ঘমেয়াদি ইতিবাচক পরিবর্তন আনতে সক্ষম হবে বলে কৃষি বিশেষজ্ঞরা আশাবাদ প্রকাশ করছেন।