
আসাম জাতীয় পরিষদ বা AJP-র গুয়াহাটি সেন্ট্রাল কেন্দ্রের প্রার্থী কুনকি চৌধুরীকে নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে গুয়াহাটি পুলিশ আনুষ্ঠানিকভাবে তলব করেছে। পানবাজার থানা থেকে ভারতীয় নাগরিক সুরক্ষা সংহিতা বা BNSS-এর ৩৫(৩) ধারায় জারি করা নোটিশে ১২ এপ্রিল সকাল ১১টায় থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তার কাছে হাজির হতে বলা হয়েছে। ৯ এপ্রিল ভোটের দিনের ঘটনাকে কেন্দ্র করে FIR দায়েরের পর এই তলব নোটিশ পাঠানো হলো এই কুনকি চৌধুরী AJP নির্বাচনী আচরণবিধি লঙ্ঘন মামলায়। পুলিশ জানিয়েছে, তদন্তে কুনকি চৌধুরীকে জিজ্ঞাসাবাদের যথেষ্ট কারণ রয়েছে।
FIR-এ কী অভিযোগ করা হয়েছে
পানবাজার থানায় FIR দায়ের করেছেন গুয়াহাটির রেহাবাড়ি এলাকার বাসিন্দা নবকুমার লহকর। Times of India-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, নবকুমার লহকর তাঁর অভিযোগে দাবি করেছেন যে কুনকি এবং তাঁর পক্ষের কর্মী সন্দীপ যাদব এমন বেশ কিছু কাজ করেছেন যা “নির্বাচনের সুষ্ঠুতা ও পবিত্রতাকে সরাসরি ক্ষুণ্ণ করে।” প্রধান অভিযোগগুলো নিম্নরূপ:
প্রথমত, হরিয়ানার বাসিন্দা সন্দীপ যাদব কুনকির সামাজিক মাধ্যম দলের প্রধান এবং নির্বাচন কৌশলবিদ হিসেবে কর্মরত ছিলেন। নির্বাচনী বিধিমালা অনুযায়ী, কোনো বাইরের রাজনৈতিক কর্মীকে ভোটের ৪৮ ঘণ্টা আগেই কেন্দ্র ছেড়ে চলে যেতে হয়। কিন্তু সন্দীপ যাদব নির্ধারিত সময়সীমা পেরিয়েও গুয়াহাটি সেন্ট্রালে উপস্থিত ছিলেন এবং নির্বাচন-সংক্রান্ত কাজে সক্রিয় অংশগ্রহণ অব্যাহত রেখেছিলেন বলে FIR-এ উল্লেখ করা হয়েছে।
দ্বিতীয়ত, FIR-এ দাবি করা হয়েছে যে কুনকি চৌধুরী নিজে পানবাজার হাইস্কুলের একটি ভোটকেন্দ্রের ভেতরে ৫-৬ জনের দল নিয়ে প্রবেশ করেন এবং এমনভাবে ভোটারদের সঙ্গে কথা বলেন যা ভোটের সিদ্ধান্তকে প্রভাবিত করতে পারে। এটি নির্বাচনী বিধিমালায় “অযাচিত প্রভাব” এবং “নির্বাচনী প্রক্রিয়ায় হস্তক্ষেপ” হিসেবে বিবেচিত। তৃতীয়ত, ভোটকেন্দ্রের নিষিদ্ধ অঞ্চলে তাঁর দুটি গাড়ি পার্ক করার এবং অননুমোদিত নিরাপত্তাকর্মী ভোটকেন্দ্রের অভ্যন্তরে উপস্থিত থাকার অভিযোগও রয়েছে। এ ছাড়া নীরবতার সময়কালে ভোটারদের সঙ্গে যোগাযোগের অভিযোগও FIR-এ অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে এবং ডিজিটাল ও ভিডিও প্রমাণ পুলিশের কাছে জমা দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।
কুনকি চৌধুরীর জবাব: ‘অভিযোগ ভিত্তিহীন ও রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত’
FIR দায়েরের পর কুনকি চৌধুরী সামাজিক মাধ্যমে তাঁর বক্তব্য জানিয়েছেন। Assam Tribune-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, তিনি স্বীকার করেছেন যে তাঁর বিরুদ্ধে ও তাঁর দলের সদস্যদের বিরুদ্ধে FIR দায়ের হয়েছে এবং তাঁর কিছু সহযোগীকে রাতভর আটক রাখা হয়েছে। তিনি নিজে পানবাজার থানায় গিয়ে জবানবন্দি দিতে চেয়েছিলেন, কিন্তু জানিয়েছেন যে মহিলার জবানবন্দি রেকর্ড করার জন্য নির্দিষ্ট আইনি পদ্ধতি অনুসরণ করতে হয়, তাই তা সঙ্গে সঙ্গে সম্ভব হয়নি।
সমস্ত অভিযোগ দৃঢ়ভাবে অস্বীকার করে কুনকি বলেন, তাঁর প্রচারণা দল Election Commission-এর সমস্ত নির্দেশিকা পরিপূর্ণভাবে মেনে চলেছে। তিনি এই আইনি পদক্ষেপকে “রাজনৈতিক উদ্দেশ্যপ্রণোদিত” বলে আখ্যা দিয়েছেন এবং দাবি করেছেন, AJP-র ক্রমবর্ধমান জনসমর্থন দেখে প্রতিপক্ষ এই মামলা ঠুকে দিয়েছে। উল্লেখ্য, এর আগে ৪ এপ্রিল কুনকি নিজেও পানবাজার সাইবার পুলিশ স্টেশনে একটি অভিযোগ দায়ের করেছিলেন। সেই অভিযোগে তিনি কিছু অজ্ঞাত সামাজিক মাধ্যম পরিচালনাকারীর বিরুদ্ধে AI-তৈরি নকল ভিডিও ছড়িয়ে তাঁর ও তাঁর পরিবারের সুনাম নষ্ট করার অভিযোগ এনেছিলেন।
আসাম নির্বাচনী রাজনীতিতে তরুণ কণ্ঠস্বর
কুনকি চৌধুরী এই নির্বাচনের সবচেয়ে আলোচিত মুখগুলোর একটি। মাত্র ২৭ বছর বয়সী এই তরুণীকে AJP মনোনীত করেছিল গুয়াহাটি সেন্ট্রাল থেকে — যেখানে তাঁর প্রতিদ্বন্দ্বী BJP-র বিজয় কুমার গুপ্ত একজন পরিচিত রাজনৈতিক মুখ। এই নির্বাচনে তিনি কংগ্রেস-AJP জোটের প্রতিনিধি হিসেবে লড়াই করেছেন। তাঁকে কেন্দ্র করে এই আইনি বিতর্ক শুধু ব্যক্তিগত রাজনৈতিক লড়াই নয় — এটি ২০২৬ সালের আসাম নির্বাচনে বিরোধী দল ও ক্ষমতাসীন দলের মধ্যে তীব্র প্রতিযোগিতার একটি প্রতিফলন।
পুলিশ স্পষ্টভাবে জানিয়েছে, তলব মেনে না আসলে গ্রেপ্তারসহ কঠোর আইনি পদক্ষেপ নেওয়া হতে পারে। আসামের নির্বাচন মামলায় Model Code of Conduct লঙ্ঘনের অভিযোগ নতুন নয় — ২০২১ সালের বিধানসভা নির্বাচনে মোট ২,৮১৩টি MCC লঙ্ঘনের অভিযোগ দায়ের হয়েছিল বলে তৎকালীন মুখ্য নির্বাচনী কর্মকর্তা নিতিন খাড়ে জানিয়েছিলেন।
লালা ও হাইলাকান্দির রাজনৈতিক প্রাসঙ্গিকতা
গুয়াহাটি সেন্ট্রালের এই ঘটনা হাইলাকান্দি জেলা ও লালা টাউনের ভোটারদের কাছে একটি বৃহত্তর বার্তা দেয়। নির্বাচনী আচরণবিধি মেনে চলা এবং নির্বাচনী প্রক্রিয়ার সুষ্ঠুতা রক্ষা করা শুধু কোনো একটি কেন্দ্রের বিষয় নয় — এটি সমগ্র গণতান্ত্রিক ব্যবস্থার ভিত্তি। হাইলাকান্দি আসনেও এই নির্বাচনে বিভিন্ন দলের প্রার্থীরা কড়া প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়েছেন এবং Election Commission-এর নির্দেশিকা মেনে চলা প্রতিটি কেন্দ্রে সমানভাবে গুরুত্বপূর্ণ ছিল।
১২ এপ্রিল কুনকি চৌধুরীর পুলিশ হাজিরার পর এই মামলার গতিপ্রকৃতি আরও স্পষ্ট হবে। ৪ মে ভোট গণনার আগে এই আইনি জটিলতা AJP ও কংগ্রেস জোটের জন্য একটি বাড়তি চ্যালেঞ্জ তৈরি করেছে। তদন্তে ডিজিটাল ও ভিডিও প্রমাণ পরীক্ষা করার পর আসল সত্য উদঘাটিত হলে কী ব্যবস্থা নেওয়া হবে — সেটাই এখন সবার নজরে রয়েছে।