
আসন্ন বিধানসভা নির্বাচন ও উপনির্বাচনের আগে নির্বাচনে ৬৫০ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত করা হয়েছে বলে ভারতের নির্বাচন কমিশন (Election Commission of India বা ECI) জানিয়েছে। সরকারি বার্তা সংস্থা অল ইন্ডিয়া রেডিও (All India Radio)-র নিউজ পোর্টাল NewsOnAir.gov.in-এ প্রকাশিত ECI-র সরকারি বিবৃতিতে এই তথ্য নিশ্চিত করা হয়েছে। ভোটকে প্রভাবিত করতে পারে এমন নগদ টাকা, মদ, মাদকদ্রব্য, মূল্যবান ধাতু এবং বিনামূল্যে বিতরণযোগ্য উপহারসামগ্রী (freebies) জব্দ করে এই বিশাল অঙ্কের বাজেয়াপ্তি সম্ভব হয়েছে। ভোটের দিন এগিয়ে আসার সঙ্গে সঙ্গে অবৈধ অর্থ ও উপহার বিতরণ বন্ধে নির্বাচন কমিশন তার নজরদারি ব্যবস্থা আরও কঠোর করেছে।
আসামে ৯ এপ্রিল বিধানসভা ভোটগ্রহণ। এর পাশাপাশি দেশের একাধিক রাজ্যে উপনির্বাচনও অনুষ্ঠিত হচ্ছে। এই প্রেক্ষাপটে ECI-র এই বাজেয়াপ্তির পরিসংখ্যান দেশজুড়ে নির্বাচনী সুষ্ঠুতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে পরিচালিত বৃহত্তর অভিযানের অংশ।
কী কী বাজেয়াপ্ত হয়েছে: বিভিন্ন শ্রেণিতে জব্দের চিত্র
নির্বাচন কমিশনের বাজেয়াপ্তি তালিকায় সাধারণত কয়েকটি প্রধান শ্রেণি থাকে। প্রথমত নগদ অর্থ, যা ভোটারদের সরাসরি প্রলুব্ধ করতে ব্যবহার হওয়ার আশঙ্কায় জব্দ করা হয়। দ্বিতীয়ত মদ বা অ্যালকোহলজাতীয় পানীয়, যা বিশেষত গ্রামাঞ্চলে ভোটারদের প্রভাবিত করার হাতিয়ার হিসেবে বিতরণ করা হয় বলে অভিযোগ পাওয়া যায়। তৃতীয়ত মাদকদ্রব্য (narcotics), চতুর্থত সোনা-রুপার মতো মূল্যবান ধাতু এবং পঞ্চমত বিনামূল্যে বিতরণযোগ্য উপহারসামগ্রী — যেমন কাপড়, শাড়ি, ইলেকট্রনিক গ্যাজেট ইত্যাদি। ECI-র সরকারি বিজ্ঞপ্তি অনুযায়ী, নির্বাচনে ৬৫০ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত-এর এই সামগ্রিক পরিসংখ্যানটি সব রাজ্যের যৌথ হিসাব।
নির্বাচন কমিশন এই উদ্দেশ্যে একাধিক বাহিনী মাঠে নামিয়েছে। কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী, রাজ্য পুলিশ, আয়কর বিভাগ (Income Tax Department), শুল্ক বিভাগ (Customs), নারকোটিক্স কন্ট্রোল ব্যুরো (Narcotics Control Bureau বা NCB) এবং রাজ্য আবগারি বিভাগ (State Excise Department) একযোগে কাজ করছে। এছাড়া ECI-র নির্দেশে প্রতিটি বিধানসভা কেন্দ্রে ভিজিল্যান্স টিম (Vigilance Team) ও ফ্লাইং স্কোয়াড (Flying Squad) মোতায়েন করা হয়েছে, যারা সন্দেহজনক যানবাহন ও ব্যক্তিদের তল্লাশি করছে।
ECI-র নজরদারি ব্যবস্থা ও সি-ভিজিল অ্যাপ
ECI নজরদারি ২০২৬-এর কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে একটি বহুস্তরীয় নিরীক্ষা ব্যবস্থা। নির্বাচন কমিশনের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ নাগরিক সরঞ্জাম হলো cVIGIL অ্যাপ, যেখানে যেকোনো নাগরিক ভোটবিধি লঙ্ঘনের ছবি বা ভিডিও তুলে সরাসরি কমিশনে পাঠাতে পারেন। ECI-র প্রতিশ্রুতি, এই অ্যাপে অভিযোগ জানানোর ১০০ মিনিটের মধ্যে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ ব্যবস্থা নেবে।
পাশাপাশি নির্বাচন কমিশন প্রতিটি জেলায় একটি করে জেলা নির্বাচন কার্যালয় (District Election Office) সক্রিয় রেখেছে, যেখানে ২৪ ঘণ্টা নিয়ন্ত্রণ কক্ষ (control room) চালু রয়েছে। কোনো অনিয়মের অভিযোগ এলে সেখান থেকে তাৎক্ষণিক তদন্ত শুরু হয়। নির্বাচন কমিশন অবৈধ সম্পদ জব্দ অভিযানে ব্যবহৃত আরেকটি পদ্ধতি হলো চেক পোস্ট (check post) স্থাপন — প্রতিটি সংসদীয় ও বিধানসভা কেন্দ্রের সীমান্তবর্তী রাস্তায় স্থাপিত এই চৌকিগুলি ২৪ ঘণ্টা সক্রিয় থাকে।
আসাম ও বরাক উপত্যকায় অভিযানের পরিস্থিতি
আসামে ৯ এপ্রিলের ভোটের আগে রাজ্য নির্বাচন যন্ত্র পুরোদমে সক্রিয় হয়েছে। আসামের মুখ্য নির্বাচনী আধিকারিক (Chief Electoral Officer)-এর কার্যালয় থেকে জানানো হয়েছে যে রাজ্যজুড়ে ফ্লাইং স্কোয়াড এবং স্ট্যাটিক সার্ভেল্যান্স টিম মাঠে নামানো হয়েছে। আসামে বিশেষত মিয়াও (Miyo) করিডোর এবং মিজোরাম-মণিপুর সংলগ্ন অঞ্চলে মাদক পাচারের ঝুঁকি বেশি থাকায় সেইসব সীমান্ত সড়কে অতিরিক্ত চেক পোস্ট বসানো হয়েছে।
আসাম ভোট কালো টাকা মদ উদ্ধার প্রসঙ্গে বরাক উপত্যকার পরিস্থিতিও বিশেষভাবে উল্লেখযোগ্য। হাইলাকান্দি, কাছাড় ও শ্রীভূমি জেলায় মিজোরাম সীমান্ত সংলগ্ন এলাকা থেকে প্রতিটি নির্বাচনের আগে মদ ও মাদক পাচারের অভিযোগ পাওয়া যায়। লালা বাজার এবং হাইলাকান্দি জেলার বাসিন্দারা যদি কোথাও সন্দেহজনক কার্যকলাপ দেখেন — যেমন গাড়ি থেকে বড় অঙ্কের নগদ অর্থ বিতরণ, মদ বা উপহার দিয়ে ভোটারদের প্রলুব্ধ করার চেষ্টা — তাহলে cVIGIL অ্যাপে অবিলম্বে অভিযোগ জানাতে পারেন। এছাড়া জেলা নির্বাচন কার্যালয়ের হেল্পলাইনে ফোন করেও সহায়তা নেওয়া যাবে।
ভোটার এবং নাগরিকদের জন্য সচেতনতার বার্তা
নির্বাচনে ৬৫০ কোটি টাকার সম্পদ বাজেয়াপ্ত-এর এই পরিসংখ্যান একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয় — অবৈধ অর্থ ও সামগ্রী ব্যবহার করে ভোটকে প্রভাবিত করার চেষ্টা এখনও ব্যাপকভাবে হচ্ছে এবং নির্বাচন কমিশন তা ঠেকাতে সক্রিয়। ECI বারবার নাগরিকদের মনে করিয়ে দিচ্ছে যে কোনো প্রার্থী বা তার প্রতিনিধির কাছ থেকে নগদ টাকা, মদ বা উপহার গ্রহণ করা নির্বাচনী আইনের লঙ্ঘন এবং তা গ্রহণকারীকেও আইনি জটিলতায় ফেলতে পারে।
৯ এপ্রিলের ভোটের দিন পর্যন্ত নির্বাচন কমিশন অবৈধ সম্পদ জব্দ অভিযান অব্যাহত থাকবে। প্রতিটি ভোটকেন্দ্রে কেন্দ্রীয় আধাসামরিক বাহিনী মোতায়েন থাকবে এবং বিধানসভা কেন্দ্রগুলিতে ওয়েবকাস্টিং (webcasting)-এর মাধ্যমে নির্বাচন কমিশনের কেন্দ্রীয় নিয়ন্ত্রণ কক্ষ থেকে সরাসরি নজরদারি চলবে। সুষ্ঠু ও অবাধ নির্বাচন নিশ্চিত করার এই প্রচেষ্টায় প্রতিটি সচেতন ভোটারের সক্রিয় অংশগ্রহণই সবচেয়ে বড় শক্তি।