
আসাম বিধানসভা নির্বাচনের ভোটগ্রহণ সম্পন্ন হওয়ার পরেও রাজ্যের রাজনৈতিক বিবাদ থামছে না। ১০ এপ্রিল কংগ্রেস সাংসদ ও আসাম প্রদেশ কংগ্রেস কমিটির সভাপতি গৌরব গোগৈ সরাসরি মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মার বিরুদ্ধে তীব্র আক্রমণ শানিয়েছেন। গৌরব গোগৈ হিমন্ত পাসপোর্ট বিতর্ক প্রসঙ্গে বলেছেন, কংগ্রেস নেতা পবন খেরার সংবাদ সম্মেলনের পর থেকে CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা “আতঙ্কিত” হয়ে পড়েছেন এবং সাংবাদিক ও মিডিয়া মালিকদের ভয় দেখাচ্ছেন। গোগৈ জানিয়েছেন, এই ঘটনায় আগামী দিনে আরও “চমকপ্রদ তথ্য” প্রকাশ পাবে এবং সত্যকে ক্ষমতার জোরে চাপা দেওয়া সম্ভব নয়।
পাসপোর্ট বিতর্কের শুরু: পবন খেরার অভিযোগ ও প্রতিক্রিয়া
এই বিতর্কের সূচনা ৪ এপ্রিল। কংগ্রেসের All India Congress Committee (AICC)-এর মিডিয়া ও প্রচার বিভাগের প্রধান পবন খেরা নয়াদিল্লিতে AICC সদর দফতরে সংবাদ সম্মেলন করে অভিযোগ করেন যে আসামের মুখ্যমন্ত্রীর স্ত্রী রিণিকী ভুঁইয়া শর্মার কাছে তিনটি বিদেশি পরিচয়পত্র রয়েছে। LalaBazar.com-এর আগের প্রতিবেদনেও এই অভিযোগের বিস্তারিত তুলে ধরা হয়েছিল।
খেরার দাবি অনুযায়ী, তিনটি নথি হল — UAE-র একটি গোল্ডেন কার্ড (মেয়াদ ২০২৭ পর্যন্ত), মিশরের একটি পাসপোর্ট (মেয়াদ ২০২৯ পর্যন্ত) এবং অ্যান্টিগুয়া-বার্বুডার একটি পাসপোর্ট (মেয়াদ ২০৩১ পর্যন্ত)। Hindustan Times ও Eisamay-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, খেরা এই অভিযোগের সঙ্গে ভারতীয় সংবিধানের ৯ নম্বর অনুচ্ছেদ এবং নাগরিকত্ব আইন ১৯৫৫-এর ৯ নম্বর ধারার প্রসঙ্গও তোলেন, যেখানে বলা রয়েছে যে কোনো ভারতীয় নাগরিক স্বেচ্ছায় বিদেশি নাগরিকত্ব নিলে তাঁর ভারতীয় নাগরিকত্ব স্বয়ংক্রিয়ভাবে বাতিল হয়ে যায়। Eisamay-এর বরাতে জানা গেছে, খেরা প্রশ্ন তোলেন, “ভোটে হেরে গেলে কি বিদেশে উড়ে যাওয়ার পরিকল্পনা করছেন তাঁরা?”
৫ এপ্রিল পবন খেরা গুয়াহাটিতে পৌঁছান এবং গৌরব গোগৈ ও ছত্তীশগড়ের প্রাক্তন মুখ্যমন্ত্রী ভূপেশ বাঘেলের সঙ্গে আরেকটি যৌথ সংবাদ সম্মেলনে এই অভিযোগ পুনরায় তুলে ধরেন। The News Mill ও The Telegraph India-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, কংগ্রেস CM হিমন্তকে শপথপত্রে ঘোষণা করতে বলে যে তাঁর পরিবারের কোনো বিদেশি পাসপোর্ট বা বিদেশে সম্পত্তি নেই।
হিমন্তের পাল্টা আক্রমণ: FIR থেকে পুলিশি অভিযান
CM হিমন্ত বিশ্ব শর্মা শুরু থেকেই এই অভিযোগগুলোকে সম্পূর্ণ মিথ্যা এবং কৃত্রিম বুদ্ধিমত্তা (AI)-নির্মিত জাল নথি-ভিত্তিক বলে বাতিল করে দেন। ANI-র প্রতিবেদনে জানা যায়, হিমন্ত X-এ ছয়টি অসঙ্গতি চিহ্নিত করেন — নামের বানানের ভুল, UAE পরিচয়পত্র নম্বরের অমিল এবং জাতীয়তার তথ্যে গরমিল। তিনি একে “একটি অপটু ও খারাপভাবে কার্যকর ডিজিটাল কারসাজির প্রচেষ্টা” বলে অভিহিত করেছেন। LalaBazar.com-এর পূর্ববর্তী প্রতিবেদনে উঠে এসেছে, হিমন্ত আরও দাবি করেছেন যে এই অভিযোগগুলো একটি পাকিস্তানি সোশ্যাল মিডিয়া গ্রুপ সরবরাহ করেছে।
রিণিকী ভুঁইয়া শর্মা পবন খেরার বিরুদ্ধে একটি FIR দায়ের করেন এবং সেই FIR-এর ভিত্তিতে আসাম পুলিশ ৬ এপ্রিল নয়াদিল্লিতে পবন খেরার বাসস্থানে অভিযান চালায়। হিমন্ত বলেন, “গতকাল আমার স্ত্রী একটি FIR দায়ের করেছেন এবং আমি নিশ্চিত যে পুলিশ আইনের যথাযথ ধারায় মামলাটি নথিভুক্ত করবে।” ৭ এপ্রিল হিমন্ত আরও এক ধাপ এগিয়ে কংগ্রেসকে শপথচ্যালেঞ্জ ছুড়ে দেন। পাল্টা দিকে, LalaBazar.com-এর তথ্য অনুযায়ী হিমন্তের স্ত্রী রিণিকীও গৌরব গোগৈয়ের স্ত্রীর পাকিস্তানের সঙ্গে ব্যাংক লেনদেনের অভিযোগ তোলেন।
দুই নেতার ব্যক্তিগত দ্বন্দ্বের পটভূমি
এই পাসপোর্ট বিতর্ককে বিচ্ছিন্নভাবে দেখলে চলবে না — এটি ২০২৬ সালের আসাম বিধানসভা নির্বাচনকে ঘিরে হিমন্ত-গোগৈ ব্যক্তিগত প্রতিদ্বন্দ্বিতার একটি অংশ। Economic Times-এর বিশ্লেষণ অনুযায়ী, এই নির্বাচন মূলত দুটি ব্যক্তিত্বের মধ্যে লড়াই হয়ে উঠেছিল। India Today-র প্রতিবেদনে জানা যায়, হিমন্ত এর আগেই গৌরব গোগৈয়ের বিরুদ্ধে পাসপোর্ট ইস্যু তুলেছিলেন — তিনি অভিযোগ করেছিলেন যে গোগৈয়ের ব্রিটিশ স্ত্রী এলিজাবেথ কোলবার্নের সঙ্গে পাকিস্তানি গোয়েন্দা সংস্থার যোগাযোগ রয়েছে। গোগৈ সেই অভিযোগকে “সি গ্রেড সিনেমার থেকেও খারাপ” বলে উড়িয়ে দিয়েছিলেন। কংগ্রেসের পবন খেরার সংবাদ সম্মেলন সেই দ্বন্দ্বেই একটি নতুন অধ্যায় যোগ করেছে।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার প্রাসঙ্গিকতা
আসামের এই উত্তাল রাজনৈতিক পরিবেশে হাইলাকান্দি জেলা সহ বরাক উপত্যকার মানুষের দৃষ্টি ভোটের ফলাফলের দিকে। বরাক উপত্যকার তিনটি জেলায় মোট ১৫টি বিধানসভা কেন্দ্র রয়েছে এবং এই অঞ্চলের বাংলাভাষী হিন্দু ও মুসলিম ভোটারদের রায় রাজ্যের সরকার গঠনে ঐতিহাসিকভাবে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। হাইলাকান্দির লালা, কাটলিছড়া ও সোনাইয়ের মতো কেন্দ্রগুলোর ভোটাররা পাসপোর্ট বিতর্কের মতো জাতীয় স্তরের বিতর্ককে কতটা গুরুত্ব দিয়েছেন, তা ভোট গণনার পরেই স্পষ্ট হবে। তবে রাজ্য রাজনীতির এই তীব্র দ্বন্দ্বের উত্তাপ বরাক উপত্যকার রাজনৈতিক আলোচনায়ও পৌঁছেছে।
ভোটের পরেও থামছে না রাজনৈতিক বিতর্ক
ভোটগ্রহণ শেষ হলেও রাজনৈতিক বাদানুবাদ থামেনি — এটি আসামের বর্তমান পরিস্থিতি দেখে আরও স্পষ্ট। গৌরব গোগৈ হিমন্ত পাসপোর্ট বিতর্ক নিয়ে ১০ এপ্রিল বলেছেন, “ক্ষমতার জোরে সত্যকে চাপা দেওয়া যায় না।” তিনি ইঙ্গিত দিয়েছেন যে আগামী দিনগুলোতে আরও নতুন তথ্য সামনে আসবে। পাল্টাদিকে হিমন্ত শিবির এখনও FIR ও আইনগত লড়াইয়ের পথে রয়েছে।
ভোট গণনার ফলাফল প্রকাশ পেলেই বোঝা যাবে এই পাসপোর্ট বিতর্ক আসলে ভোটারদের মতামত কতটা প্রভাবিত করেছে। জয়-পরাজয় যা-ই হোক, হিমন্ত বনাম গোগৈয়ের এই দীর্ঘ রাজনৈতিক লড়াই আগামী দিনেও আসামের রাজনীতির কেন্দ্রে থাকবে — এটুকু নিশ্চিত।