Hailakandi gets a Medical College – What does this mean for healthcare in Lala?
বরাক উপত্যকার দক্ষিণ প্রান্তে, পাহাড় আর চা-বাগান ঘেরা হাইলাকান্দি জেলার ছোট্ট শহর লালা। এখানকার মানুষের জীবনে একটা নিঃশব্দ সংকট বহু বছর ধরে চলে আসছে – গুরুতর অসুখ মানেই ব্যাগ গুছিয়ে শিলচরের পথে রওনা। কিন্তু ২০২৫ সালের অসম বাজেটে রাজ্য সরকার ঘোষণা করেছে যে হাইলাকান্দিতে একটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ প্রতিষ্ঠিত হতে চলেছে। এই একটিমাত্র সিদ্ধান্ত লালার মতো ছোট শহরের জন্য কী পরিবর্তন বয়ে আনতে পারে, সেটাই এই লেখার বিষয়।
লালার বর্তমান স্বাস্থ্যসেবার বাস্তবতা: লালা PHC এবং তার সীমাবদ্ধতা
হাইলাকান্দি জেলার দুটি শহরের একটি হলো লালা – অন্যটি জেলা সদর হাইলাকান্দি। লালা পৌরসভার অধীনে রয়েছে ১০টি ওয়ার্ড, এবং এটি একটি আলাদা ব্লক প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রের (BPHC) সদর দপ্তরও বটে। জাতীয় স্বাস্থ্য মিশনের তালিকা অনুযায়ী, লালা PHC অসমের সেই ২৪×৭ প্রাথমিক স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির একটি, যেখানে তাত্ত্বিকভাবে দিনরাত চিকিৎসা পরিষেবা পাওয়ার কথা।
তাত্ত্বিকভাবে – কারণ বাস্তবটা ভিন্ন। ভারতীয় জনস্বাস্থ্য মানদণ্ড (IPHS) অনুযায়ী একটি PHC মূলত একজন চিকিৎসক পরিচালিত একটি ইউনিট, যেখানে ১০টির মতো ইনডোর বিছানা থাকে, ছোটখাটো অস্ত্রোপচারের ব্যবস্থা থাকে, এবং এটি ৬টি সাব-সেন্টারের রেফারেল ইউনিট হিসাবে কাজ করে। অর্থাৎ সর্দি-কাশি, সাধারণ জ্বর, গর্ভবতী মায়েদের রুটিন পরীক্ষা, টিকাদান, ডায়রিয়া, হালকা ট্রমা – এ ধরনের প্রাথমিক যত্ন এখানে পাওয়া যায়। কিন্তু হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, গুরুতর দুর্ঘটনা, জটিল প্রসব, ক্যান্সার, কিডনি বিকল, ICU-প্রয়োজনীয় যেকোনো পরিস্থিতি – এসবের জন্য লালা PHC কার্যত কিছু করতে পারে না। বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক নেই, আধুনিক প্যাথলজি নেই, CT বা MRI নেই, ডায়ালাইসিস নেই, ভেন্টিলেটর নেই।
লালার মানুষজন বলেন, রাতে যদি জরুরি প্রয়োজন হয়, তবে অনেক সময় কর্তব্যরত চিকিৎসকের নাগাল পাওয়াই কঠিন। ওষুধ সরবরাহে ঘাটতি, পরিচ্ছন্নতার সমস্যা, এবং সীমিত জনবল – এগুলো বরাক উপত্যকার গ্রামীণ স্বাস্থ্যকেন্দ্রগুলির চেনা অভিযোগ।
লালার মানুষ এখন বিশেষায়িত চিকিৎসার জন্য কতটা পথ পাড়ি দেন
যদি লালা PHC থেকে কাউকে রেফার করতে হয়, তাহলে পরবর্তী গন্তব্য সাধারণত হাইলাকান্দির S.K. রায় সিভিল হাসপাতাল – জেলার একমাত্র বড় সরকারি হাসপাতাল। লালা থেকে হাইলাকান্দি শহরের দূরত্ব প্রায় ২০–২২ কিলোমিটার, এবং এই হাসপাতাল সম্পর্কে রোগীদের প্রতিক্রিয়া মিশ্র। অনলাইন রিভিউ এবং স্থানীয় রিপোর্টগুলিতে বারবার উঠে এসেছে একটি অভিযোগ – এই হাসপাতাল প্রায়ই ছোট কারণেও রোগীদের শিলচর মেডিক্যাল কলেজে রেফার করে দেয়, কারণ সেখানে বিশেষজ্ঞ ও যন্ত্রপাতির ঘাটতি রয়েছে, এবং রাতের বেলায় চিকিৎসকের উপস্থিতিও অনেক সময় নিশ্চিত নয়।
ফলে বরাক উপত্যকার গুরুতর রোগীদের জন্য শেষ ভরসা সেই ৩৯ কিলোমিটারেরও বেশি দূরের শিলচর মেডিক্যাল কলেজ ও হাসপাতাল (SMCH)। লালা থেকে শিলচর – রাস্তায় গর্ত, বর্ষায় জলাবদ্ধতা, পাহাড়ি বাঁক, এবং কখনো কখনো বারাক নদীর ওপর যানজট – সব মিলিয়ে একটি সুস্থ মানুষের জন্যও যাত্রাটা ক্লান্তিকর। একজন হার্ট অ্যাটাকের রোগী বা গুরুতর প্রসব বেদনায় কাতর গর্ভবতী মায়ের জন্য এই এক-দেড় ঘণ্টার যাত্রা মৃত্যু এবং জীবনের মাঝখানের একটি ভঙ্গুর সেতু। বরাক উপত্যকায় “গোল্ডেন আওয়ার” – অর্থাৎ হার্ট অ্যাটাক বা ট্রমার পরের প্রথম এক ঘণ্টা – প্রায়শই রাস্তাতেই কেটে যায়।
ক্যান্সার বা কিডনি ডায়ালাইসিসের রোগীদের অবস্থা আরও করুণ। সপ্তাহে দুই-তিনবার শিলচরে যাওয়া-আসা মানে শুধু শারীরিক কষ্ট নয়, প্রতিটি সফরে যাতায়াত ও থাকার খরচ পরিবারের সঞ্চয় নিঃশেষ করে দেয়। উচ্চতর চিকিৎসার প্রয়োজন হলে রোগীরা গুয়াহাটি (প্রায় ৩৫০ কিমি) বা কলকাতা পর্যন্ত ছুটতে বাধ্য হন।
অসম বাজেট ২০২৫–এর ঘোষণা: হাইলাকান্দির জন্য কী প্রতিশ্রুতি
২০২৫ সালের ১০ মার্চ অসমের অর্থমন্ত্রী অজন্তা নেওগ বিধানসভায় ২০২৫-২৬ অর্থবর্ষের রাজ্য বাজেট পেশ করেন। মোট ২.৬৩ লক্ষ কোটি টাকার এই বাজেটে স্বাস্থ্য ও পরিবার কল্যাণ বিভাগের জন্য বরাদ্দ রাখা হয়েছে ৫,৩৯৩ কোটি টাকা। এর মধ্যে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ঘোষণাগুলির একটি ছিল – হাইলাকান্দিতে একটি নতুন মেডিক্যাল কলেজ স্থাপন করা হবে। একইসঙ্গে দাররাং এবং হোজাই জেলাতেও নতুন মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলার পরিকল্পনা ঘোষিত হয়।
এই ঘোষণা হঠাৎ আসেনি। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা এর আগেই একাধিকবার জানিয়েছিলেন যে, ২০২৯ সালের মধ্যে অসমে মোট ২৪টি মেডিক্যাল কলেজ গড়ে তোলাই সরকারের লক্ষ্য – ২০০৬ সালে রাজ্যে যেখানে মাত্র ৩টি মেডিক্যাল কলেজ ছিল, ২০২৫ সালে সেটি দাঁড়িয়েছে ১৪-তে, এবং সাম্প্রতিক বছরগুলিতে প্রাগজ্যোতিষপুর মেডিক্যাল কলেজ (গুয়াহাটি) সহ একাধিক নতুন কলেজ চালু হয়েছে। হাইলাকান্দি, গোয়ালপাড়া, মাজুলি, হোজাই এবং হাফলং – এই পাঁচটি জেলার জেলা হাসপাতালকে মেডিক্যাল কলেজে উন্নীত করার ঘোষণা আগে থেকেই ছিল; ২০২৫-এর বাজেট সেটিকে আর্থিক স্বীকৃতি দিয়েছে।
অসম বাজেটে এমবিবিএস আসন ৭২৬ থেকে বাড়িয়ে ১,৬০০ করার লক্ষ্য রাখা হয়েছে, এবং পিজি আসন ৩৮৬ থেকে ৭২২-তে উন্নীত করার পরিকল্পনা আছে। এর অর্থ – রাজ্যের চিকিৎসা শিক্ষার ভিত্তিই বদলে যাচ্ছে, এবং হাইলাকান্দির মেডিক্যাল কলেজ সেই বৃহত্তর পরিবর্তনের অংশ।
মেডিক্যাল কলেজ মানে কী: বেশি ডাক্তার, বিশেষজ্ঞ, জরুরি পরিষেবা
একটি মেডিক্যাল কলেজ শুধু একটি বড় হাসপাতাল নয় – এটি একটি সম্পূর্ণ স্বাস্থ্য ব্যবস্থা, যা একটি অঞ্চলের চিকিৎসা বাস্তবতাকে মৌলিকভাবে বদলে দেয়। অসমের বর্তমান পরিকল্পনা অনুযায়ী, নতুন মেডিক্যাল কলেজগুলি ৪০০–৫০০ শয্যার পূর্ণাঙ্গ হাসপাতাল সহ তৈরি হবে, যেখানে থাকবে চব্বিশ ঘণ্টার জরুরি বিভাগ, আধুনিক অপারেশন থিয়েটার, নিবিড় পরিচর্যা ইউনিট (ICU), নবজাতক নিবিড় পরিচর্যা (NICU), এবং আধুনিক রোগনির্ণয় সুবিধা।
হাইলাকান্দিতে মেডিক্যাল কলেজ হওয়ার অর্থ – কার্ডিওলজি, নিউরোলজি, অর্থোপেডিক্স, স্ত্রীরোগ, শিশু চিকিৎসা, সাধারণ শল্য, অনকোলজি, নেফ্রোলজির মতো বিভাগে স্থায়ী বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক থাকবেন। স্নাতকোত্তর (পিজি) কোর্স চালু হলে সেই বিশেষজ্ঞদের সঙ্গে জুনিয়র ডাক্তার, ইন্টার্ন এবং রেসিডেন্টরা মিলে একটি জীবন্ত চিকিৎসা ইকোসিস্টেম তৈরি হবে। এর ফলে হাসপাতাল কখনোই “চিকিৎসকশূন্য” হবে না – রাতে, শনি-রবিবার, উৎসবের দিন, বন্যার সময় – যেকোনো মুহূর্তে বিশেষজ্ঞের সেবা মিলবে।
লালার মতো কাছের শহরের মানুষের জন্য এর অর্থ আরও সুনির্দিষ্ট। হাইলাকান্দি শহর লালা থেকে মাত্র ২০-২২ কিলোমিটার দূরে – শিলচরের চেয়ে প্রায় অর্ধেক দূরত্ব। হার্ট অ্যাটাক, স্ট্রোক, গুরুতর ট্রমা বা জটিল প্রসব – এই সব পরিস্থিতিতে যে “গোল্ডেন আওয়ার”-এর কথা বলা হয়, সেটা ধরা যাবে। একজন হৃদরোগী যদি আধ ঘণ্টায় আধুনিক ক্যাথ ল্যাবে পৌঁছতে পারেন, তাঁর বাঁচার সম্ভাবনা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। দীর্ঘমেয়াদি রোগীদের (ক্যান্সার, ডায়ালাইসিস, যক্ষ্মা) জন্য এর অর্থ – আর প্রতি সপ্তাহে শিলচরে ছুটতে হবে না, পরিবারের সঞ্চয় ফুরিয়ে যাবে না, কর্মজীবন ভেঙে পড়বে না।
এছাড়াও, মেডিক্যাল কলেজ মানে স্থানীয় চাকরি – সিস্টার, টেকনিশিয়ান, ফার্মাসিস্ট, হাউসকিপিং, অ্যাম্বুলেন্স স্টাফ থেকে শুরু করে নিরাপত্তারক্ষী পর্যন্ত হাজার হাজার মানুষের কর্মসংস্থান। হাইলাকান্দির অর্থনীতিতে এটি একটি দীর্ঘস্থায়ী পরিবর্তন আনবে, এবং বরাক উপত্যকার শিক্ষিত তরুণ-তরুণীদের চাকরির জন্য গুয়াহাটি বা বাইরে যেতে হবে না।
এই অঞ্চলের অন্যান্য স্বাস্থ্য–সংক্রান্ত বিনিয়োগ: “ড্রিঙ্ক ফ্রম ট্যাপ” ও স্যানিটেশন
স্বাস্থ্যসেবা শুধু হাসপাতাল আর ডাক্তারের মধ্যে সীমাবদ্ধ নয় – বিশুদ্ধ পানীয় জল এবং স্যানিটেশন স্বাস্থ্যের সবচেয়ে মৌলিক ভিত্তি। ২০২৫ সালের বাজেটে অসম সরকার ঘোষণা করেছে যে হাইলাকান্দিসহ জোরহাট, করিমগঞ্জ (শ্রীভূমি) এবং শিলচরে “ড্রিঙ্ক ফ্রম ট্যাপ” প্রকল্প চালু হবে, যার আওতায় ২৪×৭ বিশুদ্ধ কলের জল সরবরাহ নিশ্চিত করা হবে। করিমগঞ্জ জেলার ক্ষেত্রে এই প্রকল্পের সম্প্রসারণ লালা এবং বদরপুর শহরেও পৌঁছনোর পরিকল্পনা রয়েছে।
বরাক উপত্যকার মতো বর্ষাপ্রবণ, বন্যাপ্রবণ অঞ্চলে এটি বিশাল তাৎপর্য বহন করে। প্রতি বছর বর্ষায় বারাক ও তার শাখানদীর জলে প্লাবিত হয় হাইলাকান্দি জেলার বিস্তীর্ণ অঞ্চল, এবং সেই সাথে আসে ডায়রিয়া, আমাশয়, টাইফয়েড, জন্ডিস, ডেঙ্গু – যেগুলো PHC-গুলির রোগী সংখ্যার বড় অংশ গ্রাস করে। বিশুদ্ধ কলের জল পৌঁছলে জলবাহিত রোগ নাটকীয়ভাবে কমবে, PHC-র ওপর চাপ কমবে, এবং মায়েরা ও শিশুরা সবচেয়ে বেশি উপকৃত হবেন।
এর পাশাপাশি বাজেটে আয়ুষ্মান ভারত সম্প্রসারণ, আয়ুষ্মান আরোগ্য মন্দির (পূর্বের স্বাস্থ্য ও সুস্থতা কেন্দ্র), মোবাইল মেডিক্যাল ইউনিট এবং অসম ক্যান্সার কেয়ার ফাউন্ডেশনের অধীনে ১৭টি ক্যান্সার কেন্দ্রের কার্যক্রমও উল্লেখ করা হয়েছে। শিলচর মেডিক্যাল কলেজে রোবোটিক সার্জারি ইউনিট এবং একটি তিনতলা বার্ন ইউনিট স্থাপনের ঘোষণাও এসেছে, যা অদূর ভবিষ্যতে হাইলাকান্দির জটিল রোগীদের একটি নির্ভরযোগ্য রেফারেল পয়েন্ট হয়ে থাকবে – যতদিন পর্যন্ত হাইলাকান্দির নিজস্ব মেডিক্যাল কলেজ পূর্ণ সক্ষমতায় না পৌঁছায়।
লালায় কর্মরত একজন চিকিৎসক বা নার্সের দৃষ্টিভঙ্গি
লালা PHC-তে কর্মরত স্বাস্থ্যকর্মীদের দৈনন্দিন অভিজ্ঞতা থেকে একটি সাধারণ ছবি উঠে আসে – যেটি এই অঞ্চলের অসংখ্য মিডিয়া রিপোর্ট ও রোগীর ভাষ্যেও প্রতিফলিত। একজন এমবিবিএস চিকিৎসক, যিনি দিনে শতাধিক ঔষধের পরামর্শ, প্রসূতি পরিচর্যা, টিকাদান, ছোট ছোট সেলাই এবং ডায়রিয়ার রোগী সামলান, তাঁকেই রাতে এমন কোনো রোগীর দায়িত্ব নিতে হয় যাঁর আসলে দরকার ছিল কার্ডিওলজিস্ট বা নিউরোসার্জন। রেফারেল লিখে তাঁর কাজ শেষ হয়ে যায়, কিন্তু দায়বোধের ভার থেকে যায় – কারণ তিনি জানেন, পরবর্তী গন্তব্য ৩৯+ কিলোমিটার দূরে।
নার্সরা বলেন যে গর্ভবতী মায়েদের ক্ষেত্রে সবচেয়ে কঠিন মুহূর্ত আসে যখন প্রসব জটিল হয়ে যায় – রক্তপাত হয়, শিশুর অবস্থান ঠিক থাকে না, অথবা আগে থেকেই উচ্চ রক্তচাপের সমস্যা থাকে। PHC-তে অপারেশন থিয়েটার নেই বা থাকলেও সক্রিয় নয়, রক্ত সঞ্চালনের ব্যবস্থা নেই, এবং অ্যাম্বুলেন্স হয়তো তখনও অন্য রোগী নিয়ে শিলচরের পথে। একজন স্থানীয় চিকিৎসকের কথায় এই হতাশা প্রায়ই ধরা পড়ে – “আমরা যা জানি, যা শিখেছি, সবই প্রয়োগ করতে পারি না, কারণ যন্ত্র নেই, বিশেষজ্ঞ নেই।” হাইলাকান্দিতে মেডিক্যাল কলেজ হলে এই দূরত্ব – শুধু ভৌগোলিক নয়, দক্ষতার দূরত্বও – অনেকটা কমবে বলে স্বাস্থ্যকর্মীরা আশা করছেন।
একজন রোগীর গল্প: লালা থেকে গুরুতর অসুখ সামলানোর বাস্তব অভিজ্ঞতা
লালার একজন সাধারণ বাসিন্দার দৈনন্দিন গল্প কল্পনা করা কঠিন নয়, কারণ এ অঞ্চলে এটি অতি পরিচিত। ধরুন মধ্যবয়সী একজন কৃষক হঠাৎ বুকে ব্যথা অনুভব করলেন এক সকালে। পরিবারের লোকজন প্রথমে লালা PHC-তে নিয়ে যান। সেখানে ECG করার ব্যবস্থা সীমিত, কার্ডিওলজিস্ট নেই। রেফার হলো হাইলাকান্দি সিভিল হাসপাতাল – ২০ কিলোমিটার রাস্তা। সেখানে গিয়ে দেখা গেল পরিস্থিতি গুরুতর, আরও উন্নত চিকিৎসা দরকার। আবার রেফার – এবার শিলচর মেডিক্যাল কলেজ। লালা থেকে শিলচর মোট প্রায় ৪০ কিলোমিটার, কিন্তু দুটো হাসপাতাল ঘুরে পৌঁছতে সময় লাগল চার-পাঁচ ঘণ্টা। গোল্ডেন আওয়ার পার হয়ে গেছে।
এটি শুধু হৃদরোগের গল্প নয়। ক্যান্সারে আক্রান্ত একজন মায়ের কথা ভাবুন, যাঁর প্রতি সপ্তাহে কেমোথেরাপির জন্য শিলচর যেতে হয়। পরিবারে যদি গাড়ি না থাকে, তাহলে অটো-বাস-শেয়ার-ট্যাক্সি মিলিয়ে একদিনে চার-পাঁচশ টাকা খরচ, সারাদিনের কাজ বন্ধ, সঙ্গে কাউকে দিতে হয় – কারণ চিকিৎসার পর একা ফেরা সম্ভব নয়। ডায়ালাইসিসের রোগীর জন্য এই চক্র সপ্তাহে তিনবার। কিডনি ফেল করা একজন মানুষের পরিবার এক-দুই বছরেই ভেঙে পড়ে – শুধু চিকিৎসায় নয়, যাতায়াতের ক্লান্তিতে ও খরচে।
প্রসূতিদের অভিজ্ঞতাও মর্মান্তিক হতে পারে। লালা থেকে শিলচরের পথে গাড়িতে শিশু জন্মানোর ঘটনা বরাক উপত্যকায় কোনো নতুন কথা নয়। স্থানীয় সংবাদপত্রগুলি বছরের পর বছর ধরে এই রকম খবর ছেপেছে। হাইলাকান্দিতে মেডিক্যাল কলেজ সহ মাতৃ ও শিশু স্বাস্থ্য কেন্দ্র হলে এই গল্পগুলির অনেকগুলোই পরিবর্তন হবে – রোগীরা কাছাকাছি পূর্ণাঙ্গ চিকিৎসা পাবেন, পরিবারগুলি পাশে থাকতে পারবে।
নির্বাচনী প্রতিশ্রুতি এবং ভবিষ্যতের আশা
২০২৬ সালের অসম বিধানসভা নির্বাচনের আগে বরাক উপত্যকা রাজনৈতিকভাবে অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠেছে। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্ব শর্মা একাধিক জনসভায় ঘোষণা করেছেন যে হাইলাকান্দিতে শুধু মেডিক্যাল কলেজ নয়, একটি ইঞ্জিনিয়ারিং কলেজ এবং একটি বিশ্ববিদ্যালয়ও গড়ে তোলা হবে – যেগুলিকে তিনি আগামী ১৫-২০ বছরে বরাক উপত্যকার চেহারা বদলে দিতে পারে এমন “রূপান্তরকারী” প্রকল্প হিসেবে বর্ণনা করেছেন। ২০২৪ সালের ডিসেম্বরে হাইলাকান্দির একটি কর্মসূচিতে তিনি আরও বলেছিলেন যে, বরাক উপত্যকায় দ্বিতীয় একটি AIIMS (অল ইন্ডিয়া ইনস্টিটিউট অব মেডিক্যাল সায়েন্সেস) প্রতিষ্ঠার বিষয়টিও রাজ্য সরকার বিবেচনা করছে।
২০২৬ সালের মার্চ মাসে মুখ্যমন্ত্রী কাছাড়, হাইলাকান্দি এবং শ্রীভূমি জেলায় প্রায় ৩৪০ কোটি টাকার বিভিন্ন প্রকল্পের উদ্বোধন ও ভিত্তিপ্রস্তর স্থাপন করেন – হাইলাকান্দি সার্কিট হাউস, স্কুল ভবন, যুবাবাস, এবং প্রায় ৫০.৬৫ কোটি টাকার সেতু প্রকল্পগুলি এর মধ্যে ছিল। এগুলি সরাসরি মেডিক্যাল কলেজ প্রকল্প না হলেও, উন্নত সড়ক যোগাযোগ ছাড়া কোনো হাসপাতালই কার্যকর হয় না – বিশেষত যখন অ্যাম্বুলেন্সকে গ্রাম থেকে শহরে পৌঁছতে হয়।
তবে প্রতিশ্রুতি আর বাস্তবায়নের মধ্যে দূরত্বটি ছোট নয়। মেডিক্যাল কলেজ তৈরি করতে জমি অধিগ্রহণ, পরিকাঠামো নির্মাণ, ভারতীয় জাতীয় চিকিৎসা কমিশনের (NMC) অনুমোদন, অনুষদ নিয়োগ, এমবিবিএস কোর্স চালু – এই পুরো প্রক্রিয়ায় সাধারণত ৪ থেকে ৭ বছর লাগে। অসম সরকার ইতিমধ্যে ঘোষণা করেছে যে নতুন মেডিক্যাল কলেজগুলির অনেকগুলিই ২০২৬-২৭ শিক্ষাবর্ষ থেকে কার্যক্রম শুরু করবে, যদিও হাইলাকান্দির জন্য সুনির্দিষ্ট সময়সীমা এখনও স্পষ্ট নয়। ভূমি সমীক্ষা, বিস্তারিত প্রকল্প প্রতিবেদন (DPR), এবং কেন্দ্রীয় সরকারের অনুমোদন – প্রতিটি ধাপই গুরুত্বপূর্ণ।
লালার মানুষের কাছে এই প্রকল্প শুধু একটি ভবন বা একটি রাজনৈতিক প্রতিশ্রুতি নয়। এটি সেই মায়ের জন্য, যিনি পরের বার প্রসবের সময় বাড়ির কাছে থাকতে চান। সেই হৃদরোগীর জন্য, যিনি সকালে বুকে ব্যথা নিয়ে আর পাঁচ ঘণ্টা গাড়িতে কাটাতে চান না। সেই ক্যান্সার আক্রান্ত বৃদ্ধের জন্য, যিনি কেমোথেরাপির প্রতিটি সপ্তাহের যাত্রাকে কমিয়ে আনতে চান। সেই তরুণের জন্য, যিনি এমবিবিএস পড়ার স্বপ্ন দেখেন কিন্তু গুয়াহাটি বা কলকাতায় পড়ার খরচ বহন করতে পারেন না। এবং সেই হাজার হাজার মানুষের জন্য, যাঁরা বিশ্বাস করেন যে ভালো স্বাস্থ্যসেবা পাওয়া বিলাসিতা নয়, অধিকার।
হাইলাকান্দির মেডিক্যাল কলেজ যখন সত্যিই রোগী গ্রহণ শুরু করবে, তখন লালার দৈনিক বাস্তবতা বদলাবে। ৩৯ কিলোমিটারের সেই ক্লান্তিকর পথ কমে আসবে ২০ কিলোমিটারে। রেফারেল চিঠি কমবে, বাঁচানো জীবন বাড়বে। বরাক উপত্যকার দীর্ঘদিনের বঞ্চনার ইতিহাসে এটি একটি নতুন অধ্যায় হতে পারে – যদি প্রতিশ্রুতি কাগজ থেকে বাস্তবে নেমে আসে, এবং সময়মতো।
তথ্যসূত্র: অসম বাজেট ২০২৫-২৬ ঘোষণা (অর্থমন্ত্রী অজন্তা নেওগ, ১০ মার্চ ২০২৫); বরাক বুলেটিন; সেন্টিনেল অসম; নর্থইস্ট লাইভ; Way2Barak; KRC টাইমস; অসম ট্রিবিউন; জাতীয় স্বাস্থ্য মিশন, অসম-এর ২৪×৭ PHC তালিকা; এবং হাইলাকান্দি জেলা প্রশাসনের তথ্য।