
৯ এপ্রিলের আসাম বিধানসভা ভোটের মাত্র তিন দিন আগে রাজ্যের রাজনৈতিক পরিবেশ নতুন এক বিতর্কে উত্তপ্ত হয়ে উঠল। মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা (Himanta Biswa Sarma) সোমবার সকালে দাবি করেন যে পাকিস্তানের একাধিক টেলিভিশন চ্যানেল গত দশ দিনে আসামের বিধানসভা নির্বাচন সম্পর্কে মোট ১১টি শো প্রচার করেছে এবং সেই শোগুলিতে কংগ্রেসের পক্ষে অনুকূল বক্তব্য তুলে ধরা হয়েছে। পাকিস্তান চ্যানেল আসাম ভোট কংগ্রেস সংক্রান্ত এই বিস্ফোরক দাবি India Today NE-তে প্রকাশিত হওয়ার পর জাতীয় সংবাদমাধ্যম থেকে শুরু করে স্থানীয় রাজনৈতিক মহল পর্যন্ত ব্যাপক আলোচনার জন্ম দিয়েছে।
হিমন্ত বিশ্বশর্মার এই অভিযোগ ভোটের শেষ মুহূর্তে BJP-র নির্বাচনী কৌশলের একটি গুরুত্বপূর্ণ অংশ হিসেবে দেখছেন রাজনৈতিক পর্যবেক্ষকরা। এর আগে একই প্রচার মরসুমে হিমন্ত কংগ্রেসের বিরুদ্ধে AIUDF ও সংখ্যালঘু তোষণের অভিযোগ করেছিলেন। পাকিস্তানি চ্যানেলের প্রসঙ্গ টেনে এনে তিনি এবার জাতীয় নিরাপত্তার ছকে আসামের ভোটকে উপস্থাপন করার চেষ্টা করছেন বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।
হিমন্তের দাবি: ১০ দিনে ১১টি শো এবং কংগ্রেসের ‘সংযোগ’
হিমন্ত বিশ্বশর্মার বক্তব্য অনুযায়ী, এই ১১টি শো নিছক সংবাদ পরিবেশন ছিল না — বরং সেগুলিতে সুনির্দিষ্টভাবে BJP সরকারের সমালোচনা এবং কংগ্রেসের পক্ষে ভোট দেওয়ার আহ্বান জানানো হয়েছে। হিমন্ত বিশ্বশর্মা পাকিস্তান অভিযোগ আসাম প্রসঙ্গে তিনি প্রশ্ন তোলেন, “একটি প্রতিবেশী দেশের টেলিভিশন চ্যানেলগুলি কেন আসামের বিধানসভা ভোট নিয়ে এতটা আগ্রহী? কাদের স্বার্থে এই প্রচার চলছে?” তাঁর দাবি, এই পাকিস্তানি চ্যানেলগুলির আগ্রহ কোনো কাকতালীয় ঘটনা নয় — এর পেছনে একটি সংগঠিত প্রচেষ্টা রয়েছে যা ভারতের অভ্যন্তরীণ নির্বাচনকে প্রভাবিত করার চেষ্টা করছে।
BJP-র দীর্ঘদিনের নির্বাচনী কৌশলে “পাকিস্তান-কংগ্রেস সংযোগ”-এর বক্তব্য একটি পরিচিত সুর। ২০১৯ এবং ২০২১ সালের নির্বাচনেও কেন্দ্রীয় ও রাজ্যস্তরে BJP নেতারা এই অভিযোগ তুলেছিলেন। তবে এবারের প্রসঙ্গে হিমন্ত সুনির্দিষ্টভাবে সংখ্যার উল্লেখ করেছেন — ১০ দিনে ১১টি শো — যা এই দাবিকে আরও বেশি মনোযোগ আকর্ষণ করিয়েছে।
কংগ্রেসের পাল্টা অবস্থান ও BJP-র নির্বাচনী কৌশলের পটভূমি
BJP কংগ্রেস পাকিস্তান সংযোগ দাবি-র প্রেক্ষিতে কংগ্রেস এই অভিযোগকে সম্পূর্ণ ভিত্তিহীন বলে নাকচ করেছে। কংগ্রেসের পক্ষ থেকে বলা হচ্ছে, BJP যখন নিজের সরকারের কাজের হিসাব দিতে পারছে না, তখন পাকিস্তানের মতো বিভ্রান্তিকর প্রসঙ্গ এনে ভোটারদের দৃষ্টি ঘোরানোর চেষ্টা করছে। এর আগের দিন, রবিবার, কংগ্রেস নেতা রাহুল গান্ধী (Rahul Gandhi) বিশ্বনাথ ও গোলাঘাটে সভা করে চা শ্রমিকদের ৪৫০ টাকা মজুরি এবং ছয়টি সম্প্রদায়কে ST মর্যাদা দেওয়ার প্রতিশ্রুতি দিয়েছেন।
উল্লেখ্য, এই পাকিস্তান চ্যানেল বিতর্কের ঠিক দুই দিন আগে, ৪ এপ্রিল, কংগ্রেস মুখপাত্র পবন খেরা (Pawan Khera) CM হিমন্তের স্ত্রী রিনিকি ভূয়াঁ শর্মার বিরুদ্ধে তিনটি বিদেশি পাসপোর্ট ধারণ ও দুবাই-মার্কিন সম্পত্তির অভিযোগ এনেছিলেন। সেই অভিযোগের পর হিমন্ত ও রিনিকি মানহানির মামলার হুমকি দিয়েছিলেন। পাকিস্তান চ্যানেল আসাম ভোট কংগ্রেস বিতর্কটি সেই পটভূমিতে এসেছে — রাজনৈতিক মহলের একটি অংশ মনে করছে, পবন খেরার অভিযোগের পাল্টা আক্রমণ হিসেবেই এই নতুন বিতর্ক তুলেছেন হিমন্ত।
হাইলাকান্দি ও বরাক উপত্যকার দৃষ্টিতে এই বিতর্কের গুরুত্ব
আসাম নির্বাচন জাতীয় নিরাপত্তা প্রচার-এর এই দিকটি হাইলাকান্দি জেলা ও লালা বাজারের বাসিন্দাদের কাছে বিশেষভাবে প্রাসঙ্গিক। বরাক উপত্যকা ভারত-বাংলাদেশ সীমান্তবর্তী এলাকা এবং হাইলাকান্দি সীমান্তবর্তী একটি জেলা। এখানে বেআইনি অনুপ্রবেশ, সীমান্ত নিরাপত্তা এবং পার্শ্ববর্তী দেশগুলির ভারত-বিষয়ক প্রচার — এই বিষয়গুলি স্থানীয় মানুষের কাছে অত্যন্ত স্পর্শকাতর। BJP বরাবরই বরাক উপত্যকায় জাতীয় নিরাপত্তার বক্তব্য দিয়ে ভালো সাড়া পেয়েছে।
তবে স্থানীয় বিশ্লেষকরা মনে করছেন, শেষ মুহূর্তের এই বিতর্কগুলি — পাকিস্তানি চ্যানেলের অভিযোগ, পাসপোর্ট বিতর্ক, মানহানি মামলার হুমকি — মূলত প্রচারের শেষ পর্যায়ে আবেগের ভোট আকৃষ্ট করার কৌশল। লালা বাজার ও হাইলাকান্দির সাধারণ ভোটারদের কাছে মূল প্রশ্ন হলো — দৈনন্দিন জীবনে গ্যাসের সংকট, কৃষির অবস্থা, চাকরির বাজার এবং সরকারি প্রকল্পের সুবিধা। এই বাস্তব সমস্যাগুলির উত্তর না পেলে নিছক রাজনৈতিক তর্ক ভোটবাক্সে প্রভাব ফেলবে কিনা, তা নিয়ে সংশয় থাকছেই। ৯ এপ্রিল ভোটের দিন আর মাত্র ৭২ ঘণ্টা বাকি। পাকিস্তান চ্যানেল আসাম ভোট কংগ্রেস বিতর্কটি BJP-র শেষ মুহূর্তের প্রচারে কতটা কার্যকর হবে, তা নির্ভর করছে আসামের ভোটাররা এই অভিযোগকে কতটা গুরুত্বের সঙ্গে নেন তার ওপর। নির্বাচন কমিশন এই দাবি নিয়ে কোনো পদক্ষেপ নেয় কিনা, এবং কংগ্রেস এই অভিযোগের জবাব দিতে কী কৌশল নেয় — তা জানা যাবে ভোটের আগের শেষ প্রচার দিনেই। ৪ মে গণনার ফলাফলই বলে দেবে, এই বিতর্কগুলি শেষ পর্যন্ত ভোটারদের মনে কতটা দাগ রেখে গেছে।