
আসাম বিধানসভা নির্বাচনের ঠিক চার দিন আগে কাছাড় জেলায় BJP-র প্রচারে মাঠে নামলেন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং (Yumnam Khemchand Singh)। রবিবার (৫ এপ্রিল) সিলচার থেকে উধারবন্দ বিধানসভা কেন্দ্রের রংপুরে একটি জনসভায় তিনি BJP প্রার্থী রাজদীপ গোয়ালার (Rajdeep Goala) পক্ষে ভোট চাইলেন এবং সেখানে প্রাক্তন প্রধানমন্ত্রী অটল বিহারী বাজপেয়ীর (Atal Bihari Vajpayee) রাজনৈতিক উত্তরাধিকারের কথা তুলে ধরলেন। মণিপুরের CM উধারবন্দে BJP প্রচার-এর এই ঘটনা বরাক উপত্যকায় আসন্ন ভোটের আগে BJP-র কৌশলগত জোটশক্তির প্রকাশ বলে বিশ্লেষকরা মনে করছেন।
উল্লেখযোগ্য যে রাজদীপ গোয়ালা মূলত লাখিপুর (Lakhipur) আসনের প্রাক্তন দু’বারের কংগ্রেস বিধায়ক, যিনি BJP-তে যোগ দিয়ে এবার উধারবন্দ থেকে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। তাঁকে টিকিট দেওয়ার প্রতিবাদে BJP-র আট জন সিনিয়র নেতা দলত্যাগ করেছিলেন। সেই অভ্যন্তরীণ প্রতিকূলতার মাঝেই এখন মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী সশরীরে উধারবন্দে এসে গোয়ালার পক্ষে প্রচার করলেন, যা BJP নেতৃত্বের স্পষ্ট সংকেত যে তারা এই আসনে শেষ পর্যন্ত লড়াই করতে দৃঢ়প্রতিজ্ঞ।
বাজপেয়ীর উত্তরাধিকার ও উন্নয়নের বার্তা
রংপুরের জনসভায় মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রী ইউমনাম খেমচাঁদ সিং বলেন, “অটল বিহারী বাজপেয়ীর রাজনীতির ভিত্তি ছিল সততা এবং জাতির প্রতি অঙ্গীকার, যা অতীতের সুবিধাবাদী রাজনীতির থেকে সম্পূর্ণ আলাদা।” তিনি আরও বলেন, প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদীর (Narendra Modi) নেতৃত্বে ভারত সেই উত্তরাধিকার বহন করে দ্রুত উন্নয়নের পথে এগিয়ে চলেছে এবং বৈশ্বিক মঞ্চে দেশের মর্যাদা বৃদ্ধি পেয়েছে।
আসামের প্রসঙ্গে এসে মণিপুর CM মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মার (Himanta Biswa Sarma) ভূয়সী প্রশংসা করে বলেন, “গুয়াহাটি থেকে শুরু করে রাজ্যের বিভিন্ন শহরে অবকাঠামো, সংযোগ ব্যবস্থা এবং নগরায়ণে যে দৃশ্যমান উন্নতি হয়েছে, তা আসামকে একটি নতুন পরিচয় দিয়েছে।” তিনি সরাসরি ভোটারদের উদ্দেশে বলেন, “উন্নয়ন যখন চোখের সামনে দৃশ্যমান এবং নেতৃত্ব যখন দৃঢ়, তখন পছন্দ স্পষ্ট। এই গতি বজায় রাখতে BJP-কে সমর্থন করা অপরিহার্য।” PTI সূত্রে জানা গেছে, মণিপুর CM একই বার্তায় কংগ্রেস নেতৃত্বের আমলে উত্তর-পূর্বের উন্নয়নে অবহেলার সমালোচনা করেন।
রাজদীপ গোয়ালার প্রচার ও মণিপুরি সম্প্রদায়কে বার্তা
রাজদীপ গোয়ালা নিজে ওই দিন উধারবন্দের মণিপুরি সম্প্রদায়ের সদস্যদের সামনে বক্তব্য রাখেন এবং তাদের সঙ্গে তাঁর দীর্ঘ সম্পর্কের কথা তুলে ধরেন। তিনি বলেন, “লাখিপুর থেকে দু’বারের বিধায়ক হিসেবে মণিপুরি সমাজের সঙ্গে আমার সম্পর্ক সর্বদা ঘনিষ্ঠ। সেই বিশ্বাস ও সমর্থন এখানে উধারবন্দেও অব্যাহত আছে।” তিনি জানান, এই নির্বাচনী কেন্দ্রে ২২টি মণিপুরি গ্রামে প্রচার পরিচালিত হয়েছে এবং প্রতিটি বাড়িতে পৌঁছানো সম্ভব হয়েছে।
উধারবন্দ কেন্দ্রে মোট ১ লক্ষ ৮৪ হাজারেরও বেশি ভোটার রয়েছেন। KRC Times-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, ওই দিন বরাক উপত্যকার একাধিক কেন্দ্রে BJP-র বড় জনসভা হয়েছিল। ২০২১ সালের নির্বাচনে উধারবন্দ আসনে BJP প্রার্থী মিহিরকান্তি শোম (Mihir Kanti Shome) মাত্র ২,৬৮৫ ভোটের ব্যবধানে জয়ী হয়েছিলেন — এই সংকীর্ণ ব্যবধানই বলছে, এবারও লড়াই তীব্র হওয়ার আশঙ্কা রয়েছে।
বরাক উপত্যকায় ভোটের লড়াই এবং হাইলাকান্দির গুরুত্ব
মণিপুরের CM উধারবন্দে BJP প্রচার করতে আসার এই ঘটনা বরাক উপত্যকাকেন্দ্রিক BJP-র সামগ্রিক রণনীতির একটি অংশ। IANS-এর সর্বশেষ প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা সম্প্রতি বরাক উপত্যকাকে রাজ্যে BJP-র “৯০ থেকে ১০০ আসন” জয়ের লক্ষ্যমাত্রার একটি মূল ক্ষেত্র হিসেবে চিহ্নিত করেছেন।
হাইলাকান্দি বিধানসভা আসনের প্রসঙ্গে বিশেষভাবে উল্লেখ করা হয়েছে যে CM হিমন্ত নিজে হাইলাকান্দিতে BJP-র জয়ের ব্যাপারে আস্থাশীল, যদিও বিরোধী Congress জোট ওই আসনে নিজেদের অবস্থান শক্ত বলে দাবি করছে। লালা বাজার-সহ হাইলাকান্দি জেলায় গত বছরের জেলা পরিষদ নির্বাচনে BJP ও Congress সমানসংখ্যক আসন পেয়েছিল, যা এবার একটি কঠিন প্রতিযোগিতার ইঙ্গিত দেয়।
রাজদীপ গোয়ালা উধারবন্দ নির্বাচন এবং বরাক উপত্যকা BJP প্রচার ২০২৬-এর এই রাজনৈতিক গতিপ্রকৃতি স্পষ্টভাবে বলছে যে ৯ এপ্রিলের ভোটে বরাক উপত্যকায় শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত জোরালো প্রতিযোগিতা থাকবে। মণিপুরের মুখ্যমন্ত্রীর এই সফর এবং বাজপেয়ীর রাজনৈতিক উত্তরাধিকারকে সামনে রেখে BJP-র উন্নয়নভিত্তিক প্রচারকৌশল কতটা ভোটারদের মনে সাড়া জাগাবে, তা ভোটের ফলাফলই বলবে। কাছাড়, হাইলাকান্দি ও শ্রীভূমি — বরাক উপত্যকার এই তিনটি জেলায় BJP কতটা আসন ধরে রাখতে পারে বা বাড়াতে পারে, সেটাই এবার আসাম নির্বাচনের অন্যতম প্রধান নজরদারির বিষয় হয়ে উঠেছে।