Read today's news --> Click here

মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্ফোরণ — শিক্ষক আবাসের গেট ভাঙল, ক্যাম্পাসে আতঙ্ক

শনিবার সন্ধ্যায় মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসে (Manipur University campus) একটি বিস্ফোরণ ঘটেছে, যাতে শিক্ষক আবাসের একটি গেট আংশিকভাবে ধ্বংস হয়ে গেছে এবং চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছে স্প্লিন্টার। মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্ফোরণ-এর এই ঘটনায় কোনো হতাহতের খবর পাওয়া যায়নি বলে কর্তৃপক্ষ জানিয়েছেন। ৪ এপ্রিল সন্ধ্যা সাতটা থেকে আটটার মধ্যে ইম্ফল পশ্চিম (Imphal West) জেলার কান-চিপুর (Can-chipur) এলাকায় অবস্থিত বিশ্ববিদ্যালয়ের ৮ নম্বর (Type-5) শিক্ষক কোয়ার্টারের গেটের কাছে এই বিস্ফোরণটি ঘটে।

ঘটনার পরপরই সিঞ্জামেই থানার (Singjamei Police Station) পুলিশ এবং একটি ফরেনসিক দল ঘটনাস্থলে পৌঁছায় এবং এলাকাটি ঘিরে তদন্ত শুরু করে। পুলিশ একটি মামলা দায়ের করেছে এবং বিস্ফোরকটির প্রকৃতি ও হামলার পেছনে কারা দায়ী তা উদ্ঘাটনে তদন্ত চলছে। রিপাবলিক টিভি (Republic TV)-এর প্রতিবেদন অনুযায়ী, বিস্ফোরণটি বিশ্ববিদ্যালয়ের ৫ নম্বর ব্লকেড গেটের কাছে একজন অধ্যাপক প্রেমানন্দের (Premanand) কোয়ার্টারের সামনে ঘটেছে।

ক্যাম্পাসে আতঙ্ক, ছাত্রছাত্রীরা হোস্টেল থেকে বেরিয়ে আসেন

বিস্ফোরণের শব্দ শুনে ক্যাম্পাসের হোস্টেলগুলি থেকে বহু ছাত্রছাত্রী দ্রুত বাইরে বেরিয়ে আসেন। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখতে বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ তাৎক্ষণিকভাবে সমস্ত ক্যাম্পাস গেট বন্ধ করে দেয় এবং কাউকে যাচাই ছাড়া প্রবেশ বা বাহির হতে দেওয়া হয়নি। মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্ফোরণ-এর এই পরিস্থিতিতে ছাত্রছাত্রীদের মধ্যে ব্যাপক আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে।

মাস্টার্সের ছাত্র ছাওথই (Chaothoi) বলেন, “বিস্ফোরণের আওয়াজ শুনে প্রচুর ছাত্রছাত্রী বাইরে বেরিয়ে আসেন, কিন্তু গেট বন্ধ করে দেওয়া হয় এবং চলাচল কঠোরভাবে নিয়ন্ত্রণ করা হয়। যাচাই ছাড়া কাউকে ভেতরে বা বাইরে যেতে দেওয়া হয়নি।” The Sangai Express-এর প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিস্ফোরকটি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুটি আবাসিক কোয়ার্টারের মাঝামাঝি জায়গায়, মণিপুরি বিভাগের (Manipuri Department) কাছে ফেটেছে এবং ধারণা করা হচ্ছে, বিশ্ববিদ্যালয়ের বাইরে থেকে বোমাটি দেওয়াল টপকে ছুঁড়ে মারা হতে পারে। Northeast Live-এর ভিডিও প্রতিবেদনে গেটের ক্ষতিগ্রস্ত অংশ এবং চারপাশে ছড়িয়ে পড়া স্প্লিন্টারের ছবি দেখা গেছে।

মণিপুর নিরাপত্তা পরিস্থিতি: বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসেও ছায়া ফেলছে সংঘাত

এই ঘটনাটি মণিপুর নিরাপত্তা পরিস্থিতির আরও একটি উদ্বেগজনক দিক সামনে এনেছে। ২০২৩ সালের মে মাসে মেইতেই (Meitei) ও কুকি-জো (Kuki-Zo) সম্প্রদায়ের মধ্যে জাতিগত সংঘাত শুরু হওয়ার পর থেকে রাজ্যে বিক্ষিপ্তভাবে বিস্ফোরণ ও হামলার ঘটনা ঘটে চলেছে। ২০২৬ সালের জানুয়ারিতে বিষ্ণুপুর (Bishnupur) জেলায় ধারাবাহিক IED বিস্ফোরণে বেশ কয়েকজন আহত হয়েছিলেন এবং সেই ঘটনার প্রতিবাদে ২৪ ঘণ্টার বন্ধ পালিত হয়েছিল।

এর আগে ২০২৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে ইম্ফলের ধনমঞ্জুরী বিশ্ববিদ্যালয় (Dhanamanjuri University) ক্যাম্পাসে একটি বিস্ফোরণে একজন নিহত এবং আরেকজন আহত হয়েছিলেন, যেখানে IED ব্যবহারের সন্দেহ করেছিল পুলিশ। বর্তমান ঘটনায় কোনো প্রাণহানি না হলেও, শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের ভেতরে বারবার এই ধরনের হামলার ঘটনা রাজ্যের নিরাপত্তা ব্যবস্থার দুর্বলতা নিয়ে গুরুতর প্রশ্ন তুলছে। Republic TV-এর প্রতিবেদক জানিয়েছেন, মণিপুর ক্যাম্পাস বোমা হামলার এই ঘটনায় রাজ্যের CM এন বীরেন সিং (N Biren Singh)-এর সরকার বিষয়টিকে অত্যন্ত গুরুত্বের সঙ্গে দেখছে এবং পুলিশ তদন্ত দ্রুতগতিতে এগিয়ে নিয়ে যাচ্ছে।

উত্তর-পূর্ব ভারতের নিরাপত্তা এবং আসামের উদ্বেগ

মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্ফোরণের এই ঘটনা শুধু মণিপুরের নয়, গোটা উত্তর-পূর্ব ভারত তথা আসামের জন্যও একটি গুরুত্বপূর্ণ নিরাপত্তা সংকেত। আসামের সীমান্তবর্তী জেলাগুলির মানুষ, বিশেষত বরাক উপত্যকার হাইলাকান্দি ও লালা বাজার এলাকার বাসিন্দারা, মণিপুরের পরিস্থিতির সঙ্গে সরাসরি পরিচিত — কারণ এই এলাকা থেকে বহু পরিবারের সন্তানরা ইম্ফল বা কাছাড়ের শিলচরের মতো শহরে পড়াশোনা করেন।

মণিপুর সংঘাত দীর্ঘস্থায়ী হওয়ার কারণে উত্তর-পূর্বের বিভিন্ন রাজ্যে পণ্য সরবরাহ শৃঙ্খল ব্যাহত হয়েছে এবং কখনো কখনো জাতীয় সড়কে যানবাহন চলাচলও বিঘ্নিত হয়েছে, যার পরোক্ষ প্রভাব আসামের উপরেও পড়েছে। মণিপুর নিরাপত্তা পরিস্থিতি স্থিতিশীল না হলে এই অঞ্চলের সামগ্রিক উন্নয়ন ও স্বাভাবিক জীবনযাত্রা বিঘ্নিত হতে থাকবে বলে মনে করছেন রাজনৈতিক বিশ্লেষকরা।

এই মুহূর্তে সবচেয়ে জরুরি প্রশ্ন হলো, বিশ্ববিদ্যালয় ক্যাম্পাসের মতো একটি শিক্ষা ও আবাসিক এলাকায় বোমা পৌঁছাল কীভাবে। তদন্তকারীরা বিস্ফোরকটির উৎস এবং কারা এই হামলার পেছনে রয়েছে তা নির্ধারণের চেষ্টা করছেন। পুলিশ এখন পর্যন্ত কোনো সংগঠনের নাম সরকারিভাবে উল্লেখ করেনি। তবে বিশেষজ্ঞরা বলছেন, যতদিন না মণিপুরের জাতিগত সমস্যার একটি স্থায়ী রাজনৈতিক সমাধান হচ্ছে, ততদিন এই ধরনের বিক্ষিপ্ত হামলার পুনরাবৃত্তি ঘটতেই থাকবে। কেন্দ্র সরকার এবং রাজ্য প্রশাসন উভয়ের সামনেই এটি একটি কঠিন পরীক্ষা।

মণিপুর বিশ্ববিদ্যালয়ে বিস্ফোরণ — শিক্ষক আবাসের গেট ভাঙল, ক্যাম্পাসে আতঙ্ক
Scroll to top