
আসাম বিধানসভা নির্বাচন ২০২৬-এর ভোটগ্রহণের দিন, ৯ এপ্রিল বৃহস্পতিবার, আসামের কিংবদন্তি গায়ক জুবিন গর্গের পরিবারের সদস্যরা গুয়াহাটিতে ভোট দিতে এলেন — শোকের মাঝেও নাগরিক দায়িত্ব পালনের এক মর্মস্পর্শী দৃশ্যের অবতারণা করলেন। প্রয়াত শিল্পীর স্ত্রী গরিমা সাইকিয়া গর্গ, শারীরিকভাবে অসুস্থ থাকার পরেও দিসপুর কেন্দ্রে ভোট দিতে আসেন এবং সাংবাদিকদের কাছে জুবিন গর্গ মৃত্যু মামলায় দ্রুত বিচারের দাবি জানান। তাঁর সঙ্গে ছিলেন জুবিনের বোন পালমে বরঠাকুর — পরিবারের এই ঐক্যবদ্ধ উপস্থিতি আসামের জনমানসে গভীর আবেগের জন্ম দিয়েছে।
অসুস্থ শরীরেও ভোটকেন্দ্রে গরিমা: “বিচার হবেই”
India Today NE-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, ভোটকেন্দ্র থেকে বেরিয়ে গরিমা সাইকিয়া গর্গ বলেন, “ভোট দেওয়া আমাদের কর্তব্য। তাই শরীর ভালো না থাকলেও আজ ভোট দিতে এসেছি।” স্বামীর মৃত্যু মামলার বিচার প্রসঙ্গে তিনি বলেন, “আমরা তাঁর বিচারের জন্য লড়াই করছি। আশা আছে যে দ্রুততার সঙ্গে বিচার হবে।” জুবিনের বোন পালমে বরঠাকুর ভোটারদের উদ্দেশে আহ্বান জানিয়ে বলেন, “আমরা সবাই ভোট দিয়েছি। আমি সকল নাগরিককে অনুরোধ করছি — আপনারাও ভোট দিন, যাতে আমরা পছন্দমতো একটি ভালো সরকার পেতে পারি।”
একজন গায়কের মৃত্যু মামলার বিচারের দাবি যখন ভোটের দিনে প্রকাশ্য বক্তব্যে উঠে আসে, তখন তা শুধু আইনি প্রক্রিয়ার কথা বলে না — বলে একটি পরিবারের ভেতরের অনির্বাণ যন্ত্রণার কথাও। গরিমার সংক্ষিপ্ত কিন্তু দৃঢ় বার্তা আসামের সব প্রান্তের মানুষের হৃদয় স্পর্শ করেছে, যারা জুবিনের গানে বড় হয়েছেন।
সিঙ্গাপুর থেকে গুয়াহাটি: মৃত্যুর পেছনে দুই তদন্তের ভিন্ন পথ
জুবিন গর্গ মৃত্যু মামলার ঘটনাটি শুরু হয়েছিল ২০২৫ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর। ৫২ বছর বয়সী এই বিখ্যাত আসামি গায়ক সিঙ্গাপুরে North East India Festival-এ সাংস্কৃতিক ব্র্যান্ড অ্যাম্বাসাডর হিসেবে অংশ নিতে গিয়েছিলেন। অনুষ্ঠানের আগের দিন, ১৯ সেপ্টেম্বর, তিনি Assam Association Singapore-এর সদস্যদের সঙ্গে একটি ইয়ট ট্রিপে যান। সেখানে সমুদ্রে সাঁতার কাটার সময় তিনি জ্ঞান হারান এবং পরে তাঁকে মৃত ঘোষণা করা হয়।
এই মৃত্যু নিয়ে দুটি পৃথক তদন্ত চলছে। NDTV ও India Today-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, আসাম পুলিশের CID-র অধীনে গঠিত Special Investigation Team (SIT) ২০২৫ সালের ডিসেম্বরে গুয়াহাটির Chief Judicial Magistrate (CJM) আদালতে ৩,৫০০ পৃষ্ঠার চার্জশিট জমা দেয়। পরবর্তীতে Times of India-র ফেসবুক পোস্ট অনুযায়ী এই চার্জশিট ১২,০০০ পৃষ্ঠায় বিস্তৃত হয়েছে। এতে ৪ জনকে হত্যার দায়ে এবং আরও ৩ জনকে সম্পর্কিত অভিযোগে আসামি করা হয়েছে। চার্জশিটে অপরাধমূলক ষড়যন্ত্র, culpable homicide এবং হত্যার ধারা অন্তর্ভুক্ত রয়েছে।
মুখ্যমন্ত্রী হিমন্ত বিশ্বশর্মা ২০২৫ সালের ২৫ নভেম্বর আসাম বিধানসভায় বলেন, “প্রাথমিক তদন্তের পরই আসাম পুলিশ নিশ্চিত হয়েছে যে এটি culpable homicide নয়, এটি সরাসরি ও সহজ একটি হত্যাকাণ্ড।” তিনি আরও বলেছিলেন, চার্জশিটে অপরাধের পেছনের উদ্দেশ্য আসামের মানুষকে চমকিত করবে। আসামি হিসেবে গ্রেফতার করা জুবিনের ব্যক্তিগত নিরাপত্তা কর্মকর্তা নন্দেশ্বর বড়া ও প্রবীণ বৈশ্যের অ্যাকাউন্টে ১.১ কোটি টাকারও বেশি আর্থিক লেনদেন পাওয়া গেছে বলে NDTV জানিয়েছে।
সিঙ্গাপুরের ভিন্ন অবস্থান ও বিতর্কিত তথ্য
তবে সিঙ্গাপুর কর্তৃপক্ষের তদন্তের ছবিটি ভিন্ন। Deccan Herald ও Anandabazar Patrika-র প্রতিবেদন অনুযায়ী, সিঙ্গাপুরের আদালত ২০২৬ সালের মার্চে জানিয়েছে যে জুবিন গর্গের মৃত্যু দুর্ঘটনাজনিত익수মৃত্যু এবং কোনো ষড়যন্ত্রের প্রমাণ পাওয়া যায়নি। Channel News Asia-র প্রতিবেদন অনুসারে — যা ABP Live ও Bangla Aajtak উদ্ধৃত করেছে — সিঙ্গাপুরের তদন্তকারী কর্মকর্তা আদালতে জানান যে জুবিন প্রথমে লাইফ জ্যাকেট পরলেও পরে তা খুলে ফেলেন এবং দ্বিতীয়বার পরতে দিলে তিনি তা প্রত্যাখ্যান করেন। এছাড়া The Wire-র তথ্য অনুযায়ী সিঙ্গাপুর পুলিশ জানিয়েছে, জুবিনের রক্তে অ্যালকোহলের মাত্রা ছিল প্রতি ১০০ মিলি রক্তে ৩৩৩ মিলিগ্রাম — যা অত্যন্ত বেশি।
Deccan Herald আরও জানায়, সিঙ্গাপুরের তদন্তে এই অবস্থান সত্ত্বেও আসাম পুলিশের SIT জানিয়েছে যে তাদের তদন্ত অপরিবর্তিতভাবে চলতে থাকবে। বিরোধীরা সিঙ্গাপুরের রায়ের পর আসাম পুলিশের “হত্যা” অভিযোগের বিষয়ে প্রশ্ন তুলেছে বলেও India Today NE জানিয়েছে। এই দুই দেশের তদন্তের মধ্যকার মতপার্থক্য মামলাটিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
আসামের সাংস্কৃতিক বেদনা ও বিচারের প্রত্যাশা
জুবিন গর্গ কেবল একজন গায়ক ছিলেন না — তিনি আসামের সাংস্কৃতিক পরিচয়ের একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ। তাঁর মৃত্যুর পর আসাম জুড়ে ৬০টিরও বেশি মামলা দায়ের হয়েছিল, যা থেকেই বোঝা যায় সাধারণ মানুষের কাছে এই মৃত্যু কতটা গভীরভাবে আঘাত করেছে। মুখ্যমন্ত্রীর নির্দেশে SIT গঠন এবং গাউহাটি হাইকোর্টের বিচারপতি সৌমিত্র সাইকিয়ার নেতৃত্বে এক-সদস্যের তদন্ত কমিশন গঠনও সেই জনআকাঙ্ক্ষার প্রতিফলন। এখন মামলাটি একটি fast-track আদালতে শুনানিতে রয়েছে।
হাইলাকান্দি ও লালা টাউনের মানুষজনও জুবিন গর্গের গানের সঙ্গে পরিচিত। বরাক উপত্যকার বাংলাভাষী সম্প্রদায়ের মধ্যেও তাঁর জনপ্রিয়তা ছিল অপার। তাই তাঁর মৃত্যুর বিচারের দাবি শুধু উচ্চ আসামের নয়, সমগ্র রাজ্যের মানুষের হৃদয়ের কথা।
বিচার প্রক্রিয়া এগোচ্ছে, পরিবার অপেক্ষায়
জুবিন গর্গ মৃত্যু মামলায় fast-track কোর্টে শুনানি শুরু হয়েছে — এটিই এই মুহূর্তে পরিবারের কাছে সবচেয়ে বড় ভরসার জায়গা। একদিকে আসামের SIT-এর ১২,০০০ পৃষ্ঠার চার্জশিট এবং অন্যদিকে সিঙ্গাপুরের ভিন্নমত — এই জটিল আইনি পরিস্থিতিতে শেষ পর্যন্ত সত্য কী, সেটি আদালতই নির্ধারণ করবে। গরিমা সাইকিয়া গর্গ বলেছেন, তাঁরা “দ্রুত বিচারের আশায় আছেন” — এই আশাটুকু যেন আসামের প্রতিটি মানুষও একইভাবে বহন করছেন। ভোটের দিনের এই মুহূর্তটি মনে করিয়ে দেয় যে গণতন্ত্র ও ন্যায়বিচার — দুটিই একটি সভ্য সমাজের মৌলিক দাবি।